ড. মো. মঞ্জুরে মওলা
প্রকাশ : ৬ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৬ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
জগতে শিশুরা জীবন্ত খেলনা, সম্ভাবনার শক্তিতে সতেজ ও অজানার স্বপ্নদ্রষ্টা। পিতা-মাতা ও রাষ্ট্রীয় আশ্রয়লালিত ও পালিত, এই শিশুদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে গড়া যেতে পারে একটি সমৃদ্ধ দেশ।
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ও অসাম্য ভবিষ্যতের বর্তমান জগতে, প্রথমে তাই, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য ‘শিশুর সুন্দর বিকাশ ও অর্থনীতির নিশ্চিতকরণ’, যা অতীব প্রয়োজন। দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুর তরে, বাঁধতে হবে নতুন অর্থনীতির সুর, বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হওয়ার নয় বেশি দূর।
হয়তো তাই; শিশু গবেষকরা এবং বাংলা শিশু সাহিত্যের দিকপালরা বলেছেন, শিশুর স্বপ্নকে
বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য, জনগণের প্রয়োজন ও চাহিদা মেটাতে সীমিত সম্পদের সঠিকভাবে ব্যবহারের
মানসিকতা তৈরি করার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যেতে পারে, একটি টেকসই ভবিষ্যৎ। প্রসঙ্গত,
দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার পরিবর্তনে শিশুদের টেকসই
ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট হলেও হতে পারে। তাই মনে পড়ে যায়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের
এক চিরন্তন বাণীÑ ‘ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট হলেও আশা ও বিশ্বাসের আলো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে
যায়।’
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ। হয়তো ওপরে উল্লিখিত কাজী নজরুল ইসলামের বাণীকে সামনে রেখে,
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অভিপ্রায়ে শিশুদের সুন্দর বিকাশ নিশ্চিত
করার জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। এখন আপনার মনে এই মনোভাব জন্মাতেও
পারে; পাঁচ দশক আগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমি চলছে কীভাবে? এই প্রশ্ন আপনাকে
উন্মাতাল করছে বলে উত্তর খোঁজ করার অভিযানে সংগৃহীত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা
হয়েছে যে, ‘শিশু একাডেমি পরিচালনায় জ্ঞানের ঘাটতি ব্যাপক এবং শিশুর শারীরিক, মানসিক,
সামাজিক ও জ্ঞানীয় বিকাশ উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতিও অত্যন্ত মন্থর’! উল্লিখিত প্রতিবেদনটি
সঠিক হলেও হতে পারে, নিম্নে বর্ণিত দুটি কারণে।
এক.
গত সরকারের সময় দেশের উন্নয়ন তথা শিশুর সার্বিক উন্নয়ন
ঘিরে যে ‘অতিপ্রাকৃত প্রতিবেদন’ প্রকাশিত হয়েছিল, তা অনেকাংশেই ছিল জনপ্রিয় মিথের
অংশ ।
দুই. রূপকথার ‘চোরকে রাজা বানানো’ মিথের মতো; টাকার শক্তিতে
ব্যবস্থাপকের গুণাবলি ছাড়াই বানানো ব্যবস্থাপকদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে, নিষ্পাপ
ও আলোকোজ্জ্বল শিশুর সুন্দর বিকাশ নিশ্চিতকরণের অনেক প্রতিষ্ঠান। ফলাফলÑ কাষ্ঠ হাসি না জানা শিশুদের সীমিত সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মানসিকতা তৈরি করার
চলমান প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো অনেকেটা রদ্দি, একে ভেঙে গড়তে টেকসই অর্থনীতির প্রয়োজন।
তাই, শিশুদের টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশপ্রেমিক পিতা-মাতা অনেকটাই শ্রান্ত, এবং দেশের
ক্ষতিগ্রস্তের অন্তর্ভুক্তি হওয়াতে শিশুরাও আজ মন-ক্লান্ত। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের
(UNICEF) মতে, এই শিশুরা অর্থনীতি থেকে পরিবেশ পর্যন্ত সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈশ্বিক
সুফল বয়ে আনতে পারে, এখানে পরোক্ষভাবে টেকসই সার্কুলার অর্থনীতির ইঙ্গিত প্রদান করেছে
ইউনিসেফ। সার্কুলার অর্থনীতি একটি নতুন অর্থনীতি; এ বিষয়ে দুয়েকটি কথা না বললেই নয়!
