মিতা রহমান
প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে
নিষ্পাপ শিশু রামিসার অভিশাপে শেষ হয়ে যাব আমরা। প্রতিবেশীর বিকৃত যৌনলালসার শিকার হয়েছিল শিশুটি।
নির্যাতন বা রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়েই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত কেটে ফেলা হয়েছিল। কতটা ভয়াবহ সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছেÑ এই ঘটনা তারই প্রতিফলন। অন্যদিকে রামিসার পিতা যখন বলেন, ‘আমি বিচার চাই না। কারণ, আপনারা বিচার করতে পারবেন নাÑ’ তখন রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি তার আস্থাহীনতার কথাই প্রকাশ পায়।
ধর্ষিতার পিতার কণ্ঠে রাষ্ট্রের প্রতি হতাশা। একটি ন্যায়বিচারহীন
সমাজ ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি এক মর্মস্পর্শী প্রতিবাদ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি,
দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে একজন ভুক্তভোগী বাবার
মনে যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছেÑ এ তারই বহিঃপ্রকাশ। মামলা দায়ের করার পর দীর্ঘ
আইনি প্রক্রিয়া, বারবার আদালতে দৌড়াদৌড়ি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আসামিদের জামিন
পেয়ে যাওয়া বিচারপ্রার্থীকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।
বাংলাদেশের অতি সাম্প্রতিককালের আলোচিত ঘটনা হলো মব। মানুষ সারাক্ষণই
এ মবের ভয়ে আতঙ্কে থাকে। কিন্তু, যেভাবে একের পর এক ধর্ষণ, বলাৎকার ও হত্যার ঘটনা ঘটছে
তাতে জনমনে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে ধর্ষণ কি মবের চাইতে ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ
শিশু অধিকার ফোরাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন
বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর শত শত শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক
ঘটনা সংবাদ মাধ্যমেও আসে না। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিশু হত্যার সংখ্যা
উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরণের পর হত্যা কিংবা পারিবারিক সহিংসতায়
শিশু মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব অপরাধের বড় অংশেই বিচার দীর্ঘসূত্রতায়
আটকে যায়। আর অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে
পার পেয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য সেই প্রকৃত মানদণ্ড কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে
নির্ধারিত হয় না। সেই রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা,
মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশের
বাস্তবতা উদ্বেগজনক। শিশুমৃত্যু, শিশুশ্রম, অপুষ্টি, শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন
ও সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বিস্তৃত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, শিশু আইন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারÑ সবকিছু হয়ে পড়েছে প্রায় অকার্যকর।
আজকের বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট বার্তাÑ ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার
মতো অপরাধে বিন্দুমাত্র ছাড় নয়, কোনো সামাজিক সালিশ নয়, কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া নয়।
আইন সবার জন্য সমানÑ এই নীতি বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল তখনই আমরা বলতে পারব, আরেকটি
কিশোরীর জীবন আমাদের উদাসীনতার কারণে হারিয়ে যাবে না। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ৯০ দিনের
মধ্যে বিচার শেষ করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের শিশু জাতির আগামী দিনের সম্পদ।‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই
অন্তরে’Ñ কবির এ কথার মর্মবাণী উপলব্ধি করে এদেশকে শিশুর নিরাপদ বাসযোগ্য করে তুলতে
হবে। বিগত পাঁচ দশকে আমাদের সমাজে মূল্যবোধে যে অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে, তার চূড়ান্ত রূপ
এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় শুধু আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা
সম্ভব নয়। এজন্য নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধ চর্চা আরও জোরদার করা জরুরি। আগে
শিশুরা শুধু ধর্ষণের শিকার হতো। এখন ধর্ষণের পর শিশুকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এটা হিংস্রতা
ও বর্বরতা বৃদ্ধিরই জানান দেয়। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিশুদের রক্ষায় প্রচলিত
আইনে সংশোধন আনতে হবে। যে ধরনের শিশু নির্যাতন হোক না কেন, এ ক্ষেত্রে রায় কার্যকরের
সময়সীমা ৯০ দিনে বেঁধে দিতে হবে। তা হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব
হবে।
মিতা রহমান
কবি ও সংগঠক, সভাপতি, জাতীয় নারী আন্দোলন