হোসেন শহীদ মজনু
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪৩ এএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫১ এএম
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
এ বিশ্ব যেন রঙ্গমঞ্চ। এখানে সব দেশের রাজাদের রাজার ভূমিকায় ‘বিরাট শিশু’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ইচ্ছের অঙ্গুলিহেলনে সব দেশ তটস্থ! তার মন চাইল, তুলে নিলেন এক দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে। মনের ইচ্ছে পূরণে তিনি সব দেশের ওপর শুল্ক চাপিয়ে দিলেন। এই শুল্কযুদ্ধে বিশ্ববাসীর নাকানি-চুবানি খাবার দশা হলেও সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। আন্তর্জাতিক আইনে এসব করার কোনো অধিকার নেই কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের। এমন আচরণ যুদ্ধাপরাধের শামিল। কিন্তু তাকে থামাবে কে? ‘বেড়ালের গলায় ঘণ্টা’ বাঁধার দায়িত্ব যাদের, তারা নির্বিকার কিংবা সামান্য বিবৃতি দিয়ে ‘চুপচাপ-অভিনেতার’ ভূমিকা পালন করছেন। জাতিসংঘসহ পরাক্রমশালী সংস্থাগুলোরই যেন ‘ত্রাহি দশা’।
ফিলিস্তিনের গাজায় নামমাত্র যুদ্ধবিরতি চলছে। কিন্তু সেখানকার যুদ্ধ থামেনি, জ্বলছে তুষের আগুন। সুদান থেকে ইউক্রেন কোথাও শান্তির লেশমাত্র নেইÑ সর্বত্রই পোড়া বারুদের গন্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশ্রয়েই বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের ঝনঝনানি বাড়ছে। ভেনেজুয়েলাকে তছনছ করার পর ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরান। সেখানেও তার আগ্রাসী থাবা পড়েছে। ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে এক দিনের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবারের অন্য সদস্য, শতাধিক শিক্ষার্থীসহ প্রায় ২০০ জনকে হত্যা করেছে। যেকোনো মূল্যে দখলদারত্ব কায়েমই যেন ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টার্গেট শুধু ইরান নয়। আছে ইয়েমেন ও লেবাননও। হামলার জবাবে ইরান পাল্টাহামলা চালিয়েছে মুসলিম দেশগুলোয় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে। এমন পরিস্থিতিতেও ইরানের পক্ষে মুসলিম বিশ্ব কতটা দাঁড়াবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ইরানিদের জাতীয়তাবাদ উজ্জীবিত হচ্ছে। কিন্তু এত বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের পরও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্য দুই পরাক্রমশালী রাশিয়া ও চীন সেভাবে কার্যকর কিছুই করেনি। তাদের বিবৃতি কিংবা শোক প্রকাশ ‘রাজার পুকুরে দুধ দেওয়ার’ গল্পের মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ‘ট্রাম্পশুল্ক’-নীতির কারণে বিশ্ববাণিজ্য বড় বাধার মুখে পড়েছে। মুক্ত বাণিজ্যে বিশ্বাসী দেশগুলোর অর্থনীতিতে লেগেছে বড় ধাক্কা। আধুনিক অর্থনীতি পারস্পরিক নির্ভরতায় এক দেশের কাঁচামাল, অন্য দেশের উৎপাদন আর ভিন্ন কোনো দেশের বাজার মিলেই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পশুল্ক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর কাঁচামালকেন্দ্রিক পণ্যের। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে সক্ষমতা কমছে বাংলাদেশসহ ছোট দেশগুলোর। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কাঁচামাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আসে, শুল্ক বাড়লে সস্তা শ্রমের সংস্থান থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে আমাদের পোশাক শিল্প।
বিশ্বরাজনীতিতে গণতন্ত্র কিংবা অন্য কোনো তন্ত্রের যেন আর জায়গা নেই। এখানে ‘ট্রাম্পতন্ত্র’ বিরাজ করছে, তার যখন যা ইচ্ছে তিনি তাই করছেন, আগামীতেও করবেন! শক্তির দাপটে সবাই কাবু, সব ধরনের কূটনীতি ব্যর্থ। দুনিয়াজুড়ে যত বড় বড় সব অঘটন তার চালিকাশক্তির পেছনে ‘বিরাট শিশু’ ট্রাম্প। তার ‘শিশুখেলা’য় ক্রমশ সমস্যার আবর্তে নিপতিত হচ্ছে পুরো দুনিয়া। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের ভাষায়Ñ
‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে।।
শূন্যে মহা আকাশে
মগ্ন লীলা বিলাসে,
ভাঙিছ গড়িছ নীতি ক্ষণে ক্ষণে।।’
এ বিশ্বের ‘প্রভু’ ট্রাম্পের ভাঙা-গড়ার খেলায় পুরো বিশ্ব তটস্থ। কোথায় কখন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয় কিংবা কখন কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে উঠিয়ে নেন, সেই শঙ্কা শিগগিরই দূর না হলে অদূরভবিষ্যতে বিশ্বশান্তি কেতাবি শব্দ হয়ে পড়বে।