পর্যবেক্ষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ১২:৩১ পিএম
উনিশ শতকের আশির দশকের শেষ ভাগে বিটিভিতে একটি নাটক দেখেছিলাম। নাম ছিল, ‘আমি কেন বেতন পাই’। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সে সময়ের শক্তিমান অভিনেতা সিরাজুল ইসলাম। নাটকে তিনি একটি সরকারি অফিসের কর্মকর্তা। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তার মনে প্রশ্ন জাগল, তিনি তো সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করেন না, তাহলে তিনি কেন বেতন পান? এ কথা ভাবতে ভাবতে তিনি উদভ্রান্তের মতো হয়ে গেলেন। স্ত্রী-সন্তানরা তাকে বোঝায়, কিন্তু তিনি মানেন না। যাকে কাছে পান, তাকেই জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কেন বেতন পাই’। তার অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকায় পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে গেল একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। রোগীর কেস হিস্ট্রি জানার জন্য চিকিৎসক তাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি সারাদিন কী করেন? তিনি বললেন, ‘সকালে অফিসে যাই। পিয়ন এক কাপ চা দেয়, সেটা খাই। তারপর ওই দিনের দৈনিক পত্রিকাগুলো পড়ি। কলিগদের সঙ্গে খোশগল্পে যায় আরও কিছুটা সময়। এসব করতে করতে লাঞ্চের সময় চলে আসে। আমি বাসায় যাই। লাঞ্চ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে একটু গা গড়াগড়ি খাই। তারপর ৪টার দিকে আবার অফিসে যাই। পিয়ন বিকালের চা-নাশতা দেয়। ওটা খেতে খেতে ৫টা বেজে যায়। ৫টায় অফিস শেষ। আমি বাড়ি চলে আসি।’ চিকিৎসক গভীর মনোনিবেশ সহকারে রোগীর কথা শুনলেন। তারপর বললেন, তো আপনার সমস্যা কী? রোগীর জবাব, ‘আমি তো কোনো কাজ করি না। তাহলে আমি কেন বেতন পাই?’ ডাক্তার তাকে চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা নিয়ে দুদিন পরে যেতে বললেন। দুদিন পরে তিনি আবার গেলেন। ডাক্তার রোগীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ভালো করে পরীক্ষা করে বললেন, ‘আপনি কোনো অন্যায় করছেন না। আপনার চাকরির শর্ত লঙ্ঘিত হচ্ছে না।’ বিস্মিত রোগীর প্রশ্নÑ কী রকম? ডাক্তার মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে লেখা আছে, ‘আপনি যতদিন এই চাকরিতে বহাল থাকবেন, ততদিন উল্লিখিত টাকা বেতন পাবেন। এই লেটারে এমন কোনো শর্ত নেই যে, এজন্য আপনাকে কাজ করতে হবে। সুতরাং যেহেতু আপনি চাকরিতে আছেন, তাই বেতন পাচ্ছেন।’
নাটকটির কথা মনে পড়ল, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত কার্টুনটি দেখে। তাতে লেখাÑ ‘খবর : অফিসে দেরিতে এলে বা আগে চলে গেলে শাস্তি।’ কার্টুনের মন্তব্য : ‘একটু সময় দেওন উচিত। পুরান অভ্যাস হুট করে কি যায়?’ বস্তুত অভ্যাস সহজে বদলানো যায় না। তা ছাড়া বলা হয়ে থাকেÑ ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’। অর্থাৎ মানুষ অভ্যাসের দ্বারা পরিচালিত হয়। এ কথার সঙ্গে অবশ্য দ্বিমত রয়েছে আমার। আমার মতে মানুষ অভ্যাসের দাস নয়, বরং অভ্যাসই মানুষের দাস। মানুষ ইচ্ছে করলেই তার অভ্যাস বদলাতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন কঠিন অধ্যবসায় ও মনোবল।
