পর্যবেক্ষণ
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৬ এএম
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রয়াত সাংবাদিক ও লেখক মিনার মাহমুদ ঢাকায় মাদকদ্রব্যের আদান-প্রদান ও ব্যবহার নিয়ে একটি অসাধারণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন, যা ‘মাসিক গণস্বাস্থ্য’ পত্রিকায় প্রচ্ছদ আকারে প্রকাশ হয়েছিল। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘নেশার কবলে বাংলাদেশ’। বলাবাহুল্য, মিনার তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেই প্রতিবেদনটি তখনকার দিনের সমাজ ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে আলোচনার ঝড় তুলেছিল। মনে হয়, এত বছর পরেও আজকের বাস্তবতায় এর প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু কমেনি।
২.
অবসর সময়ে ইদানীং প্রায়শই গ্রামে যাওয়া হয়। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত
কিছু বৈষয়িক কাজ, সঙ্গে নাড়ির টান বলে কথা। এখন উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে
বারবার যাওয়ার প্রেরণা আসে। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামের স্মৃতি জাগানিয়া অতীত না
থাকলেও স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পঞ্চাশোর্ধ্ব বা প্রৌঢ় মানুষের কাছে গ্রামের মাঠঘাট, ক্ষেতের
আলপথ, পেছনের শৈশব-কৈশোর যেন এক নস্টালজিক স্মৃতিময় জীবনপর্ব।
এখন মাহে রমজান। সিয়াম সাধনার পবিত্র মাস চলমান। দেশে সদ্য নির্বাচিত
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। পূর্বের নিয়মে মানুষ দ্রব্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত
হয়ে আছে। এটা সব সময়ই হয়, কারণ রমজানে এদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজি। গ্রামের
হাটবাজারেও সাধারণ সবজি, লেবু বা কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্য বয়স্কদের কাছে অভাবনীয়
বলে মনে হয়।
গতদিন ইফতারের পরে গ্রামেরই এক প্রৌঢ় স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী সাক্ষাৎ
করতে এলেন। স্বভাবসুলভ জিজ্ঞেস করলে জানালেন, ‘…ভাইজান
এতদিন ভালোই ছিলাম, তবে এখন ছোট ছেলেটাকে নিয়ে খুব অশান্তিতে পড়ে গেছি।’
কী করে ছেলে?
বড়ি খায়।
বড়ি খায় মানে?
ইয়াবার ট্যাবলেট খায়। একটার দাম নাকি ৩০০ টাকা। টাকার জন্য দোকানে
এসে মারধর করে, অত্যাচার করে। ছেলেটা মাদকাসক্ত হয়ে একদল বখাটের সঙ্গে চলে। নেশা করে,
রাতে কোথায় থাকে, কী করে জানি না। তার সঙ্গের সবাই নেশাখোর।
বলো কী?
লোকটা কেঁদে ওঠে। অশ্রুজলে ভিজে যাচ্ছে তার শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখখানি।
চোখে জল নিয়েই বলল, শুধু আমার ছেলে নয়। এলাকার প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই আপনি অন্তত একজন
পাবেনই। প্রকাশ্যে বাজারে ট্যাবলেট বিক্রি করছে, কারও কিছু করার নেই। পাড়া মহল্লার
ঘরে ঘরে ক্রেতা, মজুদদার সকলেই একসঙ্গে আছে। এদেরকে পেছন থেকে নিরাপত্তা দিচ্ছে প্রভাবশালী
অন্যরা। যাদের কথায় থানাপুলিশ শুনে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে এদের কিছু
হয় না, তারা প্রত্যেককে চেনে। অভিযোগ করলে আরও ক্ষতি হয়। অথচ কাছেই পুলিশের ইনভেস্টিগেশন
সেন্টার (আইসি)। এরা নাকি ইয়াবার গাড়ি চেনে, কালার চেনে, সরবরাহকারীকেও চেনে। কিন্তু
কোনো প্রতিকার নেই, যেন সকলে মিলেমিশে সুন্দর সময় কাটাচ্ছেন।
৩.
দুই দিন পর নিজের উদ্যোগে বাড়ির আশপাশে খোঁজ নিতে শুরু করি। শতভাগ
সত্যতা মিলল। নিজের নিকটাত্মীয়-স্বজনের দুয়েকটা স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তানও আসক্ত হয়ে
পড়েছে। তবুও কেউ কাউকে বলতে পারছে না, সামাজিকতা, মানসম্মান এটা লজ্জার বিষয়। এমনকি
সামলাতে পারছে না বিত্তশালী বাবা তার একমাত্র সন্তানকে। অসহায় হয়ে এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছে।
নেশাখোর সন্তান টাকার জন্য প্রথমে ঘড়ি, মোবাইল পরে হোন্ডা বিক্রি করে বা বন্ধক রেখেও
ইয়াবার ট্যাবলেট ক্রয় করছে। ১৮/২০ বছর বয়সের ছেলে অভিভাবকের অমতে বিয়ে করে ফেলছে। শ্বশুরালয়
থেকে টাকা নিয়ে মাদকদ্রব্য ক্রয় করছে। মধ্যরাত অবধি বাড়ি না ফিরলে মা, বাবা, ভাই খুঁজতে
বের হচ্ছে চিহ্নিত মাদকের স্পটে। এ যেন এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে গ্রামীণ
মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকগণ। চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, গ্রামের সম্ভাবনাময় মেধাবী
তরুণরা। গত কয়েক বছরে ভেতরে ভেতরে মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে গ্রামীণ জনপদ। আজকাল গ্রামের
ছোট হাটবাজারের চায়ের দোকানে ইশারা-ইঙ্গিতে আলাপ হয়। বিশেষ করে, আসক্তদের আলাদা ভাষা,
আলাদা সংকেত, আলাদা গতিবিধি নজরে পড়ছে। সচেতন অভিভাবকের কেউ কেউ সন্তানকে কিছু দিনের
জন্য জেলা শহরের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছে। ফেরত এসে পুনরায় মাদকে ডুবে গেছে।
এর মূল কারণ সঙ্গদোষ। এ সময় তারা বাবা-মাকে অনায়াসে ছেড়ে দিতে পারে কিন্তু বন্ধুকে
নয়। বন্ধুর ডাকে মধ্যরাতেও ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে
চোখ বুজে দিন কাটাচ্ছে গ্রামের একশ্রেণির মানুষ।
৪.
একটা পরিসংখ্যানে জানা যায়, অন্তত ৫০টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে
প্রতিনিয়ত ঢুকছে ইয়াবা। ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর
কোনো আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে পারছে না। যা হয় সবই গতানুগতিক এবং রুটিনমাফিক। ফলে আইনের
ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে আসামি ও পাচারকারীরা। দেখা যায়, হঠাৎ করে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ
বদলালেও বদলায় না মাদক পাচারের রুট ও তাদের দৈনন্দিন রুটিন। বলাবাহুল্য, বর্তমানে মাদকের
স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে মিয়ানমার। লাখ লাখ টন মাদক উৎপাদন হচ্ছে সেখানে। পৃথিবীর
দ্বিতীয় বৃহত্তম মাদক উৎপাদনকারী দেশের নাম মিয়ানমার। আর এই মিয়ানমারই বাংলাদেশের মতন
অতি জনবহুল দেশের সীমান্তবর্তী দেশ।
দেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রায় অকার্যকর ভূমিকা নিয়ে
সমালোচনার অন্ত নেই। তারা বলছে, দেশে ৭৫ লাখের মতন মাদকাসক্ত। যার ৮০% কিশোর ও তরুণ-তরুণী।
এমন মাদকাসক্তদের মধ্যে আবার প্রায় ৬০% শিশু-কিশোর সঙ্গদোষ ও অসৎ বন্ধুর প্রভাবে পড়ে
কৌতূহলবশত আসক্ত হয়ে গেছে। তবে এর সংখ্যা যে দাপ্তরিক হিসাবের চেয়ে আরও অনেক অনেক বেশি
হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখনই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এর পরিণতি চড়ামূল্যে
সমগ্র জাতিকে দিতে হবে।
৫.
ইয়াবার উৎস সম্পর্কে এখন কমবেশি সকলেরই জানা যে, এর প্রধান রুট কক্সবাজার। টেকনাফ-উখিয়া-চকরিয়া, চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় উত্তরবঙ্গেও ত্বরিতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। মাধ্যম গণপরিবহন বা নিজস্ব বাহন। এদের রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহক। জেলা শহরের পরে এখন উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়েও এদের নির্ধারিত এজেন্ট নিযুক্ত রয়েছে। সেখান থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদকদ্রব্য। আবার জেলা পর্যায়ের ডিলার তার নিজস্ব গাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছে ইউনিয়ন পর্যায়ে। এভাবেই অতি নিভৃতে কিন্তু দিবালোকের চলমান এই সর্বনাশা ব্যবসার নাম মাদক ব্যবসা। বড় বড় এজেন্টরা দিব্যি কথা বলছে থানা বা আইসির ইনচার্জের সঙ্গে। কেউ হাতেনাতে ধরা পড়লে বা ধরিয়ে দিলেও কোনো সমস্যা হয় না, নামমাত্র মামলা হলেও এদের বের করে আনার পেছনের খুঁটি অতি মজবুত। তা ছাড়া ধরা পড়া জিনিস, এগুলো তো অনেক মূল্যবান, উভয় পক্ষেরই প্রয়োজন পড়ে। এটা শুধু আলামত নয়, সার্বক্ষণিক নিজেদের কাছে রাখতে হয়। আবার যখন খুশি কাউকে মামলায় জড়ানোর জন্য এর চেয়ে উপযোগী আর কোনো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র দামি জিনিস হাতের কাছে পাওয়া যায় না। এমনি এক অদ্ভুত, দুর্ভাগা, দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে দেশ চলেছে। কিশোর ও তরুণেরা আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। অথচ মাদকের প্রভাবে তৈরি হচ্ছে একটা অসুস্থ সমাজ। মাদকের প্রভাবে শিক্ষাক্ষেত্রেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। কিন্তু মাদকের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিকার, প্রতিরোধ কে করবে? শিশু-কিশোর, যুবকদের রক্ষায় সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। নবনির্বাচিত হওয়া, সদ্য গঠিত সরকারের কাছে এই জাতি বিধ্বংসী মরণখেলা বন্ধ করার নিমিত্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।