ভূমিকম্প
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৮ পিএম
গত শুক্রবার ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশ। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কম্পন হলেও তা আমাদের সামনে আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেÑ আমরা কতটা ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছি। সৌভাগ্যক্রমে বড় ধরনের প্রাণহানি বা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর না এলেও এ ধরনের কম্পন ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হতে পারে। তাই এখনই সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত হওয়ার বিকল্প নেই।
পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে ১৪৫ বার
ছোট-বড় ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে বাংলাদেশে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলে মোট ৫৩টি ভূমিকম্প
হলেও ১৮টির উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ অংশে। বাকিগুলোর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও
মিয়ানমারে। ২০২৫ সালে দেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা অনেক বেশি দেখা গেছে। এ সময়ে
দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো বাংলাদেশে প্রায় ৭৬ থেকে ১৩৫টি ছোট-বড় ভূকম্পন রেকর্ড
করেছে। এর মধ্যে গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে উৎপত্তি ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি
ছিল শক্তিশালী। ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূকম্পন
অনুভূত হয়। এবারের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। কার্যত ছোট-বড়
মাত্রার এসব ভূমিকম্প সামনের বড় মাত্রার ভূমিকম্পের আভাস দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে
বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ
ও সংলগ্ন এলাকা দিয়ে তিনটি টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান হওয়ায় এর সংযোগস্থলে প্রচুর
শক্তি জমে আছে, যা একসময়ে বড় ধরনের ভূকম্পনের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭.৫
থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি ভূ-অভ্যন্তরে জমা হয়ে আছে। আর এ কারণেই
বাংলাদেশকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বাস্তবতা হচ্ছে, অন্যান্য প্রাকৃতিক
দুর্যোগের মতো ভূমিকম্পের বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস
দেওয়ার মতো এমন কোনো পদ্ধতি এখনও আবিষ্কার হয়নি। এটি পৃথিবীর ইন্টারনাল বিহেভিয়ার
এবং ইন্টারনালি লেট মুভমেন্ট এনার্জি রিলিজের মাধ্যমে এক প্লেট থেকে অন্য প্লেটে
এনার্জি বিনিময় হয় বা কোনো কারণে যখন শক্তির পরিবর্তন হয়, তখনই ভূমিকম্পের মতো
ঘটনা ঘটে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের মতে বিশ্বে ভূমিকম্পের জন্য
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের তালিকায় আছে ঢাকা। তাই বাংলাদেশে বড় মাত্রার
ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। শুধু তাই নয়, বড় ধরনের
ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের চেয়ে সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে ব্যাপক
ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে
অবস্থিত। হিমালয় অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের চাপ, মিয়ানমার ফল্ট লাইন এবং ডাউকি ফল্টের
সক্রিয়তা আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা বহুবার সতর্ক
করেছেনÑ রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ভবন নির্মাণ ভবিষ্যতে
ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরগুলোতে প্রতিদিনই গড়ে
উঠছে নতুন নতুন বহুতল ভবন। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এসব ভবন কতটা ভূমিকম্প-সহনশীল? বিল্ডিং
কোড মানা হচ্ছে কি? বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মকানুন উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ
সম্পন্ন হয়। এতে সামান্য মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই মনে রাখতে
হবে, ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প আমাদের জন্য সতর্কবার্তাÑ এটি হয়তো বড় কিছুর পূর্বাভাস।
শুধু অবকাঠামোগতই নয়, জনসচেতনতার ঘাটতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। ভূমিকম্পের
সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবেÑ এসব বিষয়ে
অধিকাংশ মানুষ পর্যাপ্তভাবে অবগত নন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও শিল্পকারখানায়
নিয়মিত মহড়া আয়োজন করা জরুরি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সচেতনতামূলক প্রচার
বাড়াতে হবে।
সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতিও প্রশ্নের মুখে। দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর
সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার
আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রস্তুত করে
প্রয়োজনীয় সংস্কার বা অপসারণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আমরা জানি, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো
সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা। ৫.৪ মাত্রার
এই কম্পন আমাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এখন যদি আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেই, ভবিষ্যতে
বড় ধরনের ভূমিকম্পে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
তাই সময় থাকতে প্রস্তুতি নেওয়াই হবে দূরদর্শিতার পরিচয়। নিরাপদ অবকাঠামো,
কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সচেতন নাগরিকÑ এই তিনের সমন্বয়েই কেবল আমরা সম্ভাব্য
বড় বিপর্যয় থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে পারি।