বহুমাত্রিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা যেকোনো
সমাজের ভূখণ্ড পরিবর্তনের ফলে নতুন অর্থনীতির সৃষ্টি হয়। আ্যনথ্রোপোসিন যুগে তাই,
‘বর্তমান সামাজিক উৎপাদন ও ভোগের ধরনকে রূপান্তরিত করার মৌলিক প্রয়োজন থেকেই সার্কুলার
অর্থনীতির উদ্ভব হয়েছে’ (সূত্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পরিবেশবাদী বিশেষজ্ঞরা, ১৯৭০)।
বলাবাহুল্য, সার্কুলার অর্থনীতি ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর সুন্দর বিকাশ ও অর্থনীতির
সজীবতাকে ধরে রাখার জন্যে পশ্চিমা বিশ্ব যখন, ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমান সরলরেখার অর্থনীতিকে
জাদুঘরে পাঠানোর কথা ভাবছে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ও অসাম্য ভবিষ্যতের দক্ষিণ বিশ্বের
বাংলাদেশ তখন, শিশুর টেকসই ভবিষ্যতের জন্যে সার্কুলার অর্থনীতি নিয়ে পরিবেশ-অভিজাতরা
নিজেদের গণ্ডির মধ্যে ঘুমন্ত আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করছে! হয়তো তাই,
দেশের শিশুর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া নিয়ে দেশপ্রেমিক পিতা-মাতার অবস্থা অনেকটা
‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ (১৯৬৯) ছবির ‘শুন্ডি’ রাজ্যের জণগনের মতো, যারা কথা বলতে পারত
না!
তবে বর্তমান রাজার রাজ্যে, ওপরে উল্লিখিত কাজী নজরুল ইসলামের চিরন্তন বাণী
থেকে শক্তি সঞ্চয় করে, দেশের জনগণ আশার কথা বলছে এভাবে, আজকের মন-ক্লান্ত শিশুরাই,
২০৫০ সালে উপহার দিতে পারে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ; এটি কীভাবে সম্ভব? উত্তর, যা নিচের উদাহরণ পাঠ করলে সহজেই অনুমেয় হতে পারে।
২০২৪ খ্রিস্টাব্দ । মন-ক্লান্ত ১৩-১৪ বছর বয়সী শিশুরা, ২০৫০ সালে তাদের বয়স
হবে প্রায় ৪০ বছর; তখন এরাই হবে টেকসই দেশের কর্ণধার। তাই, এখন থেকে মন-ক্লান্ত শিশুদের
অনুসন্ধিৎসু হৃদয়কে সার্কুলার অর্থনীতির আলোর সাথে পরিচয় করে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের
দৈনন্দিন জীবনে সার্কুলার অর্থনীতি ব্যবহারের অধ্যবসায়ের মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে একটি
সার্কুলার সমাজ। এই সার্কুলার সমাজের স্থায়িত্বকে ধরে রাখার মধ্য দিয়ে শিশুর সুন্দর
বিকাশ ও অর্থনীতির নিশ্চিতকরণ সম্ভব।
তাই, জগতের রূঢ়তা স্পর্শ করা শিশুদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য অর্থনীতিবিদ ও শিশু উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আজকের শিশুকে সার্কুলার অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার অর্থ, ২০৫০ সালের মধ্যে আমরা হয়তো দেখতে পারি, অনাবিল সমৃদ্ধির বাংলাদেশ।
ড. মো. মঞ্জুরে মওলা
সমাজবিজ্ঞানী, টেকসই রিনিউবল এনার্জি ও সার্কুলার অর্থনীতি এক্সপার্ট, ফিনল্যান্ড