এস এম সৈকত
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই অনুকরণীয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেটি যথার্থও। দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই অনুকরণীয়। তবে উত্তরণ কখনোই একটি প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল না। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এটিকে পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ। অতিরিক্ত সময় চাওয়ার মাধ্যমে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেÑ প্রতীকী অর্জনের চেয়ে প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল দেরিতে উত্তরণ নয়; সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই উত্তরণ। তাই বাস্তববাদী এই সিদ্ধান্তের জন্য সরকার প্রশংসার দাবিদার। এমন একসময়ে, যখন উত্তরণকে প্রায়ই মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তখন প্রক্রিয়াটিকে কিছুটা ধীর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। এটি স্বীকার করার মতো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রয়োজন, কেননা টেকসই উন্নয়নকে কত দ্রুত একটি সীমারেখা অতিক্রম করা হলো তার ভিত্তিতে মাপা হয় না; বরং মাপা হয় সীমারেখা অতিক্রমের পর অর্জিত উন্নয়ন কতটা ধরে রাখা গেল তার ওপর। তাই ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসা নয়; বরং আরও শক্তিশালী, মসৃণ এবং টেকসই উত্তরণের প্রতি অঙ্গীকার।
বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ উন্নয়নগাথার নাম। স্বাধীনতার পর নানা সংকট, দুর্যোগ ও সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে দেশটি আজ বৈশ্বিক পরিসরে উন্নয়ন-সফলতার উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এলডিসি উত্তরণকে যদি আমরা উন্নয়নের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখি, তাহলে ভুল করব। এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তার ধরন বদলাবে, বাণিজ্যিক সুবিধার কিছু অংশ ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখে আমাদের আরও সক্ষম হয়ে দাঁড়াতে হবে। জাতিসংঘের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন গাইডও একই বার্তা দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, উত্তরণকে কোনো সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং কাঠামোগত রূপান্তর, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
আগামী তিন বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এখন এমন একটি সম্পদের মালিক, যা অনেক দেশ চাইলেও পায় নাÑ সময়। কিন্তু সময় নিজে নিজে কোনো পরিবর্তন আনে না। সময় তখনই মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন সেটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। এই প্রস্তুতির আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত মানুষ। এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা রপ্তানি, শুল্ক সুবিধা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ কিংবা উন্নয়ন অর্থায়নের কথা বলি। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো খাত নয়, কোনো অবকাঠামো নয়; বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কর্মক্ষম জনগণ। বিশেষ করে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সুযোগ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উন্নয়নের ইতিহাস বলে, অনেক দেশ তাদের অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে এই জনমিতিক সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে।
আজকের বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সবুজ অর্থনীতি কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। ওইসিডির প্রোডাকশন ট্রান্সফরমেশন পলিসি রিভিউ অব বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণা বলছে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনের ওপর। সুতরাং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরিতে এখনই বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। মোদ্দাকথাÑ বাংলাদেশ যদি তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পারে, তাহলেই জনমিতিক সুবিধাকে প্রকৃত অর্থে উত্তরণের সুবিধায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রস্তুতি জরুরি। পোশাক শিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এই খাত। কিন্তু একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিও তৈরি করে। এনহ্যান্সড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্যিক সুবিধার কাঠামো পরিবর্তিত হলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য রপ্তানি বৈচিত্র্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা শিল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক সেবা খাতকে শক্তিশালী করতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য শুধু নতুন রপ্তানি খাত তৈরি করার বিষয় নয়; এটি এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়, যা বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলা করতে পারে এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম।
একই সঙ্গে উন্নয়ন অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। উত্তরণের পর ধীরে ধীরে কিছু স্বল্পসুদে ঋণ ও বিশেষ সুবিধা কমে আসবে। ফলে নিজের উন্নয়নের ব্যয় ক্রমশ নিজেকেই বহন করতে হবে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহায়তায় প্রণীত বাংলাদেশের স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি যথার্থভাবেই অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে কর ব্যবস্থা সংস্কারকে কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। প্রয়োজন একটি ন্যায্য, জনকল্যাণমুখী এবং নাগরিকবান্ধব কর ব্যবস্থা, যেখানে করের অর্থ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিনিয়োগ হবে। মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং তরুণদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরির জন্য রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত পরিকল্পনা তৈরি নয়; পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে পরিকল্পনার অভাব নেই। স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজিতেও উত্তরণ প্রস্তুতির জন্য বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু একটি কৌশলপত্র তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তবে রূপ নেয়। সরকার ইতোমধ্যে সময় নিশ্চিত করেছে। এখন প্রয়োজন উত্তরণ নিয়ে প্রচারণা থেকে উত্তরণ-প্রস্তুতির দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। এই অতিরিক্ত সময়ের সাফল্য নির্ধারিত হবে কত বছর পাওয়া গেল তার ভিত্তিতে নয়, বরং সেই বছরগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হলো তার ভিত্তিতে। এই তিন বছরকে তাই অপেক্ষার সময় হিসেবে নয়, বাস্তবায়নের সময় হিসেবে দেখতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন কিংবা লবণাক্ততাÑ সবকিছুই অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফ্রিডরিখ এবার্ট স্টিফটাংয়ের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও বলছে, উত্তরণ প্রস্তুতির সঙ্গে জলবায়ু সহনশীলতাকে একীভূত করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি তহবিলসহ নতুন জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগগুলো কাজে লাগানো, অভিযোজন বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জলবায়ু ঝুঁকিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু সহনশীলতা আর কেবল পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
স্বাস্থ্য খাতেও একই ধরনের দূরদর্শিতা প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, উত্তরণের ফলে ভবিষ্যতে কিছু ওষুধ-সংক্রান্ত সুবিধার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই দেশীয় গবেষণা, উদ্ভাবন, ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এখন থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, এলডিসি উত্তরণ এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন দুটি আলাদা যাত্রা নয়। এগুলো একই পথের অংশ। দক্ষ জনশক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু সহনশীলতা এবং উদ্ভাবনী অর্থনীতিÑ এসবই যেমন সফল উত্তরণের শর্ত, তেমনি ২০৩০ সালের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেরও ভিত্তি।
সে হিসেবে বলা যায়, ২০২৯ সাল পর্যন্ত পাওয়া অতিরিক্ত তিন বছর তাই কেবল একটি সময়সীমা বৃদ্ধি নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য নিজের ভিত আরও শক্ত করার সুযোগ। আবারও বলতে হচ্ছে, এই অতিরিক্ত তিন বছর আমাদের হাতে এক অমূল্য সম্পদ তুলে দিয়েছেÑ সময়। কিন্তু সময় নিজে নিজে প্রস্তুতি তৈরি করে না। প্রস্তুতি তৈরি করে সংস্কার। প্রস্তুতি তৈরি করে মানুষের ওপর বিনিয়োগ। প্রস্তুতি তৈরি করে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সাহস। দশ বছর পর মানুষ হয়তো মনে রাখবে না বাংলাদেশ ঠিক কোন সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে। তারা মনে রাখবে, এই সময়টুকু আমরা কীভাবে ব্যবহার করেছি। তরুণদের জন্য আমরা কী সুযোগ তৈরি করেছি, ব্যবসাগুলো কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে, সমাজ কতটা সহনশীল হয়েছে, আর উন্নয়নের সুফল কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছেছে। আসল চ্যালেঞ্জ উত্তরণ নয়; আসল চ্যালেঞ্জ হলো জনমিতিক সুবিধাকে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করা এবং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যা আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত। ঘড়ির কাঁটা রিসেট হয়েছে। এখন শুরু হোক আসল প্রস্তুতি।
এস এম সৈকত
নির্বাহী পরিচালক, সিরাক-বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক যুবনীতি বিশেষজ্ঞ