পিলখানা ট্র্যাজেডি
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম
বিডিআর বিদ্রোহের নামে ১৭ বছর আগে পিলখানায় সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি ’২৬ বিডিআর বিদ্রোহ ও পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বার্ষিকী। ২০০৯ সালের এইদিন ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নাটক মঞ্চস্থ করে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত শুরু হয়েছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডি ইতিহাসের ঘৃণিত অধ্যায়। সেদিন বাংলা হারিয়েছিল জাতির সূর্য সন্তানদের। বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্য রহস্য জাতিকে তৎকালীন শাসক জানতে দেয়নি। বর্তমান সরকারের ওপর প্রত্যাশা করতেই পারি তারা বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত রহস্য জাতিকে জানাবেন। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে গঠিত কমিশন নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে কাজ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতিকে এর রহস্যের বিষয়টি জানাবেন । সেই সঙ্গে সেনা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়কদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবেন।
ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহাসিক বিডিআরের চেতনাকে ধ্বংস করেছে। ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩ মার্চ যে বাহিনী প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিল সেই বাহিনীকে করেছে কলঙ্কিত। শুধু বাংলাদেশ নয়, সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে এতজন সেনাকর্মকর্তাকে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠিত ড. ইউনূস সরকার বাংলাদেশে বিডিআর বিদ্রোহের প্রায় দেড় দশক পর ঘটনার পুনঃতদন্ত শুরু করেছিল। গঠন করা হয়েছিল জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন, যার লক্ষ্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করা। ২০০৯ সালের ওই বিদ্রোহের ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই নানান প্রশ্ন তুলে আসছিলেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা জড়িত থাকার পরও তদন্তে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনার পেছনে বিদেশি সংস্থার হাত ছিল বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। যদিও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার বরাবরই বিষয়গুলো অস্বীকার করে এসেছে।
বিডিআর বিদ্রোহের নামে ১৭ বছর আগে পিলখানায় সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা দাবি করেছেন যে, ‘ইতিহাসের এই ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।’ কমিশনের প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, ‘তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারি বজায় রাখা হয়েছে। ওই হত্যাযজ্ঞের মূল কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ড হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক হলোÑ বিডিআরের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। যেমনÑ ডাল-ভাত কর্মসূচি একটা, তারপর বিডিআর শপ তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে বিডিআর সদস্যদের ডিউটি অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। এটা বিডিআরের ক্লাসিক্যাল বিষয়ের সঙ্গে যায় না। কিছু বিডিআর সদস্য যেভাবেই প্রণোদিত হয়ে থাকুন, তারা সেনাবাহিনীর অফিসারদের এখানে চাচ্ছিলেন না। এটা একটা ছিল। আর বিডিআরের মধ্যে অনেক টানাপড়েন ছিল, যেগুলো আমরা বের করতে সক্ষম হয়েছি। এরকম অনেক কারণ ছিল এই হত্যাকাণ্ড সংঘটনে।
২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের আগের দিন হঠাৎ করেই বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ নিরাপত্তা জোরদার করে তোলে। আমদানি-রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ ঘটনা থেকে প্রশ্নের উদ্রেক হওয়াটা স্বাভাবিকÑ তাহলে কি ভারত জানত পরদিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোন ঘটনা ঘটছে? স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের অব্যাহত আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশ কখনও মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। গুটিকয়েক ভারতীয় পা-চাটা দালাল বাদে ভারতের অব্যাহত সীমান্ত-সাংস্কৃতিক-পানি-বাণ্যিজ্য আগ্রাসনের কারণে দেশবাসী মনেই করে ভারত কখনও বাংলাদেশের সৎ-প্রতিবেশীর পরিচয় দিতে পারেনি।
বিডিআর ট্র্যাজেডির ১৬ বছর হলেও এখন পর্যন্ত এর প্রকৃত রহস্য জাতি জানতে পারেনি। দুটি তদন্ত কমিটি গঠন হলেও একটি তদন্ত কমিটির আংশিক প্রকাশ হলেও পুরোটা আজও জাতি জানে না। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জাতি জানে না। দুঃখ ১৬ বছরে জাতীয়ভাবে ২৫ ফেব্রুয়ারিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করতে পারিনি আমরা। রাজনৈতিক দলগুলো এখনও এই বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। প্রকারান্তরে ২৫ ফেব্রুয়ারি নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দলের ভূমিকা দেখলে মনে হয় ভারত অখুশি হতে পারে বলেই তারা বিষয়টি এড়িয়ে চলেন।
২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডির গতানুগতিক বিচারে কি প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হবে। জাতির স্বার্থেই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা উচিত। চিহ্নিত করে যদি অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব না হয় তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আজকের নেতৃত্বের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। জাতির এই কলঙ্কজনক অধ্যায়কে মুছে ফেলতে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এতগুলো চৌকস কর্মকর্তাকে এক দিনে হত্যা করা জাতির স্বাধীন অস্তিত্বের জন্য কত বড় আঘাত তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এই ঘটনা নীরব পলাশী হিসেবে যেন চিহ্নিত না হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক পাতাই রক্তে রঞ্জিত। অনেক রক্ত আমরা দেখেছি, দেখেছি উন্মুক্ত প্রান্তরে, শহরের রাজপথে কিংবা সেনাছাউনিতে। আর কত উচ্ছৃঙ্খলতা, কত হানাহানি, কত রক্তক্ষরণ বাকি? এর শেষ হবে কোথায়? পিলখানার ট্র্যাজেডির কলঙ্ক কবে মুছবে? আর কত নতজানু হতে হবে জাতিকে? ক্ষমতায় যেতে কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকতে শাসকগোষ্ঠীর ভারতীয় প্রভুদের পদলেহনের দৃশ্য আর কত কাল দেখবে জাতি? আমাদের শাসকগোষ্ঠী মাথা নত করতে করতে এখন মাটিতে মাথা ছুঁয়ে ফেলেছে বলেই হয় ২৫ ফেব্রুয়ারিকে দায়সারাভাবে স্মরণ করতে চাইছি। কেন এই দিনটি আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করতে পারছি না?
পিলখানায় একটি পরিকল্পিত গণহত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে সেখানে ডাল-ভাত কর্মসূচি নিয়ে অসন্তোষ ও বিদ্রোহের প্রচারণা চালিয়ে প্রকৃত অপরাধী ও মূল কুশীলবদের তদন্ত ও বিচারের বাইরে রাখা হয়েছিল। ভারতের পুতুল সরকারের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারের এ বিষয়ে দায়সারা, গাছাড়া ভাব মেনে নেওয়া যায় না। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও পাচারের হোতাদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
আমরা যদি ক্ষমতায় টিকে থাকতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী শক্তির কাছে নিজেদের বিবেক-বিবেচনা বন্ধক দেই, যদি আমরা পরাভূত হই সেই অপশক্তি ও অপশক্তির দালালদের কাছে, আপস করে ফেলি, তাহলে আমি নিশ্চিত ২৫ ফেব্রুয়ারির চাইতে ভয়াবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। অপশক্তির লালনকারীরা ধারকে ও বাহকরা আরও উৎসাহিত হয়ে তাদের স্বার্থ চরিতার্থে আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটাবে এই কথা দ্বীধাহীনভাবে বলা যায়। আর যারা আপস করবেন তাদের স্থান হবে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। আপস করে হয়তো ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে কিংবা কিছু সময়ের জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে কিন্তু ইতিহাসে মীরজাফর হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকতে হবে।
আজ প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪’র গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে নতুন সরকারকে অবশ্যই জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জাতীয়তাবাদী চেতনার তারেক রহমানের সরকারকে ঐক্যবদ্ধভাবে ২৫ ফেব্রয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে জাতীয় এজেন্ডা নির্ধারণ করতে হবে। আসুন সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডি স্মরণে শোক পালন করি।
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
রাজনীতিক ও কলাম লেখক