× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রজন্মের ভাবনা

মানসিক স্বাস্থ্য ও লোনলিনেস এপিডেমিক

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৩ এএম

মানসিক স্বাস্থ্য ও লোনলিনেস এপিডেমিক

‎‎‎সভ্যতার অগ্রযাত্রায় আমরা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে দূরত্ব শব্দটির আভিধানিক অর্থ প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের হাতের তালুর এক টুকরো কাচ আর কিছু সার্কিটের সমন্বয়ে তৈরি স্মার্টফোনটি আজ পুরো বিশ্বকে এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। একটি ট্যাপে হাজারো মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, ছবি দেখা, অন্যের জীবনের গল্প শোনা কিংবা লাইক-কমেন্টের বন্যায় ভেসে যাওয়া এ সবই এখন আমাদের নিত্যদিনের যাপন। কিন্তু এই অসীম ডিজিটাল সংযোগের সমান্তরালে এক ভয়াবহ শূন্যতা আমাদের অস্তিত্বকে গ্রাস করছে। আজ আমরা একে অপরের সাথে যতটা সংযুক্ত, ঠিক ততটাই বিচ্ছিন্ন। একবিংশ শতাব্দীর এই ‘হাইপার-কানেক্টিভিটি’ বা অতি-সংযুক্তির যুগে মানুষের আত্মা যেন এক নিদারুণ একাকীত্বের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে।

‎বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন আমাদের এই যান্ত্রিক সভ্যতার কঙ্কালসার চেহারাটি উন্মোচিত করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজন বর্তমানে তীব্র একাকীত্ব বা ‘লোনলিনেস’-এ ভুগছেন।পরিসংখ্যানটি এখানেই থেমে নেই।প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু এই একাকীত্বের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। বছরে যা প্রায় আট লক্ষ সত্তর হাজারেরও বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এখন একাকীত্ব একটি বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। সবচাইতে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই মরণঘাতী একাকীত্বের হার সবচেয়ে বেশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ১৭ থেকে ২১ শতাংশই তীব্র বিচ্ছিন্নতায় ভুগছেন। যে প্রজন্মের হাতে প্রযুক্তির সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি নিরস্ত্র ও অসহায়।

‎আমরা কখনোই এতটা ‘কানেক্টেড’ ছিলাম না, তবু ইতিহাসে কখনোই মানুষ এতটা একা বোধ করেনি। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের এক বিশাল পরিসর দখল করে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংযোগের গভীরতা কতটুকু? পর্দার ওপারের এই যোগাযোগগুলো মূলত উপরিভাগের। আমরা যখন নিউজফিডে অন্যের সাজানো জীবনের উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো দেখি।ফিল্টার লাগানো নিখুঁত ছবি, বিদেশের ভ্রমণ ডায়েরি কিংবা সাফল্যের চকচকে গল্প তখন অবচেতনভাবেই আমরা নিজেদের জীবনের সাথে তার এক অসম তুলনা শুরু করি। এই তুলনার বিষবাষ্পে পড়ে নিজের সাধারণ দিনগুলোকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ব্যর্থ মনে হতে থাকে। ফলে তৈরি হয় ‘ফোমো’ কিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা। মনে হয়, পৃথিবীর সব আনন্দ উৎসবে সবাই নিমন্ত্রিত, কেবল আমিই এই যজ্ঞ থেকে বাদ পড়ে গেছি। এই অপ্রাপ্তিবোধ মানুষকে ভিড়ের মাঝেও আরও বেশি একা করে দেয়।

‎গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে। রাত জেগে স্ক্রিন স্ক্রল করা কিংবা স্মার্টফোনের নীল আলোতে ডুব দিয়ে নোটিফিকেশনের অপেক্ষা করা আমাদের ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি উভয়ই কেড়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে, যখন স্মার্টফোন মানুষের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হলো, তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তরুণ তরুণীদের মধ্যে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো ভিজ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের মনে নিজের শরীর বা জীবন নিয়ে এক ধরণের হীনম্মন্যতা তৈরি করছে। আমরা অনলাইনে শত শত মানুষের সাথে কথা বলছি। হাজার হাজার ফ্রেন্ড লিস্ট বা ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছি।কিন্তু সেই ডিজিটাল অক্ষরেরা আমাদের সত্যিকারের কোনো সান্ত্বনা দিতে পারছে না। লাইক আর রিঅ্যাকশন কখনো একজন রক্ত-মাংসের মানুষের মমতাময়ী চাহনি কিংবা আশ্বাসের হাতের বিকল্প হতে পারে না।

‎এই ভার্চুয়াল মায়াজালে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি ‘প্যাসিভ স্ক্রলিং’-এ। আমরা অন্যদের জীবন দেখি কিন্তু তাদের সাথে গভীর কোনো কথোপকথন করি না। চোখে চোখ রেখে কথা বলা, হাত ধরে নীরবতা ভাগ করে নেওয়া কিংবা একসাথে এক কাপ চা পানের যে মানবিক উষ্ণতা, তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। ডিজিটাল সংযোগের এই গোলকধাঁধায় আমাদের মানবিক অনুভূতিগুলো যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যখন কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমিয়ে দেয়, তখন তার বিষণ্নতা ও একাকীত্বের লক্ষণগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে। এটি প্রমাণ করে যে, পর্দার জীবন আমাদের মুক্তির পথ নয়। এটি এক অদৃশ্য শিকল।

‎এই হাইপার-কানেক্টিভিটির যুগে আমাদের আত্মাকে বাঁচাতে হলে যান্ত্রিকতা থেকে কিছুটা বিরতি নেওয়া আজ বাধ্যতামূলক। প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু জীবনের গভীরতা কেড়ে নিয়েছে। আমাদের আবারও শিখতে হবে কীভাবে মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। সত্যিকারের সংযোগ শুধু ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে হয় না, তা হয় হৃদয়ের স্পন্দনে। আজ যদি নিজেকে খুব একা লাগে, তবে ফিড স্ক্রল না করে ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট ঘেঁটে প্রিয় কোনো মানুষকে কল করা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের জমানো দূরত্ব ঘুচিয়ে শুধু বলা যেতে পারে, “কেমন আছো? তোমার কথা খুব মনে পড়ছে।” এই অতি সাধারণ একটি বাক্যই হয়তো অন্য প্রান্তে থাকা কোনো নিঃসঙ্গ মানুষের অন্ধকার ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে পারে।

‎ আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্য মানুষই পরম আশ্রয়। আমরা যত আধুনিকই হই না কেন, আমাদের আদিম আকাঙ্ক্ষাটি আজও অপরিবর্তিত। আমরা আজও চাই এমন কাউকে, যার কাঁধে মাথা রাখা যায়, যার হাত শক্ত করে ধরে বলা যায়- আমি তোমার পাশে আছি। স্ক্রিনের আড়ালের শত কোটি পিক্সেলের চেয়ে একজন মানুষের উষ্ণ উপস্থিতি অনেক বেশি শক্তিশালী। আসুন, ডিজিটাল সংযোগের অরণ্য থেকে বেরিয়ে এসে আমরা পুনরায় মানুষে মানুষে হৃদয়ের সেতুবন্ধন গড়ি।


শিক্ষার্থী,রসায়ন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা