× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাসযোগ্য পৃথিবী ও দেশ গড়ার প্রত্যয়

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৯ ঘণ্টা আগে

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের এই প্রিয় নীল গ্রহটি আজ নানামুখী সংকটে জর্জরিত হয়ে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্ম জ্বালানি দহন বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ এবং অনিয়মিত আবহাওয়ার জন্ম দিচ্ছে।

মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হওয়া পৃথিবীর ভারসাম্যকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। প্রতিবছর লাখ লাখ হেক্টর অরণ্য কেটে ফেলার কারণে কোটি কোটি বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ তাদের চেনা বাসস্থান হারাচ্ছে। বন নিধনের এই সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতের চক্রে, যার ফলে কোথাও দেখা দিচ্ছে চরম খরা আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা। প্রকৃতিগত এই বিপর্যয় বিশ্বজুড়ে বাস্তুসংস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পৃথিবীর মহাসাগর এবং নদীগুলো আজ মানুষের তৈরি বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন টন টন অবিয়োজনযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী জলাশয়ে নিক্ষেপ করার ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হচ্ছে। প্লাস্টিকের কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সামুদ্রিক মাছের মাধ্যমে ঘুরেফিরে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এবং কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে। বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধূলিকণার কারণে পৃথিবীর প্রধান প্রধান শহরগুলোর বাতাস বিষে পরিণত হয়েছে, যা নিঃশ্বাসের অযোগ্য। মাটি, পানি ও বায়ুর এই ত্রিমুখী দূষণ সামগ্রিকভাবে পুরো পৃথিবীকে একটি জীবন্ত নরকে পরিণত করছে, যেখানে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।

আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের দিকে তাকালে পরিবেশের এই ক্ষত আরও স্পষ্ট এবং ভয়াবহ রূপ নিয়ে সামনে আসে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর বাতাস আজ পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় বারবার শীর্ষ স্থান দখল করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ইটের ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া এবং পুরাতন যানবাহনের কার্বন নির্গমনের ফলে সাধারণ মানুষ ফুসফুসের ক্যানসার ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাস আজ এদেশে এক পরম বিলাসিতা। এদেশের জীবনরেখা নদীগুলো আজ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে তুরাগ নদের পানি কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য আর অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্যের কারণে কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধময় হয়ে গেছে। নদীতে কোনো অক্সিজেন না থাকায় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে- আর নদীর তীরবর্তী মানুষজন চর্মরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি চাষাবাদের জমিতে প্রবেশ করায় বাংলাদেশের কৃষি খাত এক বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার মিষ্টি পানির উৎসগুলো লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাস্তুচ্যুত হয়ে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বাংলাদেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন এবং পার্বত্য বনাঞ্চল আজ একশ্রেণির ভূমিদস্যুদের কারণে উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বনের গাছ কেটে ইটের ভাটায় পোড়ানো এবং বন্যপ্রাণী শিকারের ফলে আমাদের প্রাকৃতিক ঢালগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে সিডর, আইলার মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো এখন সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানছে এবং প্রতিবছর দেশের অর্থনীতি ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে।

দেশের সব নদীতে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে প্রতিটি শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকরী ‘বর্জ্য শোধনাগার’ বা ইটিপি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নদী দখলকারীদের কঠোর আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীগুলোর নাব্যতা ও স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের পানির উৎসগুলো দূষণমুক্ত রাখা আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত।

প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করে পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ‘রিসাইক্লিং’ বা পুনরুৎপাদন পদ্ধতি চালু করতে হবে, যাতে কোনো বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে বা জলাশয়ে পতিত না হয়। উৎসস্থলেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

পরিবেশ সচেতনতার এই বৈশ্বিক লড়াইয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে। সেই সম্মেলনের প্রথম দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ ৫ জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৭৪ সাল থেকে এটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হলো পৃথিবীর সর্বস্তরের মানুষকে প্রকৃতির প্রতি তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

বর্তমান ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে আজারবাইজান এবং এর মূল অনুষ্ঠানসমূহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজধানী বাকুতে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে : ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ এই সময়োপযোগী প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জলবায়ুর এই চরম সংকটকালে প্রকৃতিই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।

 

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

কলাম লেখক ও কথাসাহিত্যিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা