সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার নিরঞ্জন রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমরা যখন স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন প্রায়ই একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতাম, তা হচ্ছে জীবনের অপর নাম কী?
বিজ্ঞান বইয়ের একটি অধ্যায়ের শুরুটাই হতো এই প্রশ্ন দিয়ে। এর সহজ উত্তর হচ্ছে পানি। অর্থাৎ মানুষের জীবনের অপর নাম পানি। এমনকি ভাবসম্প্রসারণ হিসেবেও আমাদের শিখতে এবং পরীক্ষার খাতায় লিখতে হয়েছে ‘জীবনের অপর নাম পানি’ নিয়ে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ পানি ছাড়া এক মুহূর্তও বাঁচতে পারে না। শুধু মানুষ কেন? গাছপালা এবং অন্যান্য প্রাণীও পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না। মানুষের শরীরের দুই-তৃতীয়াংশই পানি। তাই শরীর সুস্থ রাখার জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করতে হয়। অন্যান্য খাবার না খেলেও একটা সময় পর্যন্ত, এমনকি দুই/তিন দিন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু পানি পান না করে মানুষ কয়েক ঘণ্টাও বাঁচতে পারে না। একসময় আমাদের দেশে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, যার অন্যতম কারণ হচ্ছে শরীরে পানিশূন্যতা। মানুষের জীবনধারণের জন্য পানি হচ্ছে অত্যাবশ্যিক এবং অপরিহার্য উপাদান, যা ছাড়া মানুষের এক দিনও চলার উপায় নেই। আমাদের জীবনে পানির গুরুত্ব বোঝানোর জন্যই বলা হয়ে থাকে যে, জীবনের অপর নাম পানি।
আমাদের স্কুলজীবনে পানির গুরুত্ব সেভাবে
না বুঝলেও, পরীক্ষা পাসের জন্য হলেও যখন ‘জীবনের অপর নাম যে পানি’ সেটা বেশ ভালোভাবে
রপ্ত করেছি, ঠিক তখনই একদিন আমাদের প্রধান শিক্ষক ক্লাস নিতে এসে প্রশ্ন করলেন ‘বলত,
জীবনের অপর নাম কী?’। আমরা যেহেতু সবাই বিষয়টি শিখেছি, তাই সবাই উচ্চস্বরে উত্তর দিলাম
‘পানি’। স্যার বললেন ‘না, একজনের উত্তরও সঠিক হয়নি’। আমরা তো অবাক। খুঁজে পাচ্ছিলাম
না যে স্যার উত্তর সঠিক হয়নি বলছেন কেন। আমরা তো এই বিষয়টি ভালোভাবে শিখেছি এবং পরীক্ষার
খাতায় লিখে রীতিমতো নম্বরও পেয়েছি। তাহলে হেড স্যার সঠিক হয়নি বলছেন কেন। আমরা ভুলটা
কোথায় বললাম। এই ভেবে আমরা ছাত্রছাত্রীরা হতবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমাদের
এমন অসহায় অবস্থা দেখে হেড স্যার তখন বললেন, ‘আরে জীবনের অপর নাম পানি না। জীবনের অপর
নাম হচ্ছে অক্সিজেন’। আমরা তখন হতবাক হয়ে বললাম, ‘কি বলেন স্যার? এটা কীভাবে সম্ভব’।
স্যার তখন বললেন ‘শোন, পানির অপর নাম জীবন হলেও পানি ছাড়া মানুষ কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত,
এমনকি এক দিনও বেঁচে থাকতে পারে’। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বললেন, ‘কিন্তু অক্সিজেন এমন
এক উপাদান, যা ছাড়া মানুষ এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারবে না। তাই তো জীবনের অপর নাম
অক্সিজেন’।
স্যারের কথাগুলো শোনার পর ভাবছিলাম যে
আসলেই তো তাই। যে উপাদান ছাড়া কয়েক ঘণ্টা বা এক দিন বা তার বেশি সময় বেঁচে থাকা যাবে,
সেটা কেন হতে যাবে জীবনের অপর নাম। পক্ষান্তরে যে উপাদান ছাড়া মানুষ এক মুহূর্ত, এমনকি
দশ মিনিট পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবে না, সেটাই হওয়া উচিত জীবনের অপর নাম। এ কারণেই
আমাদের হেড স্যার সেদিন বলেছিলেন যে, জীবনের অপর নাম পানি না, অক্সিজেন। এখানে একটি
কথা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলে রাখা ভালো যে আমাদের প্রধান শিক্ষকের অক্সিজেন নিয়ে এই
ধারণা কি তার নিজস্ব, নাকি অন্য কোথাও থেকে জেনেছিলেন, তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব
হয়নি। আমি এই বক্তব্যটি আমাদের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেই শুনেছিলাম। অন্য কোথাও থেকে
শুনিনি বা কোনো বইয়েও পাইনি। জীবনের অপর নাম যে পানি, সেটা অনেকের কাছ থেকেই শুনেছি
এবং অনেক বইয়েও পড়েছি। কিন্তু জীবনের অপর নাম যে অক্সিজেন, এমন ধারণা আমাদের প্রধান
শিক্ষক ব্যতীত অন্য কারও কাছ থেকে শুনিনি বা কোনো বইয়েও পাইনি।
এতদিন পরে এসে বুঝতে পারছি যে জীবনের
অপর নাম আসলে পানি বা অক্সিজেন, কোনোটাই নয়। মানুসের জীবনের অপর নাম এখন ইন্টারনেট।
মানুষ এখন ইন্টারনেট সেবার ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে এই সেবা ছাড়া এক মুহূর্ত চলার উপায়
নেই। শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, যোগাযোগ এবং বিনোদনÑ সবকিছুই এখন ইন্টারনেট নির্ভরশীল।
বিশ্বের সকল ব্যবস্থাই এখন ইন্টারনেট ভিত্তিক। উন্নত, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল, সব দেশের
কার্যক্রম এখন ইন্টারনেট-নির্ভর হয়ে গেছে। মানুষের জীবনধারণের সবকিছু এখন অনলাইনে পরিচালিত
হয়। আর অনলাইনের আসল ভিত্তিই হচ্ছে ইন্টারনেট সুবিধা। দিনের শুরুটা হয় ইন্টারনেটে আবহাওয়া
এবং ট্রাফিকের খবর জানার মধ্য দিয়ে। এরপর সারা দিনে যত কাজকর্ম সম্পন্ন করা হয় তার
সবকিছুই চলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ইন্টারনেটের মাধ্যমেই ব্যাংকের লেনদেন সম্পন্ন হয়,
স্টক মার্কেটে লেনদেন হয়, অন্যান্য ক্রয়-বিক্রয় পরিচালিত হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। মানুষের
যাতায়াতের জন্য যে ট্রেন, বাস, লঞ্চ এবং এয়ারলাইনসের ব্যবস্থা আছে, সেখানেও ইন্টারনেটের
সহযোগিতা প্রয়োজন। মোটকথা, মানুষের জীবনযাত্রার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার সবকিছুই
পরিচালিত হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে।
সমগ্র বিশ্ব এখন এতটাই ইন্টারনেট নির্ভরশীল
হয়ে পড়েছে, যে ইন্টারনেট সেবা ব্যতীত পুরো বিশ্ব স্থবির বা অচল হয়ে যাবে। কোনো কারণে
যদি ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটে, তাহলে সমগ্র বিশ্বে এক ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। এক
দিন যদি কোনো ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্বে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি সাধিত
হবে। গত শতাব্দীর শেষের দিকে ওয়াই-টু-কে (Y2K) নিয়ে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের আতঙ্ক দেখা
দিয়েছিল। সবাই গভীর উদ্বেগের সাথে বলতে শুরু করেছিল ছিল যে এই ওয়াই-টু-কে সমস্যার কারণে
ব্যাংকে লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে, বিমান চলবে না, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ থমকে যাবে, এরকম
আরও অনেক জটিলতা দেখা দেবে। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০০ সাল পার হয়ে গেলেও, তেমন কিছুই ঘটেনি।
তবে এই ওয়াই-টু-কে সমস্যা সমাধানের নামে উন্নত বিশ্বের, বিশেষ করে আমেরিকার অনেক কম্পিউটার
বিশেষজ্ঞ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।
যখন ওয়াই-টু-কে সমস্যার কারণে পৃথিবীতে
সবকিছু অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল, তখন বিশ্বের সবকিছু আজকের দিনের মতো এতটা
ইন্টারনেট নির্ভরশীল হয়ে ওঠেনি। বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব যে মাত্রার ইন্টারনেট-নির্ভর
হয়ে গেছে, তাতে কোনো কারণে যদি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে যেকোনো মাত্রার
ক্ষতি সাধিত হবে, তা কল্পনা করাও কঠিন। এক কথায় বিশ্বে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে
যদি ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। বছর দুয়েক আগে কানাডায় একটি ইন্টারনেট সেবা
প্রদানকারী কোম্পানির ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটেছিল, যা মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল।
আর এতেই ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের কার্যক্রমের মারাত্মক ক্ষতি
হয়েছিল। যারা গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিল, তারা আর ফিরতে পারছিল
না। এ থেকেই বোঝা যায় যে, যদি কোনো কারণে বিশ্বের ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটে এবং তা
কয়েক দিন অব্যাহত থাকে, তাহলে বিশ্বব্যাপী এক ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে।
সেই টাইপ রাইটারের বিকল্প বা উন্নতমানের টাইপ রাইটার হিসেবে যে প্রযুক্তির আবির্ভাব হয়েছিল, সেই প্রযুক্তি এখন উৎকর্ষতার সকল ধাপ পেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) পর্যায়ে চলে গেছে। বিশ্বে আগে অনেক আবিষ্কার হয়েছে এবং অনেক আবিষ্কার মানুষের কল্যাণে যেমন এসেছে, আবার অনেক আবিষ্কার মানব সভ্যতার ধ্বংসেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তারপরও এ কথা অনস্বীকার্য যে বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানবজাতির উন্নতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে এবং বলা চলে মানব সভ্যতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত করেছে। কম্পিউটার প্রযুক্তি বা তথ্যপ্রযুক্তি ঠিক সেরকম একটি আবিষ্কার। কিন্তু বিজ্ঞানের অন্যান্য আবিষ্কারের সাথে তথ্যপ্রযুক্তির পার্থক্যটা হচ্ছে যে, এই প্রযুক্তি যে ব্যাপক হারে গণমানুষের সরাসরি ব্যবহারে আসছে, আর কোনো আবিষ্কার সেভাবে ব্যবহৃত হয়নি। অতি দরিদ্র থেকে সেরা ধনী বা একেবারে নিরক্ষর থেকে উচ্চ শিক্ষিত সকলেই এখন এই তথ্যপ্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহার করে থাকে। শুধু তাই নয়, মানুষ এই তথ্যপ্রযুক্তির ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে আগে কখনও অন্য কোনো প্রযুক্তির ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়নি। মানুষের এখন অনেক কিছু না থাকলেও চলবে, এমনকি ঘরে খাবার না থাকলেও চলবে, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা, বিশেষ করে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টোগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ না থাকলে এক মুহূর্তও চলবে না।এ কারণেই জীবনের অপর নাম এখন আর পানি বা অক্সিজেন নয়, বরং ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যা হলে মানুষ শারীরিকভাবে ঠিকই কিন্তু মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে মারা পড়বে।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড
অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা