× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক ভয়হীন

মতিলাল দেব রায়

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

মতিলাল দেব রায়, কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মতিলাল দেব রায়, কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়, এটি একজন মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ ও সামাজিক চেতনা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, প্রায়শই দেশের গণমাধ্যমে কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা সামনে আসে। কখনও শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নির্যাতন, কখনও সহপাঠীর অশালীন আচরণ, আবার কখনও বহিরাগতরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের মতো অভিযোগের কথা শোনা যায়। এসব ঘটনা শুধু একজন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।


সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনারে প্রায় দেড় দশক পরও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা হয়নি। বিশেষ করে অধিকাংশ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কমিটি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগ কার্যকর নয়। প্রকাশিত সংবাদ বলছে, ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে প্রথম যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা, অভিযোগ ও তদন্ত সেল গঠনের দাবি ওঠে। পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসিতে এক তরুণীকে বিবস্ত্র করার ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলে এ বিষয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। ২০০০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) পক্ষে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ছয় বছর পর হাইকোর্ট ঢাকা সিটি বিশেষ করে ঢাবি এলাকায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনসহ একাধিক নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিএনডব্লিউএলএ ২০০৮ সালে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নতুন করে দিকনির্দেশনা চেয়ে রিট করে। এরপর ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট ‘যৌন হয়রানি’র সংজ্ঞা নির্ধারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনসহ একাধিক নির্দেশনা দেন। রায়ে বলা হয়েছিল, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিতে কমপক্ষে পাঁচজন সদস্য থাকবেন। কমিটির বেশিরভাগ সদস্য হবেন নারী এবং প্রধানও হবেন নারী। প্রতি শিক্ষাবর্ষের পাঠদান কার্যক্রমের শুরুতে এবং প্রতি মাসে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

২০২৪ সালের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪৪ হাজার ৫৭৩টি। এর মধ্যে বেসরকারি ৪১ হাজার ৮৪৫টি এবং সরকারি ২ হাজার ৭২৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ওই রায়ের ১৭ বছর পরও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই কমিটি হয়নি। আবার যেগুলোতে হয়েছে, সেসব কমিটির বেশিরভাগই কার্যকর নয়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার হলে কমিটির বিষয়টি সামনে আসে। কিছুদিন পর আবার চাপা পড়ে যায়। একই অবস্থা মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকলেও বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা হয়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও কেন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। কোথাও কমিটি নেই, কোথাও থাকলেও তা নিষ্ক্রিয়। অনেক শিক্ষার্থী জানেই না এমন কোনো কমিটি আছে কি না, কিংবা অভিযোগ কোথায় করতে হবে। এই বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হচ্ছে। কখনও শিক্ষক, কখনও সহপাঠী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সক্রিয় প্রতিরোধ কমিটি গঠন, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। কারণ, ভয়মুক্ত পরিবেশ ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা কখনও সম্ভব নয়।

আসলে যৌন হয়রানি বলতে কেবল শারীরিক স্পর্শ বা আক্রমণকে বোঝায় না। অশালীন মন্তব্য, ইঙ্গিতপূর্ণ কথা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত বার্তা পাঠানো, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সম্পর্ক স্থাপনে চাপ সৃষ্টিÑ সবই যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা, ভয় কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় মুখ খুলতে পারেন না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটি কার্যকর প্রতিরোধ কমিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এই কমিটির কাজ শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়; বরং সচেতনতা সৃষ্টি, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কমিটিতে নারী সদস্যের পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকতে হবে, পাশাপাশি শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও মনোবিজ্ঞানী অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাকে মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের সমাজে এখনও অনেকেই এসব ঘটনাকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলে এড়িয়ে যেতে চান। আবার ভুক্তভোগীকেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়Ñ কেন সে সেখানে গিয়েছিল, কী পোশাক পরেছিল, কেন প্রতিবাদ করেনি ইত্যাদি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধীদের উৎসাহিত করে। মনে রাখতে হবেÑ কোনো অবস্থাতেই হয়রানির দায় ভুক্তভোগীর নয়, দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর।

প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন হয়রানিও বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের ছবি বিকৃত করে ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা হুমকি দেওয়া এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তাই প্রতিরোধ কমিটিকে শুধু ক্যাম্পাস নয়, ডিজিটাল পরিসরেও নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাও চালু করা প্রয়োজন।

শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন, তিনি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসদৃশ। তাই শিক্ষকদের আচরণ, ভাষা ও দায়িত্ববোধ হতে হবে সর্বোচ্চ মানের। কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে ধামাচাপা না দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে অভিযোগ গোপন করা হয়, যা অপরাধকে আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রকৃত সুনাম আসে অপরাধ লুকিয়ে নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

অভিভাবকদেরও সচেতন হতে বলছি। সন্তান আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনছে কি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে ভয় পাচ্ছে কি না, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে কি নাÑ এসব বিষয়ে নজর রাখা দরকার। সন্তান যেন নির্ভয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ পরিবারেই তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বও কম নয়। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিয়মিত এর কার্যক্রম মনিটর করতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিধান থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাক্রমে নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং জেন্ডার সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

যে সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ নয়, সে সমাজ কখনও সত্যিকারের শিক্ষিত হতে পারে না। একটি মেয়ে বা ছেলে যদি বিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয় নিয়ে প্রবেশ করে, তাহলে সেখানে জ্ঞানের পরিবেশ তৈরি হয় না; তৈরি হয় আতঙ্কের সংস্কৃতি। তাই যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু নারীদের লড়াই নয়; এটি মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার লড়াই। তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সক্রিয়, জবাবদিহিতামূলক ও কার্যকর প্রতিরোধ কমিটি গঠন অপরিহার্য। নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমি চাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক মুক্ত চিন্তা ও মর্যাদার স্থানÑ ভয় বা নিপীড়নের নয়।


মতিলাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা