সবার আগে বাংলাদেশ
মেশকাত সাদিক
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৮ এএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কিংবদন্তিতুল্য নাম। তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বীরোত্তম। স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকারের বহুবিধ গণবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং দেশবিরোধী অপকর্ম জনসাধারণকে বিষিয়ে তোলে। ফলস্বরূপ সংঘটিত হয় নৃশংসতম ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। এরপর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ। এমন অস্থির রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তার শাসনামল সত্যসত্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে সুশাসনের উত্তম দলিল। অন্যদিকে, তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি ও পুত্র তারেক রহমান বর্তমান সময়ে দলীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই ধারার সঙ্গে যুগোপযোগী কার্যধারার সংযোগ সাধনের মধ্য দিয়ে দেশ গঠনের বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করছেন। দুজনের আদর্শের মধ্যে অমিলের চেয়ে মিলই বেশি। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও রাজনৈতিক কৌশল এই কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দুই প্রজন্মের দুই রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক আদর্শের বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জন্ম দেশের ক্রান্তিকালে। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের সংকটকালে। ১৯৭১ সালে দিশাহীন জাতিকে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে ও অটল-অবিচল সংগ্রামের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ঠিক একইভাবে ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশকে স্বাধীন রাখতেই তিনি এগিয়ে আসেন সামনে। কারণ ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল সামরিক ও রাজনৈতিক টানাপড়েন ও জাতীয় বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে। এই সময়ে স্বাধীনতার অনিন্দ্য কণ্ঠস্বর সৎ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী থেকে উঠে এসে সিপাহি-জনতার প্রবল অভ্যুত্থানে বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরে জনচাপে তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। আমরণ তার নেতৃত্ব ছিল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক।
পক্ষান্তরে তারেক রহমানের রাজনীতিতে আগমন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভেতরেই দলীয় সংগঠক হিসেবে পরিচিত হন। রাষ্ট্রক্ষমতায় সরাসরি না থেকেও তিনি সুদীর্ঘকাল দলীয় কৌশল, আন্দোলন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। ফলে একজনের নেতৃত্ব প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় গড়া, অন্যজনের নেতৃত্ব আন্দোলন ও সংগঠকভিত্তিক। তাই নেতৃত্বের কাঠামো ও অভিজ্ঞতার ধরনে রয়েছে বেশ পার্থক্য।
জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা সামনে আনেন। তার মতে, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক নয়; বরং ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা। এই ধারণা তার রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিফলন। অন্যপক্ষে, তারেক রহমানও ধারাবাহিকভাবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে দলীয় আদর্শের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তার আদর্শের মূল বাণীই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি জিয়াউর রহমানের মতবাদেরই এক কথায় প্রকাশ। তাছাড়া তারেক রহমানের বক্তব্যে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটি বারবার শক্তভাবে উপস্থাপিত। এই জায়গায় পিতা ও পুত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট আদর্শিক মিল বিদ্যমান। তবে পার্থক্য হলো : জিয়াউর রহমান এই ধারণা প্রবর্তন ও সাংবিধানিক রূপ দিয়েছিলেন। আর তারেক রহমান সেই মর্মবাণী হৃদয়ঙ্গম করে, তার ব্যাখ্যা ও পুনরুজ্জীবিত করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন অবিরতভাবে।
জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থার পর বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তার শাসনামলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। তিনি নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। জনরায়ের প্রতিফলনই তার রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী দিক ও নীতি। মূলত সুনীতিই তার রাজনৈতিক নীতি। আবার তারেক রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করার বিষয়টি মুখ্য। তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন। এখানে মিল হলো: দুজনই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে আদর্শিকভাবে সমর্থন করেন।
জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজন করেন। তার সময় ইসলামী মূল্যবোধ রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পায়। তিনি ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং ওআইসি-তে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তারেক রহমানও ইসলামী ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থান নেন। তার বক্তব্যে সংখ্যালঘু অধিকার, সহাবস্থান ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক নীতিতে কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর জোর ছিল। তিনি খাল খনন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগকে উৎসাহ দেন। তার নীতির মূল লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরতা। তারেক রহমান ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো পরিকল্পনায় আধুনিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতের প্রসারের কথা বলেন। এখানে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি ও উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পিতা-পুত্রের নীতির সঘন মিল লক্ষ করা যায়। তবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের সঙ্গে সঙ্গে বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্র নাগরিককে বসে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে না। ফ্যামিলি কার্ড একটি সাময়িক সুযোগ হিসেবে দেওয়া উচিত শর্তসাপেক্ষে। তা হলো পরিবারে কর্মক্ষম মানুষ থাকলেই অথবা কেউ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেই ফ্যামিলি কার্ড বাতিল হবেÑ এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার। জিয়াউর রহমানের অসাধারণ আদর্শের সঙ্গে এখানেই কিছুটা গরমিল লক্ষ করা যায়। তবে জিয়াউর রহমানের নীতি ছিল কৃষিনির্ভর পুনর্গঠনমূলক। আর তারেক রহমানের পরিকল্পনা বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত। এটি অবশ্যই সময়ের প্রয়োজনে হয়েছে।
তারেক রহমান বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রশ্ন তুলে ধরেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠিত করা ও আন্তর্জাতিক লবিং তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তবে দুজনেরই মূল আদর্শ ‘সবার আগে দেশ’। এখানে পার্থক্য মূলত প্রেক্ষাপটগত। সময় বদলেছে, বৈশ্বিক অগ্রাধিকার বদলেছে। ফলে কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে।
জিয়াউর রহমানের ভাষা ছিল তুলনামূলক সংযত, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রনায়কোচিত। তিনি স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতেন। এই ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ভাষা অধিকতর রাজনৈতিক ও জনকল্যাণমুখী। জিয়া ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠনের নেতা। তার চ্যালেঞ্জ ছিল ভাঙা অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন। আর তারেক রহমান ডিজিটাল যুগের রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সবল ও কার্যকর করার চরম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, তরুণ প্রজন্ম ও প্রবাসী ভোটারদের সংগঠিত করা তার কৌশলের অংশ। এখানে মিল কম বরং সময়ের কারণে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বেশি স্পষ্ট।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, আদর্শিক ভিত্তিতে তারেক রহমান অনেকাংশেই জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা বহন করেন। বিশেষত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির প্রশ্নে। তবে প্রেক্ষাপট, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের কারণে প্রয়োগ ও উপস্থাপনায় পার্থক্য স্পষ্ট। একজন ছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের নির্মাতা; অন্যজন সেই পরিচয়কে নতুন যুগে পুনর্ব্যাখ্যা ও পুনর্গঠনের মহানায়ক। অতএব বলা যায়, আদর্শের মূলভিত্তিতে মিল থাকলেও কৌশল, ভাষা ও প্রয়োগে অমিল রয়েছে। সময়ই নির্ধারণ করবে এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, দুজনই আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদবিরোধী। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির ধারক। দেশের স্বার্থে আপসহীন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’Ñ এই মূলমন্ত্রের বার্তাবাহক ও দেশপ্রেমের অগ্রনায়ক।
মেশকাত সাদিক
রাজনীতি বিশ্লেষক ও কবি