× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ত্রয়োদশ সংসদ

সমীকরণের রাজনীতি এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ

মো. ইলিয়াস হোসেন

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:২০ পিএম

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫১ পিএম

মো. ইলিয়াস হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মো. ইলিয়াস হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০০১ সালের পরে দ্বিতীয়বারের মতো ভূমিধস বিজয়, নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান ও উল্লেখযোগ্য সংখক আসন প্রাপ্তিÑ এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিন্যাস, বিরোধী রাজনীতির কাঠামো, সামাজিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারেÑ এমনটাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা, তা কেবল কে কত আসন পেয়েছেÑ এই অঙ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্নটি আরও গভীরে : আগামী দিনের রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার পথ কোন দিকে যাবে? সে বিষয়েও নতুন করে চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এই নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনটি রাজনৈতিক শক্তি বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তরুণ প্রজন্ম-নির্ভর নবাগত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উল্লেখযোগ্য। তবে নির্বাচনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও বৃহৎ একটি রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ওই তিন দলের পারস্পরিক সম্পর্ক, জোট-সমীকরণ, ভোটব্যাংকের বিন্যাস এবং অংশগ্রহণ বা অনুপস্থিতির সম্ভাবনা মিলিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা নিছক নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের এক সন্ধিক্ষণ। মূলত আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটারদের একটি বড় অংশ এই নির্বাচনে ‘ভাসমান’ হয়ে পড়েছিল। এই ভোট কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছিল স্থানীয় প্রার্থী, ইস্যু এবং রাজনৈতিক বার্তার ওপর। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন স্বভাবতই দ্বিমুখী হয়েছে, এতে বিএনপি বনাম জামায়াত বা বৃহত্তর বিরোধী জোটের লড়াই হয়েছে। এতে ভোটের অঙ্ক সহজ হয়েছে, বিএনপি এবং জামায়াত কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছে। বিএনপি জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং জামায়াত জোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে, যা স্বাধীনতা-উত্তর সর্বাধিক। 

বিএনপির সামনে এই বিজয় কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন নয়Ñ এটি দলীয় পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের পরীক্ষাও বটে। দলটি ঐতিহাসিকভাবে আন্দোলনমুখী রাজনীতিতে সক্রিয়। যার প্রমাণ, গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনার সরকারের ক্রমাগত নির্যাতনের মধ্যেও দল হিসেবে বিএনপি অত্যন্ত সুসংঘটিত ছিল। ওই সময়ে সরকার বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ দলের চেয়ারপারসন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোসহ তাকে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ওই ক্রান্তিকালীন সময়ে তারেক রহমান প্রবাস থেকেই দলকে সংঘটিত করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ের সকল নেতাকর্মীকে উজ্জীবিত করতে প্রতিনিয়ত ভিডিও কনফারেনসিংয়ের মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। তিনি গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ এ দেশে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন আইকন হিসেবে আবির্ভূত হন।

তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণাসহ পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনি  প্রচারে মানুষের ঢল নামে। ফলে দেশব্যাপী বিএনপির পক্ষে ধানের শীষের জোয়ার তৈরি হয়। বর্তমান আধুনিক নির্বাচনি বাস্তবতায়, দলের মাঠপর্যায়ের সংগঠিত কর্মী কাঠামো এবং ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যম তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জনে দারুণভাবে কাজ করেছে, যার ফলশ্রুতিতে নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে এমন ভূমিধস বিজয় সব সময় দ্বিমুখী বার্তা দেয়। একদিকে এটি জনগণের স্পষ্ট আস্থার প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি বিশাল দায়িত্বের বোঝা। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংসদে আইন প্রণয়নকে সহজ করে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় এবং বিরোধীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যায়। তবে বিরোধী কণ্ঠ দুর্বল হলে সংসদীয় বিতর্কের প্রাণশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। 

এবারের নির্বাচনী ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ এই বিজয় কি কেবল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির ফল, নাকি বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও জন-আস্থার প্রতিফলন? এই বিষয়টিকে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি। যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে এটি হবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তির ইঙ্গিত। আর যদি প্রথমটি বেশি প্রভাবশালী হয়, তবে ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে দলটির শাসন-দক্ষতার ওপর। 

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। একটি ঐতিহাসিক ও বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে প্রতিনিধিত্ব করা সংসদীয় কাঠামোকে একপাক্ষিক করে তুলতে পারেÑ এমন মত অনেকের। এর ফলে সংসদীয় বিতর্কে ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হতে পারে, সংসদে মতবিনিময়ের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে এবং গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি স্থায়ী হবে কি না, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়, তবে তারা যদি সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে শক্তভাবে ফিরে আসতে পারে, তবে রাজনৈতিক সমীকরণ আবার বদলে যেতে পারে। এদিকে এই নির্বাচনে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আভাস দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন প্রাপ্তি রাজনীতির মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সংসদে তাদের উপস্থিতি কয়েকটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণÑ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরেই আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করে আসছে। সংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো তাদের বড় শক্তি। তারা আদর্শিক বিতর্ককে জোরদার করার মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতির ভেতরে বিকল্প অবস্থান তৈরি করতে পারে। নীতিগত প্রশ্নে সরকারকে সমর্থন বা সমালোচনার মাধ্যমেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের এই ভূমিকা কতটা গঠনমূলক হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অধিকন্তু, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিরোধী রাজনীতির কাঠামোয় জামায়াত প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠবে, যা সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগকে জন-আন্দোলনের পথ উস্কে দিতে পারে। এই বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে আগামী পাঁচ বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটুকু স্থায়ী হবে। 

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি কূটনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। বিএনপির জন্য ভূমিধস বিজয় গণরায়ের স্পষ্ট বার্তা বহন করলেও অংশগ্রহণের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বৈধতার বিতর্ক উত্থাপিত হতে পারে। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সব সময় সরকারকে শক্তিশালী করে। অন্যদিকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেÑ যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়। অতএব বিজয়ী দলের দায়িত্ব হবেÑ প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে আমলে নেওয়া, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা এবং সহনশীলতার বার্তা দেওয়া। অতএব বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ হবেÑ শুধু সংখ্যার জোরে নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে শাসন পরিচালনা করা। 

ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, দুর্নীতি দমন এসব ক্ষেত্রে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি করা, না হলে জন-আস্থায় ভাটা পড়তে পারে। এই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ঐতিহাসিক আবেগের চেয়ে বাস্তব ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। যদি নতুন সরকার কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই আস্থা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে এবং দ্রুত হতাশা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। বিএনপির সামনে এখন শাসন দক্ষতার পরীক্ষা, জামায়াতের সামনে দায়িত্বশীল বিরোধী ভূমিকার পরীক্ষা এবং আওয়ামী লীগের সামনে পুনর্গঠনের পরীক্ষা। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংখ্যায় নয়Ñ প্রতিযোগিতা, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যে। যদি নতুন সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করে, বিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা দেয় এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে এই ভূমিধস বিজয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির রায় স্পষ্টÑ জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে। কিন্তু পরিবর্তন কেবল সরকার বদল নয়; এটি শাসনধারা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবর্তনও।

বিএনপির ভূমিধস বিজয় তাদেরকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে দায়বদ্ধতার ভারও বাড়িয়েছে। জামায়াতের শক্ত অবস্থান রাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সাময়িক শূন্যতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জÑ প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহাবস্থান নিশ্চিত করা। কারণ এটাই বহুদলীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। 


মো. ইলিয়াস হোসেন

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা