ছোট খাতে বড় গরমিল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৬ এএম
‘পুকুরচুরি’ বাগধারাটির সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত। বড়সড় দুর্নীতির প্রসঙ্গে সামনে আসে এ বাগধারাটি। দুর্নীতিগ্রস্ত কতিপয় সরকারি কর্মকর্তার এমন ‘পুকুরচুরি’র খবর বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অথচ আমরা সর্বত্রই দুর্নীতি কমানোর কথা বলি। সরকারপ্রধানও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানকে থোড়াই তোয়াক্কা করা হচ্ছে। শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, খোদ সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানও ‘পুকুরচুরি’র সঙ্গে জড়িত। এমনই একটি ‘পুকুরচুরি’র পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ।
‘হাঁস পালা হবে বরিশালে, এসি লাগবে ঢাকায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে
জানা যায়, বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় চার জেলা সদরে জলবায়ু-সহিষ্ণু হাঁস পালন সম্প্রসারণের
নামে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পটিতে ২ টনের দুটি এসি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে,
যার ব্যয় এক জায়গায় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৫ লাখ টাকা, আরেক জায়গায় ৪ লাখ টাকা মাত্র!
আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ছোট এ প্রকল্পের কাজ উপকূলীয় এলাকায় হলেও এসি কেনার প্রস্তাব
করা হয়েছে ঢাকায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অফিসে ব্যবহারের জন্য। একই আইটেমের দামের এমন
অমিল কীভাবে সম্ভব, তার কোনো ব্যাখ্যাও নেই।
২ টনের দুটি এসি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) কেনার যে প্রস্তাব দেওয়া
হয়েছে, যার ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। আমাদের প্রশ্ন তাহলে একটি এসির দাম
কত? যদিও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের প্রধান প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘এখানে টাইপিং মিসটেক হতে পারে।’ আমাদের প্রশ্ন টাইপিং মিসটেকের
মাধ্যমে সরকারের টাকা নয়ছয় করার এই প্রকল্পের দায় এড়ানোর সুযোগ কী রয়েছে?
শুধু এসি কেনাই নয়, প্রকল্পটিতে তিনটি কর্মশালার জন্য খরচ ধরা হয়েছে
প্রায় ১৮ লাখ টাকা। অথচ কেন এই কর্মশালা বা কোথায়Ñ কী বিষয়েÑ কারা অংশ নেবেন বা কারা
আলোচক থাকবেন সে সম্পর্কেও প্রকল্পে কোনো তথ্য রাখা হয়নি। একইভাবে পরিবহন সেবার জন্য
একটি ডাবল কেবিন পিকআপ সংগ্রহের কথা বলা হলেও তার ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ সংযুক্ত করা
হয়নি। অন্যান্য মনিহারি খাতে থোক হিসাব থেকে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। কিন্তু
বিস্তারিত নেই এরও। এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন খাতে ধরা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
কিন্তু কোন যন্ত্রপাতি ব্যবহার হবে, কী স্পেসিফিকেশন, বাজারদর কীভাবে নির্ধারণ করা
হয়েছেÑ এসব মৌলিক তথ্য নেই ডিপিপিতে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে প্রকল্পের নামে এভাবে আর কত নয়ছয়? দুর্নীতির
লাগাম কী কোনোভাবেই টানা যাবে না? একই সঙ্গে প্রশ্নÑ হাঁস পালন প্রকল্পটি বরিশালে হলেও,
ঢাকায় এসি লাগানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি কে বা কারা করেছেন? এই দায় তো অন্যের
ঘাড়ে চাপিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা আগেও দেখেছি, প্রকল্পের নামে হরিলুট, কর্মকর্তাদের
নানা অছিলায় বিদেশ ভ্রমণ, সরকারের টাকা নয়ছয় করার নানা প্রক্রিয়া। আগেও বিভিন্ন সময়ে
কর্মকর্তাদের নানান হাস্যকর ও উদ্ভট প্রকল্পের কথা পত্রপত্রিকায় এসেছে। ওপর মহলের হস্তক্ষেপে
সেসব নয়ছয়ের ছক ও ভ্রমণবৃত্তান্ত ভেস্তে গেলেও এ ধরনের অপচয়ের সব খবরই যে পত্রিকায়
আসে, তেমনটি জোর দিয়ে বলার সুযোগ নেই।
নানা কারণে বর্তমানে দেশে অর্থনৈতিক সংকটের ছায়া রয়েছে। এ অবস্থা
থেকে উত্তরণের জন্য চলছে কৃচ্ছ্রসাধন। বৈশ্বিক সংকট বিবেচনায় রেখেই ব্যয় সংকোচন নীতি
মেনে চলার নির্দেশনা রয়েছে। তারপরও কর্মকর্তাদের এরকম উদ্ভট প্রকল্প প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই
প্রশ্ন জাগায়। আমরা স্পষ্টতই অবাক হই, কী করে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত
ও বালখিল্য প্রস্তাব রাখতে পারেন?
আশার কথা অতীতের মতো এবারও প্রকল্পের এমন ব্যয়বাহুল্য নিয়ে প্রশ্ন
তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু প্রশ্ন উত্থাপনই না, আমরা এ ধরনের অন্যায়,
অনৈতিক ও স্বেচ্ছাচারী আবদারের প্রতিবিধান প্রত্যাশা করি। যারা একটি দুই টনের এসির
পেছনে অযৌক্তিক দাম প্রস্তাব করেছেন, তা শুধু টাইপিং মিসটেক বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ
নেই। বরং যারা এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যারা দুর্নীতিকে নানান কৌশলে ধামাচাপা
দিতে চান, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। আমরা মনে করি,
অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ভবিষ্যতে এ ধরনের অন্যায় আবদার রোধ করা যাবে।
আগামীর অপরাধপ্রবণতা কমাতে, জনগণের টাকা যেন নয়ছয় না হয়, সে দিকটি নিশ্চিত করতে অপরাধকে
আড়াল করা বা অপরাধীকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।