ইমেইল থেকে
নুসরাত রুষা
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: অ্যামনেস্টি
বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছে, যেখানে কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী ঠিক করে দেবে মানুষ কী দেখবে, কী পড়বে, কী শুনবে?
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চলচ্চিত্রে অশালীন বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো উপাদান নেই। এটি একটি সাধারণ বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র, যা দেশের প্রচলিত আইন ও সেন্সর প্রক্রিয়া মেনেই প্রদর্শনের অনুমতি পেয়েছে। তাহলে কোন অধিকারে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি বৈধ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়?
একটি
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো চলচ্চিত্রের ভালো-মন্দ নির্ধারণ করবেন দর্শক, আইন এবং
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যদি কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করে সিনেমা হল
বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে আগামীকাল তারা বইমেলা বন্ধ করতে চাইবে, নাটকের মঞ্চ
ভেঙে দিতে চাইবে, গান বন্ধ করতে চাইবে, এমনকি মানুষের পোশাক ও জীবনযাপনও নিয়ন্ত্রণ
করতে চাইবে। ইতিহাস বলে, উগ্রবাদের কাছে একবার নতি স্বীকার করলে তার দাবির শেষ
থাকে না।
আরও হতাশার
বিষয় হলো প্রশাসনের নীরবতা। সরকার এবং জেলা প্রশাসন কি এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেবে না?
একটি বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হলো, অথচ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর
দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এই নীরবতা কি উগ্রবাদীদের আরও উৎসাহিত করবে না?
বাংলাদেশের
জন্ম হয়েছিল মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে। এই দেশের
মানুষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে কোনো গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ মেনে
নেওয়ার জন্য নয়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে ভয় দেখিয়ে সিনেমা বন্ধ করা হবে
কিংবা শিল্প-সাহিত্যকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে।
প্রশ্ন উঠতে
পারে আমরা কি ধীরে ধীরে অন্ধকার, অসহিষ্ণু এক সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? আমরা কি
এমন এক বাস্তবতার দিকে যাচ্ছি, যেখানে শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই
স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে? যদি রাষ্ট্র এই মুহূর্তে দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তাহলে
ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আরও বাড়বে।
সংস্কৃতির
বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে কেবল একটি সিনেমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; এটি
মানুষের স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন পছন্দ এবং নাগরিক অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান
নেওয়া। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনা শুধু একটি জেলার ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রের
দায়িত্ব স্পষ্ট আইনের শাসন নিশ্চিত করা, উগ্রবাদী চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করা
এবং নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করা। নইলে একদিন দেখা যাবে, সিনেমা হলের পর
বইয়ের তাক, নাট্যমঞ্চ, শিল্পকলা একাডেমি সবই মৌলবাদের অঘোষিত সেন্সরের অধীনে চলে
গেছে। তখন হয়তো প্রশ্ন করারও সুযোগ থাকবে না।
নুসরাত রুষা
শিক্ষার্থী,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা