সাঈদ বারী
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯ এএম
জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বহু বাঁক বদলের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কখনও তা সংকটের মুখে পড়েছে, কখনও আবার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। সেই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে সমালোচনা ও বিশ্লেষণ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই আলোচনা নতুন প্রেক্ষাপট পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচন দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হওয়ায় পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর চরিত্র নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গণতন্ত্রে নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক বৈধতা যাচাইয়ের প্রধান মাধ্যম। অতীতের তিনটি নির্বাচনের সমালোচনায় যে বিষয়টি বার বার উঠে এসেছে, তা হলো প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়া এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাবশালী উপস্থিতি। ২০১৪ সালের নির্বাচন কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হয়ে পড়েছিল, ২০১৮ সালে নিয়ন্ত্রিত ফলাফলের অভিযোগ সামনে আসে, আর ২০২৪ সালে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও ‘ডামি প্রার্থী’ ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব ঘটনাপ্রবাহ নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানে।
এই প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত ভূমিকা এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কারণে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভোটার উপস্থিতি, কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা ও পর্যবেক্ষকদের ইতিবাচক মন্তব্যÑ সব মিলিয়ে এটি আস্থার পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারের নির্বাচন দেখিয়েছে, সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হলে জনগণ আবারও ভোটমুখী হতে পারে। দীর্ঘদিনের সংশয় ও অবিশ্বাস সত্ত্বেও ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি; বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিল।
অতীতের নির্বাচনগুলোর সমালোচনায় প্রধান যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা হলো নির্বাচন কমিশনের কার্যত স্বাধীন না থাকা। প্রশাসনিক প্রভাব, রাজনৈতিক নির্দেশনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা কমিশনের সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে সীমিত করেছেÑএমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে অধিক স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান হওয়ায় একটি ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হলে নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংকট। কোথাও বিরোধী দল অনুপস্থিত, কোথাও অভিযোগ ছিল প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রিত। ফলে নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছিলÑ যেখানে ফলাফল পূর্বানুমিত বলে মনে হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দৃশ্যমান হয়েছে, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত থাকলেও তা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সহিংসতায় রূপ নেয়নি।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিন্তু তা হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি দেখিয়েছে যে প্রতিযোগিতা ও স্থিতিশীলতা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং সুশাসনের মাধ্যমে এ দুইয়ের সমন্বয় সম্ভব।
অতীতের তিন নির্বাচনের আরেকটি বড় সমালোচনা ছিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। বিরোধী রাজনীতিকে কোণঠাসা করতে মামলা, গ্রেপ্তার ও নজরদারির অভিযোগ ছিল বহুল আলোচিত। এবারের নির্বাচনে তুলনামূলক সংযত প্রশাসনিক ভূমিকা সেই বিতর্ককে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক উত্তেজনাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি সামনে আসেÑ গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই আয়োজনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। অতীতের নির্বাচনে কাঠামো ছিল, কিন্তু বিশ্বাস ছিল দুর্বল। এবার কাঠামোর সঙ্গে বিশ্বাসের পুনর্গঠন ঘটেছে, এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
তবে এটিও সত্য, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই গণতন্ত্রের সব সংকটের সমাধান নয়। দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রাতারাতি দূর হয় না। কিন্তু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। সে অর্থে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন একটি সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় সাবেক তিন নির্বাচনের সমালোচনা এখন আর কেবল অতীতচর্চা নয়; বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রাসঙ্গিক উপকরণ। অতীতের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়েই বর্তমানের ইতিবাচক দৃষ্টান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি।
কারণ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যদি ব্যতিক্রম হয়ে থাকে, তবে তা গণতন্ত্রের স্থায়ী সমাধান নয়; কিন্তু যদি তা নিয়মে পরিণত হয়, তবে সেটিই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত পুনর্জাগরণ। অতীতের তিন নির্বাচন আমাদের যে অস্বস্তিকর আয়না দেখিয়েছিল, সাম্প্রতিক নির্বাচন সেই আয়নায় নতুন এক সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি এঁকেছে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তাই বলা যায়, হাসিনার আমলের নির্বাচনগুলো নিয়ে যে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচন সেই প্রশ্নগুলোর একটি বিকল্প মডেল হাজির করেছে। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজেরÑ এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতাকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে না রেখে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থায়ী মানদণ্ডে পরিণত করা।
সাঈদ বারী
প্রকাশক ও কলাম লেখক