পরিপ্রেক্ষিত
নাহিদ হাসান রবিন
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ১২:২৬ পিএম
নগর আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে উঁচু হয়ে দাঁড়াতে হয়, আর গ্রাম শিখিয়েছে কীভাবে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু আমরা উঁচু হওয়ার মোহে শক্ত থাকার প্রয়োজনটাই ভুলে গেছি। শহরের আলো, চাকচিক্য আর ব্যস্ততার ভেতর নিজেকে বড় ভাবতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিজের শেকড়কে ছোট করে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলেছি। এই অভ্যাস আকস্মিক নয়; এটি দীর্ঘদিনের লালিত এক মানসিকতা, যার নাম অহং। নগরের এই অহংয়ের ভার বইছে গ্রাম নীরবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে।
বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় গ্রাম ও শহর আলাদা নয়। অথচ আমাদের চিন্তার কাঠামোতে শহর মানেই অগ্রগতি, গ্রাম মানেই পিছিয়ে থাকা। এই ধারণা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে গ্রামকে পরিচয়ের অংশ হিসেবে স্বীকার করতেও অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। শহরে এসে গ্রামের টান বদলে যায়, স্মৃতি ঢেকে যায়, শেকড় চাপা পড়ে যায় কৃত্রিম আভিজাত্যের নিচে। এতে শহর বড় হয় ঠিকই, কিন্তু মানুষ ছোট হয়ে যায়। শহরের প্রতিদিনের জীবনধারণ যে খাদ্যের ওপর দাঁড়িয়ে, তার প্রায় সবটাই আসে গ্রাম থেকে। ধানক্ষেতের পরিশ্রম, খাল-বিলের মাছ, সবজির বাগানের যত্ন, সব মিলিয়ে শহরের জীবনচক্র সচল। কিন্তু এই অবদানকে আমরা স্বাভাবিক ধরে নেই, যেন গ্রামের দায়িত্বই শহরকে বাঁচিয়ে রাখা।
গ্রামের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁচতে জানে। বৃষ্টি হলে অপেক্ষা, খরা হলে ধৈর্য, বন্যা হলে সহনশীলতা, এই জীবনচর্চা শহরের মানুষের কাছে অচেনা। শহরে আমরা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, গ্রামে মানুষ প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নিতে শেখে। এই শেখাটাই আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু আমরা সেই জ্ঞানকে অগ্রাহ্য করে কেবল যান্ত্রিক সুবিধাকেই উন্নয়নের মানদণ্ড বানিয়েছি। নগরের জীবন আমাদের দিয়েছে সুযোগের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে প্রশান্তি। এখানে মানুষ মানুষের ভিড়ে একা, শব্দের ভেতরেও নিঃশব্দ। গ্রামে এখনও সম্পর্ক হিসাবের খাতায় লেখা নয়, হৃদয়ের টানে বাঁধা। অথচ এই মানবিক সম্পদকে আমরা মূল্যহীন ভেবে পেছনে ফেলে এসেছি।
গ্রাম যে সব দিক থেকে সমস্যামুক্ত, তা নয়। সেখানে দারিদ্র্য আছে, সেবা ঘাটতি আছে, সুযোগের অভাব আছে। কিন্তু এই সমস্যাগুলো গ্রামের ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। আমরা যদি শহরের উন্নয়নের সামান্য অংশও পরিকল্পিতভাবে গ্রামে বিনিয়োগ করতাম, তাহলে এই বৈষম্য এত গভীর হতো না। সমস্যার দায় চাপিয়ে গ্রামকে তুচ্ছ করা আসলে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। শহরমুখী জনস্রোত আজ নগরজীবনকেও বিপর্যস্ত করছে। বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে বাসস্থানের সংকট, বাড়ছে পরিবেশগত চাপ। শহর ক্রমে নিজের ভার নিজেই বহন করতে পারছে না। অথচ আমরা সমাধান খুঁজি আরও শহর বানানোর মধ্যে, গ্রামকে শক্তিশালী করার মধ্যে নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। গ্রাম কেবল আবেগের জায়গা নয়, অর্থনীতিরও মূল ভিত্তি। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, কুটিরশিল্প এই সবই গ্রামকেন্দ্রিক। সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মান পেলে গ্রাম হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র। এতে শহরের ওপর চাপ কমবে, দেশের উন্নয়ন হবে ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু তার জন্য আগে দরকার মানসিক পরিবর্তন। গ্রামকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখা। নগরের অহং আমাদের শেখায় ওপরে তাকাতে, গ্রামের দায় আমাদের শেখায় নিচে পা রাখতে।
আজ যখন বিশ্ব আবার স্থানীয় জীবনের দিকে ফিরছে, তখন আমাদের নিজেদের গ্রামকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। গ্রাম মানে পশ্চাৎপদতা নয়, গ্রাম মানে সম্ভাবনার ভান্ডার। গ্রাম মানে স্থায়িত্ব, গ্রাম মানে সহনশীলতা। এই গুণগুলো ছাড়া কোনো সভ্যতাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমরা কি এমন এক নগর চাই, যা নিজের অহং নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যা গ্রামের দায় স্বীকার করে ভারসাম্যে এগোয়? উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। কারণ যে শহর গ্রামকে সম্মান করতে শেখে, সেই শহরই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়।
কথাশিল্পী