অফিসে আগমন-প্রস্থান নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছেÑ এক কর্মচারী প্রতিদিন অফিসে দেরি করে আসে, আবার ছুটি হওয়ার আগে আগেই চলে যায়। এক দিন বস তাকে ধরলেন। ‘কী ব্যাপার বল্টু সাহেব, আপনি আসেন লেট করে, আবার যানও আগে আগে, এটা কি ঠিক?’ বিগলিত হাসি দিয়ে বল্টু বলল, ‘স্যার সকালে লেট করে আসি বলেই, বিকালে লেট করি না। একদিনে দুইবার লেট করা ঠিক?’ বল্টুর বস এ উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন কি না আমাদের জানা নেই।
আমার পরিচিত উচ্চপদস্থ এক সরকারি কর্মকর্তা একটি ঘটনা বলেছিলেন। তিনি বিসিএস তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। চট্টগ্রামে থাকাকালীন ওই অফিসের একজন কর্মকর্তা প্রতিদিন দেরি করে আসতেন, আবার বিকালে আগেভাগেই বেরিয়ে যেতেন। এ নিয়ে অফিসে কানাঘুষা চলেÑ স্যার কেন কিছু বলেন না। টের পেয়ে সে নিজেই বসের কাছে এসে একদিন বলল, ‘স্যার ইনফরমেশন অফিসের কি বাঁধাধরা টাইম আছে? সবসময়ই তো অফিস চলমান।’ চমৎকার যুক্তি! বস তাকে বললেন, ইনফরমেশন অফিসে ছুটি হওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা না থাকেলেও অফিসে আসার কিন্তু একটা টাইম ঠিক করে দেওয়া আছে।’ তারপরও নাকি ওই কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসতেন না।
কাজ না করে সময় কাটানো বা ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে থাকার খাসলত অনেকের রয়েছে। সোয়া ৫ বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করার সুবাদে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে এ প্রবণতা দেখে অবাক হয়েছি। দেখতাম ছুটি নিয়ে একজন কর্মচারী বাজারে ঘুরছেন। তাকে ‘বাজারেই যখন এলেন, অফিসে গিয়ে কাজ করলেই তো পারতেন’ বলায় তিনি জবাব দেন, ‘ছুটি আমার প্রাপ্য, তাই অফিসে যাব না।’ অকাট্য যুক্তি। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ী একজন চাকরিজীবী তার নির্ধারিত ছুটি ভোগ করতেই পারেন। সেই তিনি একদিন পড়ে গেলেন মহাফাঁপড়ে। সকালে প্রধান কার্যালয় থেকে অডিট টিম এসে হাজির। এ ধরনের অডিট টিমের প্রথম পদক্ষেপই হলো দৈনিক হাজিরা বহি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেওয়া। সেদিনও অডিট টিমের প্রধান সেটাই করলেন। পৌনে ১০টার দিকে ওই কর্মচারী মহোদয় চেহারা তার মোবারক দেখালেন। ঢুকতেই তিনি পড়লেন জেরার মুখে। কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বললেন, ‘স্যার আমার বাড়ি অনেক দূরে। হেঁটে আসতে তাই দেরি হয়ে গেছে।’ অডিট টিমপ্রধান বললেন, ‘হেঁটে এলে তো আপনার জানা থাকার কথা বাড়ি থেকে অফিসে পৌঁছতে কত সময় লাগে। সময় হিসাব করে রওনা করলে তো আর লেট হয় না।’ তিনি হাজিরা খাতায় কাঠ-পেন্সিল দিয়ে ‘এ’ লিখে রেখে দিলেন। পরে সন্ধ্যায় বিদায় হওয়ার আগে ইরেজার দিয়ে ‘এ’-কে মুছে দিয়ে বললেন, সই করেন। তারপর দেখলাম, স্ত্রীর জন্য একটি দামি শাড়ি, কয়েক কেজি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে অডিটর সাহেব হাসিমুখে বিদায় নিলেন। অর্থাৎ ম্যানেজার সাহেব তার রপ্ত করা কায়দার সদ্ব্যবহার করে ভালোভাবেই পরিস্থিতি ম্যানেজ করেছেন।
অফিসে অনুপস্থিত থাকা বা দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। গ্রামের এক স্কুলে রাজধানী থেকে ইন্সপেক্টর গেছেন পরিদর্শনে। তিনি একটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ছাত্রদের এটা-ওটা জিজ্ঞেস করে সদুত্তর না পেয়ে ক্লাস টিচারকে ধমকে বললেন, ‘কেমন শিক্ষক আপনি? ছাত্রদের ঠিকমতো পড়ান না! আমি আপনার নামে ওপরে রিপোর্ট করব।’ ক্লাস টিচার মাথা চুলকে জবাব দিলেন ‘স্যার আমি আসলে মাস্টার না। ওই যে রাস্তার পাশে মুদি দোকানটা দেখছেন, আমি ওইটা চালাই। আমার মামা হইল মাস্টার। তিনি আজ হাঁটে গেছেন গরু বেচতে। আমাকে বলেছেন, এখানে বসে থাকতে।’ রেগেমেগে ইন্সপেক্টর গেলেন হেডমাস্টারের অফিস রুমে। গিয়ে তাকে বললেন, ‘আপনার স্কুলের শিক্ষক ক্লাস ফাঁকি দিয়ে গরু বেচতে যায়। আমি আপনাকে সাসপেন্ড করার জন্য বোর্ডে সুপারিশ করব।’ হেডমাস্টারের চেয়ারে বসা লোকটি ড্রয়ার থেকে একটি মুখ বন্ধ করা খাম বের করে ইন্সপেক্টরের হাতে দিয়ে বলল, ‘স্যার আমাকে সাসপেন্ড করবেন কীভাবে? আমি তো হেডমাস্টার না। হেডমাস্টার আমার চাচা। তিনি আবার জমিজমা বেচাকেনার দালালি করেন। আজ একটা বড় জমির কাজে জেলা শহরে গেছেন। আর বলেছেন, এক ভদ্রলোক আসবে। তাকে এই খামটা দিয়ে দিস।’ ইন্সপেক্টর হাসিমুখে খামটা পকেটে গুঁজে বলল, ‘আমিও ইন্সপেক্টর না, ইন্সপেক্টর আমার দুলাভাই। তিনি করেন কন্ট্রাকটরি। আজ একটা বড় কাজের টেন্ডার হবে। তিনি সেখানে ব্যস্ত। তাই আমাকে পাঠিয়েছেন প্রক্সি দিতে।’ বাস্তবে হয়তো অমন ঘটনা ঘটে না। তবে সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে উপজীব্য করেই তো গল্প তৈরি হয়। আজ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে চলছে এই ‘প্রক্সি’ দেওয়ার প্রতিযোগিতা। নিজের দায়িত্ব নিজে পালন না করে সাব-কন্ট্রাক্টে সেটা সম্পন্ন করানোর এক অপরিণামদর্শী প্রবণতা আমাদেরকে গ্রাস করেছে।
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক খন্দকার আলী আশরাফ স্যাটায়ার (ব্যঙ্গাত্মক রচনা) লেখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বর্তমানে লুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় তার নিয়মিত কলাম ‘দুর্জন উবাচ’ পাঠকদের কাছে ছিল কুমিল্লার রসমালাইসম। আমি নিজেও তার ভক্ত ছিলাম। তার একটি লেখায় তিনি অফিস ফাঁকি দেওয়া কর্মকর্তাদের কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন দারুণভাবে। এক বড় সরকারি কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে এক লোক দেখল তিনি নেই। তবে তার চেয়ারের সঙ্গে তার কোটটি ঝুলছে। কর্তব্যরত পিয়ন জানায় ‘স্যার জরুরি মিটিংয়ে’ বাইরে আছেন। ভদ্রলোক কয়েক দিন গিয়েও কর্মকর্তার দেখা পান না। তবে চেয়ারের সঙ্গে তার কোটটি দেখতে পান। অবশেষে একদিন পিয়ন তাকে জানাল, ‘স্যার ঠিকমতো অফিস না করলেও তার কোট ঠিকঠাক অফিস করে।’ প্রায় চল্লিশ বছর আগে একটি খবর বেরুল, জাপানের শ্রমিক-কর্মচারীরা ছুটি নেয় না, সহকর্মীর ওপর চাপ পড়বে বলে। এ নিয়ে একজন সিনিয়র সাংবাদিক তার কলামে প্রস্তাব করেছিলেন, আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীদের জাপানে পাঠিয়ে কর্তব্যনিষ্ঠার শিক্ষা গ্রহণের জন্য। তবে তিনি এ আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত হয়তো অলসতা ও কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা আমাদের থেকে জাপানিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর কার্টুন দেখে এক বন্ধু মন্তব্য করলেন, ‘যতই বেড়াগোড়া দাও, বাঙালিরে আটকাতে পারবা না। তারা বুদ্ধি খাটিয়ে বেড়া ডিঙিয়ে কাজে ফাঁকি দেওয়ার কায়দা ঠিকই বের করে ফেলবে।’ আহ হা! সে প্রখর বুদ্ধি যদি তারা ভালো কাজে খাটাত কত ভালো হতো!
মহিউদ্দিন খান মোহন
সাংবাদিক ও কলামিস্ট