× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অমর একুশে

ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে যেসব দৈনিক

জিবলু রহমান

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৫ এএম

 দৈনিক আজাদের ১৯৫২ সালের ১ মার্চের ‘আজিকার প্রশ্ন’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সমাজকে অন্ধ আবেগাপ্লুত বলে বর্ণনা করে।

দৈনিক আজাদের ১৯৫২ সালের ১ মার্চের ‘আজিকার প্রশ্ন’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সমাজকে অন্ধ আবেগাপ্লুত বলে বর্ণনা করে।

শেষ পর্ব 

১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নাগাদ দৈনিক আজাদ সুর পাল্টাতে শুরু করে। নারায়ণগঞ্জে জনৈক পুলিশ কনস্টেবল গুলিতে নিহত হলে মর্নিং নিউজ এবং দৈনিক সংবাদ এর পাশাপাশি আজাদ পত্রিকাতেও ভাষা আন্দোলনকারীদের প্রতি বিদ্রুপ মন্তব্য প্রকাশিত হয়। এমনকি আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে ভারতীয় অনুচরদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ পর্যন্ত উত্থাপন করা হয়। অথচ অনেকের মতে এই হত্যাকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত।

২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা সপ্তাহ জুড়েই নারায়ণগঞ্জে চলেছিল বিক্ষোভ। সরকারি প্ররোচনার ফলে ২৯ ফেব্রুয়ারি তা চরম রূপ নেয়। মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগমকে এদিন গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই সংক্রান্ত ১ মার্চের আজাদের প্রতিবেদন এরইরূপÑ ‘সকালবেলা স্থানীয় পুলিশ নারায়ণগঞ্জ মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মিসেস মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করে মহকুমা হাকিমের আদালতে হাজির করে। সংবাদ পেয়ে একদল ছাত্র ও নাগরিক আদালতের সামনে হাজির হয়, বিনাশর্তে তার মুক্তি দাবি করে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ইত্যাদি ধ্বনি করতে থাকে। মহকুমা হাকিম ইমতিয়াজী তখন বাইরে এসে বলেন, মমতাজ বেগমকে স্কুলের তহবিল-তছরুপের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার গ্রেপ্তারির কোনো সম্পর্ক নেই। বৈকালে পুলিশ মোটরযোগে মমতাজ বেগমকে নিয়ে ঢাকা রওনা হলে চাষাড়া স্টেশনের কাছে জনতা বাধা দেয়। তাতে পুলিশ ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠি চার্জ করে। ফলে উভয় পক্ষে প্রায় ৪৫জন আহত হয়। নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের দু’জন ডাক্তার ঘটনস্থলে গিয়ে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন এবং নয়জনের আঘাত গুরুতর বিবেচিত হওয়ায় তাদের হাসপাতালে পাঠান। পুলিশ স্থানীয় এমএলএ ওসমান আলীর গৃহতল্লাশি করে এবং তাকেসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।’

নারায়ণগঞ্জের এদিনের ঘটনা সম্পর্কে অলি আহাদ বলেছেনÑ‘মর্গান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষয়ত্রী মমতাজ বেগম ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। সরকার ও সমাজের সর্বপ্রকার রক্তচক্ষুকে অবজ্ঞার সহিত উপেক্ষা করিয়া এই অপ্রতিরোধ্য তেজস্বিনী নেত্রী যুবলীগ নেতা সামসুজ্জোহা, সফী হোসেন খান ও ডা. মুজিবুর রহমানের সহিত হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া শহিদদের রক্ত শপথে নারায়ণগঞ্জবাসীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে উজ্জীবিত করেন। অধুনা পথেঘাটে বহু অগ্নিকন্যা দাবি ভূষিত বহু নেত্রীর নাম শুনা যায়, কিন্তু তাহারা কেহ কি মিসেস মমতাজ বেগমের ন্যায় অগ্নি অতিক্রম করিয়া জনতার চেতনায় স্বীয় ত্যাগ ও কর্মোদ্যম দ্বারা এবং জানমাল ও ইজ্জতের ঝুঁকি নিয়া আন্দোলনের আগুন ছড়াইতে কখনও সক্ষম হইয়াছেন? সরকার মমতাজ বেগমের এই সাংগঠনিক শক্তি ও সাহস লক্ষ্য করিয়াছিল। পুলিশের আক্রমণে নিরস্ত্র বিদ্রোহী জনতা এক পর্যায়ে রেলওয়ে রাস্তার পাথরগুলিকে পুলিশের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ অফিসার জনাব দেলওয়ার হোসেন আহত হন। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রাজপথের উভয় পার্শ্বস্থ গ্রামগুলি হইতে হাজার হাজার জনতা আন্দোলনে শরীক হয়।’ 

১ মার্চের পরবর্তী সংখ্যাগুলো থেকে দৈনিক আজাদ ভাষা আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের নিয়েও রহস্য তৈরি করার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দৈনিক আজাদ পত্রিকার ১৯৫২ সালের ২ মার্চ তারিখের সংখ্যায় নারায়ণগঞ্জ শহরের ভাষা সৈনিক মমতাজ বেগমের জীবন পরিচয়কে রহস্যময় করে দেখাবার চেষ্টা করে এবং তাকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ বলে মন্তব্য করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। এছাড়াও দৈনিক আজাদের ১৯৫২ সালের ১ মার্চের ‘আজিকার প্রশ্ন’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সমাজকে অন্ধ আবেগাপ্লুত বলে বর্ণনা করে। পত্রিকাটিতে উল্লেখ করেÑ‘ভাষা-সংক্রান্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া সম্প্রতি যে পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে, উহাকে কিছু নয় বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া কোনমতেই যুক্তসঙ্গত নয়। ইহার মধ্যে যে সব সমস্যা দেখা দিয়াছে, তাতে সবচাইতে বেশী প্রকট হইয়াছে সাধারণ মানুষের গভীর নৈরাশ্য ও সহায়তা। 

২ মার্চের ‘আজাদে’ ‘মমতাজ বেগমের বিচিত্র জীবন’ বেগম মমতাজ মুনাফ’-এর জীবন-পরিচয়কে রহস্যময় করে দেখানোর একটা প্রয়াস হয়েছে। তবে তাতে বলা হয়েছে, তিনি পূর্বে ছিলেন হিন্দু, নাম ছিল কল্যাণী রাণী, ডাক নাম নিনু। অলি আহাদ যাদের গ্রেফতারের কথা বলেছেন তার সমর্থন ২ মার্চের আজাদে রয়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা পুলিশ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলেও দেড় ঘণ্টা ধরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়, ১০ জনকে গ্রেফতার করে।

১ মার্চ মুন্সিগঞ্জে ঢাকা জেলা শিক্ষক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির অভিভাষণের সূচনায় তিনি বলেনÑ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানভূক্ত নই। তবু ছাত্ররা যেসব ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত, আমরা সে সম্পর্কে নীরব থাকতে পারি না। ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে আমরা অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা আশা করি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দ্বারা এই ঘটনা সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা হবে। আমরা মনে করি, জনসাধারণ স্বাধীনতা প্রিয় না হলে কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।’

১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আর একটি ঘটনা ঘটে। ২ ও ৩ মার্চের আজাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত আটটায় কালীরবাজারে পাহারারত একজন পুলিশ কনস্টেবল অজ্ঞাত গুলির আঘাতে নিহত ও একজন আনসার আহত হন। পূর্ব বাংলা সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী কনস্টেবলটির সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়, আহত আনসারটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আনসারটির গলায় গুলী লাগে। ১ মার্চই আনসারটির নাম বলা হয় খলিল আহমদ। কিন্তু পরদিন নিহত কনস্টেবলের নাম জানানো হয় সৈয়দ জোবেদুল হক।

২ মার্চ ঢাকা শহরের নওয়াবগঞ্জের একটি গৃহে বোমা বিস্ফোরণ হয়, ঘরের টিনের চাল উড়ে যায়, দেয়াল ফেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ৭৬ নম্বর এনায়েতগঞ্জ লেনের এই বাড়ি থেকে বাসিন্দা বোঁচা মিঞা ও তার পুত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জন হিন্দুকে এ সম্পর্কে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের একজন ওই বাড়িটির মালিক।

পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং গণপরিষদের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সমর্থন করার জন্য গণপরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ দেন। ২ মার্চের আজাদে সংবাদটি খুবই দুর্লক্ষণীয়ভাবে মুদ্রিত হয়। আজাদ ২ মার্চ সম্পাদকীয় লেখেÑ‘নারায়ণগঞ্জের ঘটনা’, ৩ মার্চ লেখেÑ‘শোচনীয় হত্যাকাণ্ড।’ উভয় সম্পাদকীয়তেই সরকারি বক্তব্যকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা হয়।

সরকার এবং তাদের সহযোগীরা এই সময় বিপুল প্রচার অভিযানে নামেন। মজার কথা, তারা গুজবের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে বলেন কিন্তু নিজেরাই ব্যাপকভাবে গুজব-রটনার কাজে ব্যাপৃত হয়ে পড়েন। নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ আব্দুল আজিজ ও মীর সিরাজুল হক এবং ঢাকা শহর-সম্পাদক ফজলুল হক ২ মার্চ একটি বিবৃতি দিয়ে সরকারি বক্তব্যকে সমর্থন করেন। তারা বলেনÑ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই আন্দোলনের মধ্যে কমিউনিস্টদের অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য জনসাধারণ প্রয়োজনীয় সকল রকম ব্যবস্থাই অবলম্বন করবেন।’

নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এর আগে, ভাষা-আন্দোলনের জোয়ারের সময় অন্যরকম বক্তব্য পেশ করেছিলেন। তবে ৩ মার্চ নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ওয়ার্কিং কমিটি যে-সব প্রস্তাব গ্রহণ করে তার সুর একটু অন্যরকম। গণপরিষদ সদস্যদের সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, বাংলাকে যদি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা না হয় তাহলে আবার রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন হবে এবং তাতে তারা যোগদান করবেন।

৪ মার্চের আজাদের প্রথম পৃষ্ঠায় জনসাধারণে উদ্দেশ্যে সুদৃশ্যভাবে নিম্নরূপ ছয়-দফা (সরকারি) আবেদন প্রচার করা হয়Ñ ‘গুজবে বিশ্বাস করিবেন না। রাষ্ট্রের শত্রুর ফাঁদে পা দিবেন না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একতা ও সংহতি অপরিহার্য। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা শুধু দেশের অগ্রগতিকেই ব্যাহত করিবে না-আজাদীর মূলেও কুঠারাঘাত করিবে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কার্যকলাপ অব্যাহত রাখুন।’

আমরা এর পাশাপাশি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ অনুমোদিত ভাষা আন্দোলনের স্লোগানগুলিও দেখতে পারি : পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। শহিদের খুন-ভুলব না। জালিমশাহীর-পতন চাই। খুনীদের ফাঁসি চাই। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা-বাংলা চাই। বাংলা-উর্দু-বিরোধ নাই। নিরাপত্তা বন্দীদের মুক্তি চাই। লীগ সরকার জুলুম করে, আমাদের গুলী করে। মুসলিম লীগে থাকব না, গুলী খেয়ে মরব না।

অত্যন্ত সুকৌশলে তরুণদের অবাধ্য বলার প্রয়াসও পায় দৈনিক আজাদ পত্রিকাটিতে। দৈনিক আজাদের স্ববিরোধী ভূমিকা যেমন ইতিহাসে স্থান পেয়েছে, তেমনি প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তার ইতিবাচক ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ।


জিবলু রহমান

কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা