জাহিদ ইকবাল
প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে
মৃত্যুর কয়েক দিন পর নূরজাহান বেগমের কক্ষে তার মরদেহে। ছবি: সংগৃহীত
মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে আসা সংবাদ গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৭২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমকে তার কক্ষ থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক দিন পর তার মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। ঘটনাটি এখন তদন্তাধীন। স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলোকে শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। কারণ সেগুলো সমাজের গভীরে জমে থাকা কোনো সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। এটি শুধু একজন প্রবীণ নারীর
মৃত্যু নয়। এটি আমাদের সময়ের একটি প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক
মূল্যবোধ, মানবিক দায়িত্ববোধ এবং আধুনিক জীবনযাত্রার বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে
বাধ্য করে।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের সন্তানরা
সবাই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক এবং আরেকজন বিদেশে বসবাস করেন। সমাজের প্রচলিত মানদণ্ডে এটি একটি সফল পরিবারের
চিত্র। আমাদের সমাজে এমন সন্তানদের নিয়ে গর্ব করা হয়, তাদের সাফল্যের গল্প উদাহরণ
হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই ঘটনার পর একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠেছেÑ সাফল্য
বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?
একজন মানুষ যদি প্রশাসনের উচ্চপদে পৌঁছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা
করেন কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হন, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি পেশাগতভাবে সফল।
কিন্তু একজন মানুষের জীবনের মূল্যায়ন কি শুধু তার পেশাগত অর্জন দিয়ে করা যাবে? নাকি
সেই মূল্যায়নের সঙ্গে তার মানবিক দায়িত্ববোধ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক আচরণকেও
বিবেচনায় নিতে হবে?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু নূরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের আবারও
সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি, যেখানে
সাফল্যের সংজ্ঞা ক্রমশ পেশা, পদমর্যাদা এবং আর্থিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো, বিদেশে উচ্চশিক্ষার
সুযোগ করে দেওয়া কিংবা বড় চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত করাÑ এসবই এখন অধিকাংশ পরিবারের প্রধান
লক্ষ্য। কিন্তু সেই সঙ্গে সন্তানকে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি কতটা
গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশের সমাজ ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারকেন্দ্রিক। যৌথ পরিবার ছিল আমাদের
সামাজিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। একই ছাদের নিচে একাধিক প্রজন্মের বসবাস ছিল স্বাভাবিক
বিষয়। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা শুধু সম্মানিতই ছিলেন না, তারা ছিলেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের
কেন্দ্রবিন্দু। তাদের অভিজ্ঞতা ও উপস্থিতি পরিবারকে একটি মানসিক নিরাপত্তা দিত। কিন্তু
গত কয়েক দশকে নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, বিদেশমুখী জীবনধারা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির
বিস্তারের ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে।
যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে। একক পরিবার ভেঙে অনেক ক্ষেত্রেই
মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। একই বাড়িতে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে
দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। প্রত্যেকের নিজস্ব ঘর আছে, নিজস্ব ব্যস্ততা আছে, নিজস্ব ভার্চুয়াল
জগৎ আছে; কিন্তু পরস্পরের জন্য সময় কমে যাচ্ছে।
আজ আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, কিন্তু আগের যেকোনো
সময়ের তুলনায় বেশি একা। আমাদের হাতে স্মার্টফোন আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আছে।
ভিডিও কল আছে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কয়েক সেকেন্ডে যোগাযোগ করার
সুযোগ আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই একই বাড়িতে থাকা বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট
সময় কাটানোর সুযোগ খুঁজে পাই না। প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে
দাঁড়িয়েছে মানবিক সংযোগের সংকট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রবীণদের
একাকিত্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায়
দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যের
ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং
অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। অর্থাৎ মানুষ
শুধু খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মাধ্যমে বেঁচে থাকে না; মানুষ বেঁচে থাকে সম্পর্কের
মাধ্যমে, মানুষের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে।
একজন বৃদ্ধা মায়ের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি অনেক সময় টাকা
নয়। একটি ফোনকল। একটি খোঁজ নেওয়া। এক কাপ চা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করা। একজন
বৃদ্ধ বাবার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো দামি উপহার নয়; সন্তানের সঙ্গে কিছুটা
সময়, কিছুটা মনোযোগ, কিছুটা শ্রদ্ধা।
আমরা প্রায়ই মনে করি, বাবা-মায়ের জন্য আলাদা ঘর, ওষুধ, পরিচর্যার
ব্যবস্থা এবং মাসিক খরচ নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ। বাস্তবতা হলো, সম্পর্কের জায়গা
অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না। একজন মা তার সন্তানের উপস্থিতি চান। একজন বাবা চান তার
কথা কেউ শুনুক। তারা অনুভব করতে চান যে তারা এখনও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা
বোঝা নন। তারা অতীতের স্মৃতি নন। তারা এখনও প্রয়োজনীয় মানুষ।
নূরজাহান বেগমের ঘটনাটি তাই শুধু একটি পরিবারের ঘটনা নয়। এটি আমাদের
সময়ের একটি প্রতীকী ঘটনা। কারণ দেশের অসংখ্য প্রবীণ মানুষ আজ একই ধরনের বাস্তবতার
মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। তারা হয়তো অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ। তাদের থাকার জায়গা আছে। চিকিৎসার
ব্যবস্থা আছে। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত সঙ্গ, নেই যথেষ্ট কথোপকথন, নেই মানসিক নিরাপত্তা।
আমরা উন্নয়নের নানা সূচক নিয়ে গর্ব করি। মাথাপিছু আয় বাড়ছে। অবকাঠামো
বাড়ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। শহর বড় হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে কি আমাদের মানবিক
সম্পর্কও শক্তিশালী হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
নূরজাহান বেগমের উদ্ধার হওয়া ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে
পড়েছে। ছবিটিতে একজন বৃদ্ধা নারীকে নিথর অবস্থায় দেখা যায়। ছবিটি দেখলে স্বাভাবিকভাবেই
মন ভারী হয়ে আসে। তবে ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি তার বেদনা নয়; তার নীরবতা।
সেই নীরবতা যেন অসংখ্য প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। এই নারীও কি কোনো একসময়
সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন? তিনি কি কোনো একসময় সন্তানের অসুস্থতার
রাতে জেগে ছিলেন? তিনি কি নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে
তুলেছিলেন? নিশ্চয়ই করেছিলেন। প্রায় প্রতিটি মা-ই করেন।
প্রতিটি সন্তান পৃথিবীতে আসার আগে একজন মা দীর্ঘ কষ্ট সহ্য করেন।
সন্তানের প্রথম কান্না থেকে প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলে যাওয়া থেকে প্রথম চাকরি পাওয়াÑ
প্রতিটি অর্জনের পেছনে একজন মায়ের নীরব ত্যাগ জড়িয়ে থাকে। সেই মায়ের শেষ জীবনে
যদি সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় নিঃসঙ্গতা, তাহলে সেটি শুধু একটি পারিবারিক ব্যর্থতা
নয়; সেটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা।
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে
বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রবীণদের জীবনমান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা এখন আর
কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্ন।
আমাদের কি প্রবীণবান্ধব নগরনীতি আছে? আমাদের সামাজিক নীতিমালায় কি
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? আমাদের পরিবারগুলো কি
তাদের জন্য নিরাপদ আবেগিক পরিবেশ তৈরি করতে পারছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের
করা জরুরি। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের অবস্থান দিয়ে
নির্ধারিত হয়। শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের প্রতি আচরণই বলে দেয় একটি সমাজ
কতটা মানবিক।
আজ যারা নিজেদের বাবা-মায়ের জন্য সময় বের করতে পারছেন না, তাদের
মনে রাখা উচিতÑ জীবন একটি বৃত্ত। আজ আমরা সন্তান, আগামীকাল আমরা বাবা-মা হব। আজ আমরা
যেভাবে আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্মও সেখান থেকেই শিক্ষা নেবে।
সহমর্মিতা যেমন উত্তরাধিকার হয়ে যায়, তেমনি অবহেলাও হয়ে যায়। শ্রদ্ধা যেমন শেখানো
যায়, তেমনি শেখানো যায় উদাসীনতাও। সন্তানরা শুধু আমাদের কথা থেকে শিক্ষা নেয় না;
তারা শিক্ষা নেয় আমাদের আচরণ থেকে।
নূরজাহান বেগম আর ফিরে আসবেন না। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ হয়তো তদন্তে
উঠে আসবে। সংবাদপত্রের পাতায় আরও কিছুদিন আলোচনা চলবে। তারপর নতুন কোনো ঘটনার ভিড়ে
বিষয়টি হারিয়েও যেতে পারে। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে,
যেটি সহজে হারিয়ে যাওয়ার নয়।
একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন কী দিয়ে পরিমাপ করা হবে? উঁচু ভবন দিয়ে?
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে? নাকি সেই সমাজ তার প্রবীণ মানুষদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা
এবং ভালোবাসা দিতে পারে, তা দিয়ে? আমার বিশ্বাস, শেষ প্রশ্নটির উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কোনো জাতির মানবিকতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষের অবস্থান
দিয়ে।
নূরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল। এটি শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম সামাজিক দলিল। এটি একটি আয়না, যেখানে আমরা শুধু একজন মায়ের নিঃসঙ্গ পরিণতি দেখি না; দেখি নিজেদেরও। আর সেই প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়Ñ আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি আমাদের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি?
জাহিদ ইকবাল
সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন