× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বইমেলা হোক তরুণদের মিলনমেলা

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৩ এএম

অমর একুশে বই মেলায় স্টল ঘুরে ঘুরে বই পছন্দের বই দেখছে একঝাঁক তরণ-তরুণী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অমর একুশে বই মেলায় স্টল ঘুরে ঘুরে বই পছন্দের বই দেখছে একঝাঁক তরণ-তরুণী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা যেকোনো জাতির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বর্তমান ডিজিটাল আসক্তির যুগে কিশোররা যখন স্ক্রিনে বন্দি, তখন মেলার ধুলোবালি আর বইয়ের ঘ্রাণ তাদের ফিরিয়ে আনতে পারে বাস্তব জগতে। বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে ধৈর্যশীল করে এবং গভীর চিন্তা করতে শেখায়। বাংলা একাডেমির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রতিবছর মেলায় আসা নতুন বইয়ের সিংহভাগই তরুণ পাঠকদের উদ্দেশ করে লেখা, যা তাদের সৃজনশীল চিন্তার খোরাক জোগায়।

জীবনের প্রকৃত মানে খুঁজে পেতে সাহিত্য এক অনন্য দিশারি। কিশোর গ্যাংয়ের অন্ধ গলিতে পা বাড়ানো তরুণরা যখন কালজয়ী উপন্যাস বা আত্মজীবনী পড়ে, তখন তারা বুঝতে পারে ধ্বংস নয় বরং সৃষ্টিই জীবনের সার্থকতা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘অন্তরের সম্পদই মানুষের চরম সম্পদ।’ বই পড়ার মাধ্যমে এই আত্মিক সম্পদ অর্জন করা সম্ভব, যা তরুণদের বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে তাদের জীবনের একটি ইতিবাচক লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়।

বর্তমানে পাড়া-মহল্লায় নেতিবাচক আড্ডা ও গ্যাং কালচারের বিস্তার ঘটছে আশঙ্কাজনক হারে। বইমেলা এই তরুণদের এক সুস্থ আড্ডার পরিবেশ দেয়। যখন কোনো তরুণ বন্ধুকে নিয়ে মেলায় আসে, তখন তার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে কোনো নতুন লেখক বা সমকালীন বিষয়। এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আমাদের সমাজ থেকে ক্ষতিকর আড্ডা কমিয়ে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে অপরাধ প্রবণতা প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পায়।

সৃজনশীলতার বিকাশ সাধনে বইমেলার কোনো বিকল্প নেই। মেলায় শুধু বই কেনাই হয় না, বরং লেখক-পাঠক আড্ডা ও সেমিনার তরুণদের চিন্তাশক্তিকে শানিত করে। তারা নতুন শব্দ শেখে, নতুন পৃথিবী দেখে এবং নিজের ভেতর এক ধরনের নান্দনিক বোধ লালন করে। এই সৃজনশীলতাই তাদের গতানুগতিক পড়াশোনার বাইরে গিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। ‘জ্ঞানই শক্তি’Ñ এই আপ্তবাক্যটি মেলায় আগত তরুণদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনই আমাদের আগামীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। বর্তমানের ‘অশিক্ষিত নেতা’ হওয়ার প্রবণতা রোধ করতে হলে তরুণদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মেধা ও প্রজ্ঞা। বইমেলা তরুণদের ইতিহাসের সঠিক পাঠ দেয়, যা তাদের যুক্তিবাদী করে তোলে। তথ্যবহুল বই পড়ার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায়, যা ভবিষ্যতে একটি শিক্ষিত ও যোগ্য নেতৃত্ব উপহার দিতে সক্ষম।

অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে বই এক অমোঘ ওষুধ। কিশোররা যখন অপরাধের পথে পা বাড়ায়, তখন তারা মূলত মানসিক একঘেয়েমি বা ভুল রোমাঞ্চের শিকার হয়। বইমেলা তাদের সামনে সাহিত্যের এক রোমাঞ্চকর জগৎ খুলে দেয়। যখন একটি ছেলে বা মেয়ে বই পড়ার নেশায় বুঁদ হয়, তখন তার কাছে অস্ত্র বা মাদক তুচ্ছ হয়ে যায়। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চাই পারে সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে।

সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান হলো একুশের বইমেলা। এটি কেবল বইয়ের সমাহার নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের ধারক। মেলায় গান, কবিতা আবৃত্তি এবং চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয়গুলো তরুণদের মনের কালিমা ধুয়ে দেয়। আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও দেশজ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে তারা শেকড়ের সন্ধান পায়। অপসংস্কৃতির প্রবল স্রোতে গা না ভাসিয়ে তরুণরা তখন নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করতে শেখে।

আদর্শ নাগরিক বোধ তৈরি হয় দায়িত্বশীল চিন্তা থেকে। বইমেলা তরুণদের শিখিয়ে দেয় দেশপ্রেম মানে কেবল স্লোগান নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও ভাষাকে ভালোবাসা। যারা বই পড়ে, তারা জানে যে একটি জাতির অস্তিত্ব তার ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে। ভাষা আন্দোলনের বীরদের আত্মত্যাগের ইতিহাস পাঠ করে তরুণরা বুঝতে পারে তাদের দায়িত্ব কতটুকু। ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, পাঠাগার বিমুখ জাতি কখনও উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে না।

নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস দেয় বই। হতাশায় নিমজ্জিত যুবসমাজ যখন মহৎ প্রাণ ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে, তখন তারা নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পায়। ‘স্বপ্ন সেটা নয়, যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটা যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’Ñ এপিজে আব্দুল কালামের এই উক্তি তরুণরা কেবল বইয়ের পাতাতেই খুঁজে পায়। বইমেলা তাদের সেই স্বপ্নের বীজ বপন করার জায়গা, যা ভবিষ্যতে মহীরুহ হয়ে সমাজকে ছায়া দেবে।

দেশপ্রেম ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মেধা পাচার রোধ এবং দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করা সম্ভব। মেলায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইগুলো নতুন প্রজন্মকে আমাদের স্বাধীনতার মূল্য বোঝাতে সক্ষম। তারা যখন নিজের দেশের মাটির ঘ্রাণ পায় শব্দের বুননে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এই সচেতনতাই তাদের আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের কারিগর হিসেবে গড়ে তুলবে।

বইমেলা কেবল এক মাসের আয়োজন নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রক্রিয়া। কিশোর গ্যাং ও শিক্ষা বিমুখতার এই আঁধার কাটাতে বই হোক আমাদের একমাত্র আলো। তরুণদের মিলনমেলা যদি বইয়ের সঙ্গে হয়, তবেই গড়ে উঠবে শিক্ষিত ও উন্নত আগামীর বাংলাদেশ। তাই আসুন, স্লোগান তুলিÑ ‘বই পড়ি, স্বদেশ গড়ি।’ বইয়ের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে থাকা জীবনের সঠিক পথনির্দেশ গ্রহণ করে আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাই।


ড. মো. আনোয়ার হোসেন 

প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা