× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আগামীর দিন শাপলা-পদ্মের মতো উত্থানের প্রত্যাশা

কাজী জিয়া উদ্দিন

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

কাজী জিয়া উদ্দিন।

কাজী জিয়া উদ্দিন।

অস্ট্রিয়ান চিন্তাবিদ পিটার ড্রাকারের মতে ‘ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভুল পূর্বাভাস হলো- ভবিষ্যৎকে নিজ হাতে নির্মাণ করা।’ আমাদের সামনে যে সময় অপেক্ষা করছে, তা যেন আর অতীতের পুনরাবৃত্তি না হয়। বিভক্তি, অবিশ্বাস, সংকীর্ণতা ও হতাশার গণ্ডি পেরিয়ে আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি, যেখানে মানুষের হৃদয়ে মানবিকতার আলো জ্বলবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার, আর উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সবার কাছে। 

ইতিহাস বলে, কোনো জাতির অগ্রযাত্রা কখনো সরলরেখায় ঘটে না। প্রতিকূলতা, সংকট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জাতির প্রকৃত শক্তি বিকশিত হয়। প্রাচীন মিশর নীলনদের বন্যাকে অভিশাপ নয়, সম্ভাবনায় রূপান্তর করেছিল। প্রাচীন গ্রিস রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও জ্ঞান, দর্শন ও গণতন্ত্রের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। মানবসভ্যতার এসব অধ্যায় আমাদের শেখায়, সংকট কোনো জাতির শেষ নয়; বরং নতুন যাত্রার সূচনা হতে পারে।

প্রকৃতিও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। শাপলা ও পদ্ম জলের মধ্যে জন্ম নেয়, কিন্তু জলের স্তর যত বাড়ে, তারাও তত ওপরে উঠে আলোয় প্রস্ফুটিত হয়। প্রতিকূল পরিবেশ তাদের বিকাশকে থামাতে পারে না। মানুষের জীবন এবং জাতির অগ্রগতির ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। চ্যালেঞ্জ এড়ানো নয়, বরং তাকে শক্তিতে রূপান্তর করার মধ্যেই নিহিত থাকে সাফল্যের ভিত্তি।

পদ্মকে প্রাচ্যের দর্শনে আত্মশুদ্ধি ও উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কাদামাটি থেকে উঠে এসেও সে নিজের সৌন্দর্য ও নির্মলতা ধরে রাখে। এই প্রতীক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তি বা জাতির প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার নৈতিক শক্তি দ্বারা। অনুকূল পরিবেশে ভালো থাকা সহজ; প্রকৃত কৃতিত্ব হলো প্রতিকূলতার মাঝেও সততা, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা অটুট রাখা।

আজকের বিশ্বে উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা প্রায়ই অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানুষ। শিক্ষিত, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। সেতু, রাস্তা ও অট্টালিকা উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সমাজের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানুষের চরিত্র, জ্ঞান ও কর্মক্ষমতার মধ্যে।

এ কারণেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজচিন্তার কিছু মৌলিক ধারণা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সামাজিক চুক্তির ধারণা আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আইনের শাসন নিশ্চিত করে, ব্যক্তি নয়-আইনই হবে সর্বোচ্চ। আর সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার। এসব মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়লে উন্নয়নের বাহ্যিক কাঠামো থাকলেও তার ভিত ক্রমে নড়বড়ে হয়ে যায়।

ইতিহাসের বহু ঘটনা এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়। প্রাচীন রোমের পতন কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের পেছনে শুধু বাহ্যিক আক্রমণ দায়ী ছিল না; নৈতিক অবক্ষয়, বৈষম্য, দুর্নীতি ও নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কোনো সমাজ তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন ব্যক্তিস্বার্থ সামষ্টিক কল্যাণের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের আশাবাদী করে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর জাপান শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া গ্রামীণ উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক সংহতিকে ভিত্তি করে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। সিঙ্গাপুর সীমিত সম্পদ নিয়েও সুশাসন, দক্ষ প্রশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের সাফল্যের পেছনে একটি সাধারণ সূত্র কাজ করেছে-প্রথমে মানুষ, তারপর প্রতিষ্ঠান, তারপর অবকাঠামো।

আমাদের সমাজের জন্যও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো জাতির ভবিষ্যৎ কেবল সরকারের হাতে নয়; তা নির্ভর করে নাগরিকদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের ওপরও। 

পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্র— সবাই মিলে একটি নৈতিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলে।

আফ্রিকার উবুন্টু দর্শন একটি গভীর মানবিক সত্য তুলে ধরে-‘আমি আছি, কারণ আমরা আছি।’ অর্থাৎ ব্যক্তির কল্যাণ সমাজের কল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতাও সভ্যতার অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। কোনো জাতি বিভাজনের দেয়াল তুলে নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সেতু নির্মাণের মাধ্যমে এগিয়ে যায়।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, তখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দূরদর্শিতা, সংযম ও নৈতিক নেতৃত্ব। নেতৃত্ব কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয় নয়; এটি আস্থা সৃষ্টি করার ক্ষমতা। জনগণ তখনই আশাবাদী হয়, যখন তারা নেতৃত্বের মধ্যে সততা, দায়বদ্ধতা ও মানবিকতা দেখতে পায়।

একইভাবে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কর্তব্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করে।

আমরা যদি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে সততা সম্মানিত হবে, যোগ্যতা মূল্যায়িত হবে, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা হবে, তাহলে ভবিষ্যৎ অবশ্যই উজ্জ্বল হবে। কারণ উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো সামাজিক আস্থা ও নৈতিক শক্তি।

আমরা যেন ভুলে না যাই-সভ্যতার প্রকৃত পরিমাপ তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, তার মানুষের চরিত্রের উচ্চতায়। কোনো জাতির প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়; বরং তার নৈতিক সাহস, সামাজিক সংহতি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্মিলিত স্বপ্নে নিহিত।

তাই আসুন, আমরা এমন এক আগামীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষের হৃদয় হবে আরও উদার, বিবেক হবে আরও জাগ্রত এবং সমাজ হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে নির্মিত। সেখানে কেউ একা এগিয়ে যাবে না; সবাই একসঙ্গে এগিয়ে যাবে-শাপলা-পদ্মের মতো প্রতিকূলতার জলরাশি ভেদ করে আলোর দিকে।

অতীত আমাদের শিক্ষা দেয়, বর্তমান আমাদের প্রস্তুত করে, আর ভবিষ্যৎ আমাদের আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে যদি আমরা জ্ঞান, সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধকে ধারণ করতে পারি, তবে আগামী দিন সত্যিই হবে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে জয় হবে মানুষের, মানবিকতার এবং একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ সমাজের।

 লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা