ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৫ ঘণ্টা আগে
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি
রাজনীতির অরণ্যে এক বিচিত্র প্রজাতির প্রাণীর দেখা মেলে। ইহারা কেবল রাজনীতিবিদ নহেন, আবার নিখাদ আমলাও নহেন। ইহারা কখনো কূটনীতিক, কখনো উপদেষ্টা, কখনো রাষ্ট্রনায়কের পরামর্শদাতা, কখনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুভাকাঙ্ক্ষী; আবার সুযোগ পাইলে বিশ্বমানবতার অভিভাবক সাজিতেও দ্বিধা করেন না। ইহাদের জীবনবৃত্তান্ত যত দীর্ঘ, দেশপ্রেমের পাল্লা তত হালকা কি না— তাহা অবশ্য গবেষণার বিষয়।
সম্প্রতি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এক বিরাট আন্তর্জাতিক সম্মানের অধিকারী হইয়াছে। বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি সংস্থার সর্বোচ্চ পদে বাংলাদেশের একজন বরেণ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হইয়াছেন। ‘মারহাবা’ সংবাদটি শুনিয়া দেশবাসী আনন্দিত হইলেন, কূটনীতিকগণ আত্মহারা হইলেন; আর সেই সুযোগে হিসাবরক্ষকগণ ক্যালকুলেটর বাহির করিলেন। কারণ, সম্মানটি যত বড়, তাহার মূল্যটিও তত ক্ষুদ্র নহে।
শোনা যাইতেছে, এই সম্মান রক্ষা করিতে গিয়া আমাদের দরিদ্র বাংলাদেশের রাজকোষ হইতে কয়েক ডজন কোটি টাকা ব্যয় হইতে পারে। কারণ, উক্ত সংস্থাটির নিয়ম হইল— তাহারা সভাপতিকে পদ দেন, কিন্তু বেতন দেন না। বিষয়টি অনেকটা সেই প্রাচীন আমলের জমিদারের মতো, যিনি প্রজাকে বলিতেছেন—‘তোমাকে আমরা রাজমুকুট পরাইয়া দিলাম, এখন এই মুকুটের রক্ষণাবেক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খরচটুকু নিজ দায়িত্বেই বহন করিও।’
বাংলাদেশও সেই উদারতা প্রদর্শনে সদাপ্রস্তুত। গরিব দেশের জনগণ বহু কাল ধরিয়াই বিশ্ব-দরবারে সম্মান ‘ক্রয়’ করিতে অভ্যস্ত। কেহ পদক কেনেন, কেহ সম্মেলন কেনেন, কেহবা মর্যাদা কেনেন। এখন যদি কেহ আন্তর্জাতিক গৌরবের আরও একটি স্তম্ভ নির্মাণ করিতে চাহেন, তাহাতে বিস্ময়ের কী রহিয়াছে?
অবশ্য সমর্থকগণ দাবি করিতেছেন, ইহা কোনো অপচয় নহে— বরং ‘বিনিয়োগ’। শুনিয়া আমার এক আত্মীয়ের কথা মনে পড়িল। তিনি একবার ধারদেনা করিয়া তিনখানা দামি স্যুট বানাইয়া বলিয়াছিলেন, ‘ইহা বিলাসিতা নহে, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।’ পরে দেখা গেল, সেই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আসিবার পূর্বেই পাওনাদাররা দুয়ারে আসিয়া হাজির হইয়াছে।
তবে যিনি এই সম্মানের কেন্দ্রে অবস্থান করিতেছেন, তাঁহার জীবনযাত্রা ও কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করিলে বোঝা যায়, তিনি অতি সাধারণ কোনো মানুষ নহেন। তিনি সেই বিরল মেধাবী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত, যাঁহারা চাকরি ছাড়িয়াও চাকরিতে থাকেন, দেশ ছাড়িয়াও দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দৃশ্যত কোনো পদে না থাকিলেও ক্ষমতার অন্দরমহলে অনায়াসে বিচরণ করেন।
কেহ কেহ বলেন, একদা তিনি প্রশাসনে এমন দ্রুত পদোন্নতির ইতিহাস রচনা করিয়াছিলেন যে, মন্ত্রণালয়ের লিফট পর্যন্ত বিস্ময়ে বিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছিল। আবার কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি এমন দ্রুত দেশান্তরী হইলেন যে, বিমানবন্দরের রানওয়ে পর্যন্ত হতবাক হইয়া রহিয়া গেল।
বিদেশে গিয়া অনেকেই প্রবাসী হন; কিন্তু তিনি প্রবাসী হইয়াও স্বদেশের রাজনীতির নাড়ির স্পন্দন বুঝিবার বিরল প্রতিভা অর্জন করিলেন। এরপর শুরু হইল তাঁহার ‘উপদেষ্টা’ যুগ। কখনো বিশেষ প্রতিনিধি, কখনো নিরাপত্তা উপদেষ্টা, কখনো আন্তর্জাতিক আলোচনার মধ্যস্থতাকারী, আবার কখনো বাণিজ্য বা কূটনীতির অদৃশ্য কারিগর— রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি দরজার একটি করিয়া অতিরিক্ত চাবি যেন সর্বদা তাঁহার নিকট সংরক্ষিত থাকে; মূল্য তাহার যাহাই হউক না কেন।
সমালোচকগণ মনে করেন, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি যাহার সহিত দেখা করেন, অল্পদিনের মধ্যেই তাহার আস্থাভাজন হইয়া ওঠেন। রাজধানী বদলায়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলায়; কিন্তু তাঁহার উপস্থিতি বদলায় না। যেন তিনি ব্যক্তি নহেন, এক প্রকার চলমান প্রতিষ্ঠান।
অবশেষে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত হইলেন। জাতি আনন্দ করিল, সমালোচকগণ ভ্রূকুটি করিলেন, আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ দূরবীন লইয়া পরবর্তী গন্তব্য অনুসন্ধান আরম্ভ করিলেন।
কেহ বলিলেন, ‘ইহা কেবল শুরু।’
কেহ বলিলেন, ‘পরবর্তী লক্ষ্য আরও উচ্চতর কোনো বৈশ্বিক পদ।’
আরও দূরদর্শী ব্যক্তিগণ বলিলেন, ‘যখন স্বপ্ন দেখিবেই, তখন ছোট করিয়া দেখিবার প্রয়োজন কী?’
যাহা হউক, রাজনীতির মঞ্চে শেষ অঙ্কের পূর্বে কোনো চরিত্রকে অবসরপ্রাপ্ত বলিয়া ধরে লওয়া বিপজ্জনক। কারণ আমাদের দেশে অনেকেই অবসর গ্রহণের পর প্রকৃত কর্মজীবন আরম্ভ করেন। সুতরাং অপেক্ষা করিতে হইবে। দেখা যাউক, এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ফলস্বরূপ বাংলাদেশ বিশ্বসভায় অধিক মর্যাদা লাভ করে, না কি কোনো এক সুদূর ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক জীবনবৃত্তান্তের আরও একটি সোনালি পঙ্ক্তি সংযোজিত হয়।
ইতিহাসের মজাই এইখানে— যাহা একদল লোকের নিকট জাতীয় অর্জন, অন্য দলের নিকট তাহাই ব্যক্তিগত উন্নয়ন প্রকল্প।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