আন্তর্জাতিক রাজনীতি
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ১২:২৯ পিএম
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং উদ্বেগজনক বিষয় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সরাসরি সামরিক সংঘাত। যে পাকিস্তান দীর্ঘ চার দশক ধরে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘কিংমেকার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে চেয়েছে, আজ সেই পাকিস্তানকেই ‘অপারেশন গজব লিল হক’ নামক পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই রূপান্তর কেবল দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের লালিত ‘কৌশলগত গভীরতা’ নীতির চরম ব্যর্থতা এবং সন্ত্রাসের বুমেরাং হয়ে ফিরে আসার এক ঐতিহাসিক দলিল।
সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানকে তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিহত করতে আমেরিকা ও সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তান যে মুজাহিদীন গোষ্ঠী তৈরি করেছিল, তারাই ছিল আধুনিক উগ্রবাদের বীজ। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর তত্ত্বাবধানে এই গোষ্ঠীগুলো প্রশিক্ষিত হয়। পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এই নীতিটিই ‘কৌশলগত গভীরতা’ নামে পরিচিত। কিন্তু পাকিস্তান বুঝতে ভুল করেছিল যে, আদর্শিক উগ্রবাদকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদায় এবং পরবর্তীতে ২০ বছর যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানÑ উভয় ক্ষেত্রেই পাকিস্তান দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করেছে। একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে’ অংশ নিয়েছে, অন্যদিকে তালেবানদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছে। পাকিস্তান ভেবেছিল, মার্কিন-সমর্থিত সরকারের পতন ঘটিয়ে তালেবানরা ক্ষমতায় এলে কাবুল ইসলামাবাদের অঙ্গুলিহেলনে চলবে। কিন্তু ২০২১ সালে তালেবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর মোহভঙ্গ ঘটে। তালেবানরা পাকিস্তানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে একটি স্বাধীন ও জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা পাকিস্তানের হিসাবনিকাশ পাল্টে দেয়।
বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তান অভিযোগ করছে যে, আফগান তালেবান তাদের মাটিতে টিটিপিকে অভয়ারণ্য দিয়েছে, যেখান থেকে তারা পাকিস্তানে রক্তক্ষয়ী আত্মঘাতী হামলা ও সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, টিটিপি এবং আফগান তালেবানের আদর্শিক ভিত্তি একই। ফলে আফগান তালেবানদের পক্ষে তাদেরই ‘জিহাদি ভাইদের’ পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান যে উগ্রবাদী শক্তির চাষাবাদ আফগানিস্তানে করেছিল, আজ সেই শক্তিই ডুরান্ড লাইনের এ-পাড়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
১৮৯৩ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা নির্ধারিত ডুরান্ড লাইনকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে মনে করলেও কোনো আফগান সরকারই একে স্বীকৃতি দেয়নি। বর্তমান তালেবান সরকারও এই সীমানা মানতে নারাজ। পাকিস্তান যখন এই ২,৬৪০ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে শুরু করে, তখন থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত। তালেবানের কাছে এটি কেবল সীমান্ত বিরোধ নয় বরং তাদের পশতুন জনগোষ্ঠীর জাতিগত বিভাজন। এই জাতীয়তাবাদী চেতনা ইসলামের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠায় পাকিস্তানের সামরিক শক্তির অহংকার আজ হুমকির মুখে।
একসময় আফগানিস্তান স্থলবেষ্টিত দেশ হিসেবে সমুদ্রপথ ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই দুর্বলতাকে পাকিস্তান সব সময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বর্তমানে আফগানিস্তান ইরানের চাবাহার বন্দর এবং মধ্য এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সংযোগ পথ তৈরি করেছে। ফলে পাকিস্তানের ওপর তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেকাংশে কমে গেছে। এই অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা তালেবানকে পাকিস্তানের অযৌক্তিক চাপের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার এই ‘খোলা যুদ্ধ’ কেবল দুটি দেশের সীমান্ত সংঘাত নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার সমীকরণকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। কারণ পাকিস্তান বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটাপন্ন। এই অবস্থায় আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। পাকিস্তানের অস্থিরতা মানেই দক্ষিণ এশিয়ায় শরণার্থীর ঢল এবং মাদকের চোরাচালান বৃদ্ধি পাওয়া। এ ছাড়া, এই সংঘাতের ফলে সার্ক বা আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা পুরোপুরি স্তিমিত হয়ে যেতে পারে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এই সংঘাতের রেশ পাক-আফগান সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাকিস্তান যদি আফগান সীমান্ত সামলাতে হিমশিম খায়, তবে তারা নজর ঘোরাতে কাশ্মিরে জঙ্গি তৎপরতা উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আফগানিস্তানে ফেলে যাওয়া অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র এখন টিটিপি এবং অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে। ভারতের আশঙ্কা, এই অস্ত্রগুলো পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে কাশ্মিরে অনুপ্রবেশ করতে পারে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাকিস্তান যখন আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন তালেবান প্রশাসন ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। ভারত বর্তমানে আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। কাবুল চাচ্ছে পাকিস্তান-নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে। এটি পাকিস্তানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের এই হামলা চীনকে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কারণ চীন আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদে বিনিয়োগ করতে চায়, যার জন্য শান্তি অপরিহার্য। অন্যদিকে রাশিয়া এই অঞ্চলে উগ্রবাদের বিস্তার নিয়ে শঙ্কিত। পাকিস্তান-আফগান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়বে।
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান আফগানিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, পাকিস্তান নিজেই আফগান ভূখণ্ডে প্রক্সি যুদ্ধের শিকার হচ্ছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই পরিবর্তনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ প্রতিবেশী দেশের গৃহযুদ্ধ বা পতন ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সব সময়ই ঝুঁকি বহন করে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের এই সংঘাত প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বা আদর্শিক মিল সব সময় কৌশলগত মিত্রতার গ্যারান্টি দেয় না। ভারতের জন্য এটি একদিকে যেমন সুযোগÑ আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব বাড়ানোর, অন্যদিকে এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জÑ সীমান্তের ও-পাড়ে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ ও অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর। পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসের কেন্দ্র বানিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের যে খেলা শুরু করেছিল, আজ তা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। ‘গজব লিল হক’ অভিযান আসলে তাদেরই ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতির করুণ আর্তনাদ। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আফগানিস্তানে সামরিক শক্তিতে কেউ জয়ী হতে পারেনি। পাকিস্তান যদি দ্রুত তাদের প্রতিবেশী নীতি পরিবর্তন না করে এবং সন্ত্রাসবাদকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ না করে, তবে এই সংঘাত কেবল কাবুল নয়, ইসলামাবাদের পতনকেও ত্বরান্বিত করতে পারে। সন্ত্রাসের কোনো সীমানা নেই। যে আগুন প্রতিবেশী দেশ পুড়িয়ে ছারখার করার জন্য লাগানো হয়েছিল, আজ সেই লেলিহান শিখা নিজের ঘরকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে।
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
শিক্ষক ও গবেষক