চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত জেনারেল হাসপাতালটি চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়। সেখানে ডাক্তার, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ থাকে। চিকিৎসকগণ রোগীর রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসাপত্র দেন, নার্সরা সেবা দান করেন। তাই অসুখ-বিসুখে মানুষ হাসপাতালের ওপর ভরসা করে। কিন্তু খোদ হাসপাতালেরই যখন অসুস্থ হওয়ার খবর আসে তখন মানুষের মনে হতাশা জন্ম না নিয়ে পারে না। তেমনি একটি খবর এসেছে মহানগরী চট্টগ্রাম থেকে। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত জেনারেল হাসপাতালটি চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। ফলে হাসপাতালটির ওয়ার্ডগুলো দিনের পর দিন রোগীশূন্য পড়ে থাকছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আউটডোরে কিছু রোগী প্রতিদিন এলেও ভর্তি রোগী নেই একজনও। এর প্রধান কারণ হাসপাতালটিতে এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি মেশিনসহ অনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি না থাকায় কোনো রোগী সেখানে ভর্তি হয় না। অথচ চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। তবে একসময় হাসপাতালটিতে সবধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামই ছিল। গত দুই বছরে সেগুলোর বেশিরভাগ উধাও হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা চিকিৎসা না হলেও খরচের কোনো কমতি নেই। আছে অ্যাম্বুলেন্সও। তবে তা রোগী বহনের পরিবর্তে ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালটির এমন দুর্দশার বিষয়ে এর দায়িত্বপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হোসনে আরা প্রতিদিনের বাংলাদেশ প্রতিনিধিকে বলেছেন, তারা আউটডোরে সব ধরনের রোগীকে সেবা দিয়ে থাকেন। কাউকেই তারা ফেরত দেন না। তিনি হয়তো ভুলেই গেছেন, হাসপাতালটি একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, চ্যারিটেবল ডিসপেন্সারি নয়। তাই শুধু আউটডোরে চিকিৎসা দিয়েই তারা দায়িত্ব পালনের আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন না। অন্যদিকে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেছেন, হাসপাতালটিকে পুরোদমে চালু রাখার জন্য তারা এটিকে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ইউনিট হিসেবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন।
ডা. ইমাম হোসেনের বক্তব্য যে কতটা হাস্যকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেখানে সরঞ্জামের অভাবে জেনারেল হাসপাতালটি নিজেই অসুস্থ, সেখানে সেটাকে ক্যানসার বিশেষায়িত হাসপাতালে পরিণত করার উদ্যোগ ভেতরে ক্ষত রেখে বাইরে প্রলেপ দেওয়ারই শামিল। কেননা, নগরবাসীর যে সেবাদানের জন্য হাসপাতালটি চালু করা হয়েছিল, তা সঠিকভাবে না করে সেটাকে ক্যানসার চিকিৎসার ‘বিশেষজ্ঞ’ হাসপাতালে পরিণত করার চিন্তাভাবনা ফরজ রেখে নফল কাজেরই নামান্তর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার উদাহরণ। তাদের অবহেলা-উদাসীনতার কারণে হাসপাতালটির ৫০টি শয্যা দিনের পর দিন খালি পড়ে থাকছে। অথচ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা ফেরত যাচ্ছে এবং বাইরের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার লেজেগোবরে অবস্থার কথা কারও অজানা নয়। যারা অনন্যোপায় হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার্থে যেতে বাধ্য হন, তাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে রাজধানীর বড় বড় হাসপাতাল, সবখানেই অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত। বেডের অভাবে রোগীদের বারান্দায় শুইয়ে রাখা হয়। ওষুধ আছে তো ডাক্তার নেই, আবার ডাক্তার থাকে তো ওষুধ আনতে হয় বাইরে থেকে। কোথাও আবার অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাবে রোগীরা দম বন্ধ হয়ে মারা যায়। সম্প্রতি হামের সংক্রমণে শিশুমৃত্যুর যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর অধিকাংশের কারণ হাসপাতালের পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব, চিকিৎসকদের অবহেলা ও উদাসীনতা। এ নিয়ে দেশবাসী সোচ্চার হয়েছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছে। কিন্তু অবস্থার তেমন কোনে উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ গতকালের পত্রিকায়ও হামের উপসর্গে ৫ শিশুর মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে জনসাধারণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মফস্বলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পোস্টিং পাওয়া চিকিৎসকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন দিনের পর দিন। যারা থাকেন, তারা হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের চেয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকেন বেশি। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা হয় বিনা চিকিৎসায় ফেরত যান, না হয় নার্স-ওয়ার্ড বয়দের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে নতুন জটিলতায় আক্রান্ত হন। পাশাপাশি ওইসব হাসপাতালের জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ওষুধ ডাক্তার-কর্মচারীদের যৌথ উদ্যোগে বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়টি তো আছেই। এসব নিয়ে কথাবার্তা অনেক হলেও কেউ তা কানে নেন বলে মনে হয় না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালটির দৈন্যদশা দেশের গোটা স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনারই প্রতিচ্ছবি বলা যায়। খোঁজ নিলে সরকারি প্রায় সব হাসপাতালেরই অনুরূপ চিত্র পাওয়া যাবে। হতাশার বিষয় হলো, এসব নিয়ে নিরন্তর লেখালেখি হলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। প্রশ্ন হলোÑ কর্তৃপক্ষ নামের কুম্ভকর্ণের নিদ্রা কী আদৌ ভঙ্গ হবে?