দ্রব্যমূল্য
এস এম নাজের হোসাইন
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৩:১১ পিএম
রমজান মাস শুরু হয়েছে। রমজান এলেই সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার সহনীয় রাখার জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে মতবিনিময়সহ নানা পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয়ে থাকে। যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ অতি জনগুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমটি এবার সেভাবে আয়োজনের উদ্যোগে দেখা না দেওয়ায় দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের জাতীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ জেলা প্রশাসনকে তাগাদা পত্র প্রদান করা হয়। যার প্রেক্ষিতে কয়েকটি জেলায় এ ধরনের সভা আয়োজনের সংবাদ দেখা যায়। সভাগুলো অনেকেই আনুষ্ঠানিকতা বললেও ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বা তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশের লক্ষণ দৃশ্যমান ছিল না বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই আবার বিষয়টি অনেকটাই লোক দেখানো বলেই অভিমত প্রকাশ করেছেন। রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার তদারকিতে প্রশাসন কি উদ্যোগ নেবে? ব্যবসায়ী ও সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কী সহযোগিতা আশা করেন সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি বলে জানান।
আমাদের সকলেরই
জানা, পবিত্র মাহে রমজানে যে সমস্ত পণ্য বেশি ব্যবহার হয় তার মধ্যে ছোলা, সয়াবিন, খেজুর,
ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, পেঁয়াজু, লেবু, শসা, কাঁচামরিচ, বেগুন, আমদানিকৃতসহ নানা পণ্য
যেগুলোর দাম রমজানের আগে স্বাভাবিক থাকলেও রমজানের ১/২ দিন আগে আকাশচুম্বী হয়ে যায়।
যেখানে ২০টা ডজনের শসা ১২০ টাকা, কাঁচামরিচ মার্কেট উধাও হয়ে যাওয়া ও দাম সাধারণের
নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিকভাবেই ঘটে গেলেও ব্যবসায়ীরা এগুলোকে
স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেন। আবার দেশীয় পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, শাড়ি, কসমেটিকস, জুতা বিদেশি
স্টিকার লাগিয়ে ১ হাজার টাকার পণ্য ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করার ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে।
ঢাকার চকবাজারের নকল কসমেটিকস বিদেশি স্টিকার লাগিয়ে আমদানি বলে চালিয়ে দিয়ে মানুষকে
প্রতারণা করে মানুষের পকেট কাটছেন। আর বাজার তদারকিতে ধরা পড়লেই হয়রানি বলে চালিয়ে
দেন।
ঠিক একইভাবে সরকার
বিভিন্ন সময় দেশের ভোক্তাদের স্বার্থ চিন্তা করে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট,
ট্যাক্সসহ নানা কর রেয়াতি সুবিধা প্রদান করলেও ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে ও বেশি দামে আমদানিসহ
নানা অজুহাতে সরকারের এই বিশাল কর রেয়াতি সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে আসতে দেন না। পুরো
সুবিধাটুকু তারা নিয়ে নেন।
রমজানে বেশি ব্যবহার্য
ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপ। কাস্টমস, বন্দর
ও আমদানিকারকদের তথ্য মতে, রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত। ফলে রমজান
মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তবে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত পরিবহন
খরচ, জ্বালানিসংকট, চাঁদাবাজি, বন্দরে ধর্মঘট ও বাজারে প্রশাসনিক তদারকির অভাবে পণ্যের
দামে প্রতিবারের মতো কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে বড়
আমদানিকারক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সার্বিক সহায়তা ও নজরদারি প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীরা নানা
সময় নানা অজুহাত দিয়ে মানুষের পকেট কাটেন। তাদের মতে, আমদানি তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর
করা ঠিক হবে না। চিনি আমদানি বেশি হলেও পণ্য যদি জাহাজেই থেকে যায়, খালাস করা না হয়,
তাহলে বাজারে স্বস্তি আসবে না। আবার মাত্র চার-পাঁচটি করপোরেট গ্রুপ যদি ময়দা, ছোলা,
ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্য উৎপাদন, আমদানি এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে বাজার ব্যবস্থাপনায়
ভারসাম্য ঘটবে না। কারণ খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারজাত
করে থাকেন। কিন্তু যখন মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটে তখন সরকার এসব বড় প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিকে জরিমানা করে থাকেন। তাই আমদানিকারক, উৎপাদক ও উৎসস্থলে
যদি তদারকির আওতায় আনা না তাহলে সমস্যা চিহ্নিত হলেও সমাধান হবে না।
তবে ভোক্তা হিসেবে আমাদের বক্তব্য একটাই, পবিত্র মাহে রমজান, মুসলিম বিশ্বে আসে নাজাতের মাস হয়ে। আর আমাদের দেশে আসে মুনাফার মাস হয়ে। ব্যবসায়ীরা রমজানে এক মাস ব্যবসা করবে, ১১ মাস বসে থাকবে। পৃথিবীর সকল রাস্ট্রে রমজানের সময় মূল্যছাড়সহ নানা উদ্যোগ থাকলেও আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা পুরো বছরের লাভ রমজানে তুলে নিয়ে নিজেরা রাজনৈতিক দলের বড় অনুদান দাতা, দানবীর, সাদামনের মানুষ ইত্যাদি সাজার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। অথচ রমজানে তারা যদি ভোক্তাদের প্রতি সদয় হয়, তাহলে রোজাদাররা স্বস্তিতে রমজানে রোজাপালন, ইবাদত বন্দেগি ও উপাসনা পালন করতে পারেন। যার জন্য রোজাদারদের দোয়াও তারা পাবেন। একই সঙ্গে বাজার তদারকিতে দায়িত্বরত প্রশাসন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন যারা বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তারাও যদি কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য লোক দেখানো দায়িত্বপালন করেন তাহলে তারাও কিন্তু সে অপকর্মের ভাগীদার হবেন। বিষয়টি অনুধাবন করে কারও প্রতি সদয় বা বিভাজন না করে যথাযথভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করলেই সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হবে, সাধারণ মানুষ পবিত্র মাহে রমজানে স্বস্তিতে রোজা পালন ও ইবাদত বন্দেগি করতে পারবে।
এস এম নাজের হোসাইন
ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)