তেলেগু সম্প্রদায়
যোশেফ-ইউকে নন্দম জয়
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯ এএম
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০২ এএম
তেলেগুরা গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়। ফলে কোটা সুবিধা বা বিশেষ শিক্ষাসহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত।
বাংলাদেশ বহু ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্যের দেশ। এই বহুত্ব আমাদের শক্তিÑ আমাদের ইতিহাসের গভীরতা। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের ভেতরেই কিছু সম্প্রদায় আছে, যাদের অস্তিত্ব দৃশ্যমান হলেও স্বীকৃতি অদৃশ্য। তেলেগু জনগোষ্ঠী তেমনই এক সম্প্রদায়। তারা এই ভূখণ্ডে দুইশ বছর ধরে বসবাস করছে, শ্রম দিচ্ছে, প্রজন্ম গড়ছে; তবুও রাষ্ট্রীয় আলোচনায় তাদের নাম উচ্চারিত হয় খুব কম। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তেলেগুদের সংগঠিত আগমন ব্রিটিশ আমলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে চা-বাগান, রেলওয়ে ও পৌর পরিষেবায় শ্রমিক সংকট দেখা দিলে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী দক্ষিণ ভারত থেকে তেলেগুভাষী মানুষদের নিয়ে আসে। দক্ষিণ ভারতে সে সময় দুর্ভিক্ষ, ঋণজালে জর্জরিত কৃষিজীবন ও সামাজিক অস্থিরতা মানুষকে অভিবাসনে বাধ্য করেছিল। দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা, স্থায়ী কাজ ও কিছু আর্থিক নিরাপত্তার আশায় বহু পরিবার অচেনা ভূখণ্ডে পাড়ি জমায়। তারা ভেবেছিল জীবন বদলাবে। বাস্তবে বদলেছে ঠিকইÑ কিন্তু সেই বদল এসেছে শ্রমের ভারে, মর্যাদার নয়।
ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতার ইতিহাসে তেলেগুদের নাম অবিচ্ছেদ্য। ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তখনকার পৌর ব্যবস্থায় নর্দমা পরিষ্কার, বর্জ্য অপসারণ, রাস্তা ঝাড়ু দেওয়াÑ এসব কাজের বড় অংশ তাদের কাঁধে পড়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই পেশাই যেন তাদের উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও ঢাকার ধলপুরের ১৪ নম্বর আউটফল, টিকাটুলী, গোপীবাগ, শেরে বাংলা নগর, কল্যাণপুর, গাবতলী, সাভারে তেলেগু পরিবারগুলোর বসতি। সিলেটের চা-বাগান, পাবনার ঈশ্বরদী রেলওয়ে কলোনিতেও তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট। শহর পরিষ্কার রাখা, রেল সচল রাখা, চা উৎপাদনÑ দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের শ্রম অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু যে সমাজ তাদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজ কি তাদের মর্যাদা দিয়েছে? পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজকে আমরা প্রয়োজনীয় বলি, কিন্তু কর্মীকে সম্মান করি কতটা? তেলেগুদের পেশাগত পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক স্তরবিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পেশা বদলানো বা নতুন ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। একধরনের পেশাগত বৃত্ত যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। এটি কেবল অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়; এটি সামাজিক কাঠামোর ফল।
ভাষা ও শিক্ষা এই প্রান্তিকতার কেন্দ্রে। তেলেগুরা ঘরে তেলেগু ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বিদ্যালয়ে বাংলা বাধ্যতামূলক। ফলে শিশুরা প্রথম দিন থেকেই দ্বৈত ভাষাগত চাপে পড়ে। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কথা জাতীয় নীতিতে থাকলেও তেলেগুদের জন্য বাস্তব কোনো ব্যবস্থা নেই। ভাষা শেখা শুধু পাঠ্যবই বোঝার বিষয় নয়; এটি আত্মবিশ্বাসের বিষয়। শিশু যদি নিজের ভাষায় চিন্তা করতে না পারে, নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে না পারে, তবে তার শিক্ষাজীবন শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয়। ঝরে পড়ার হার তাই বেশি। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ সীমিত।
অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা নিম্নপদস্থ শ্রমিক পরিবারের আয় সীমিত। পরিবারের বড় সন্তান দ্রুত কাজের বাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। মেয়েদের শিক্ষাজীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শিক্ষাগত ঘাটতি আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত করেÑ একটি চক্র তৈরি হয়, যা ভাঙা কঠিন।
সরকারি স্বীকৃতির অভাব এই সমস্যাকে কাঠামোগত রূপ দিয়েছে। তেলেগুরা গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়। ফলে কোটা সুবিধা বা বিশেষ শিক্ষাসহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো আলাদা নীতিগত সহায়তা নেই। অথচ রাষ্ট্র স্বীকার করুক বা না করুক, তারা এই ভূখণ্ডেরই মানুষÑ জন্মসূত্রে নাগরিক, শ্রমসূত্রে অবদানকারী। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী বিষয় নয়; এটি সুযোগের দরজা খুলে দেয়। তবে প্রান্তিকতা মানেই সংস্কৃতির বিলুপ্তি নয়। তেলেগু ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দ্রাবিড় ভাষা; প্রায় ৯০ মিলিয়ন মানুষ এতে কথা বলে। ভাষাটির নিজস্ব লিপি, সাহিত্য ও ইতিহাস আছে। প্রতি বছর ২৯ আগস্ট পালিত হয় তেলেগু ভাষা দিবস। বাংলাদেশে বসবাসকারী তেলেগুরা হয়তো শুদ্ধ ভাষাচর্চার সুযোগ কম পায়, তবুও পারিবারিক পরিসরে ভাষা টিকে আছে। ঘরের ভেতর গল্প, গান, প্রবাদÑ সবই ভাষাকে জীবিত রাখে।
সংস্কৃতিতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। তেলেগু বিবাহরীতি সপ্তাহব্যাপী, আচারসমৃদ্ধ। নারীদের শাড়ি পরার ভঙ্গি, অলংকারের ব্যবহার, মুগ্গু আঁকার ঐতিহ্যÑ সবই তাদের আলাদা পরিচয় দেয়। লাঠিনাচ দলবদ্ধ পরিবেশনায় শক্তি ও ঐক্যের প্রকাশ। তেলেগু নববর্ষ ‘উগাদি’ উদযাপিত হয় বিশেষ খাবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে। উট্টুচারু, পংগাডালু, চিন্নুন্ডালÑ এসব খাবার শুধু স্বাদের নয়, স্মৃতিরও অংশ। ধর্মীয় বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়Ñ হিন্দু, খ্রিস্টান ও মুসলমান তেলেগুরা নিজ নিজ রীতি পালন করে। অর্থাৎ এই সম্প্রদায় একমাত্রিক নয়; বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক সত্তা বহন করে।
সমাজ কাঠামোয় এখনও বর্ণভিত্তিক বিভাজনের প্রভাব রয়েছে। কাপুলু, রেড্ডি, গল্লালু, চাকালী, মালা, মাদিগা, রেল্লীÑ গোত্রপরিচয় সামাজিক পরিচয়ের অংশ। পঞ্চায়েত প্রথাও বিদ্যমান। আনুমানিক আড়াই লাখের বেশি তেলেগু বাংলাদেশে বসবাস করেÑ যদিও নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। পরিসংখ্যানের অনুপস্থিতিও একধরনের অদৃশ্যতা তৈরি করে। যে সম্প্রদায়ের সংখ্যা জানা নেই, তার জন্য নীতি নির্ধারণও কঠিন। এখানে একটি নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে। যে জনগোষ্ঠী শতবর্ষ ধরে শহরকে পরিচ্ছন্ন রেখেছে, নর্দমা পরিষ্কার করেছে, চা বাগানে কাজ করেছে, রেলপথ সচল রেখেছেÑ রাষ্ট্র কি তাদের প্রতি যথেষ্ট দায়বদ্ধ? মৌলিক অধিকার, শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদাÑ এসব কি তাদের প্রাপ্য নয়? আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, জিডিপি বৃদ্ধির কথা বলি, অবকাঠামোর সাফল্য তুলে ধরি; কিন্তু উন্নয়ন যদি সমাজের প্রান্তিক অংশে না পৌঁছায়, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।
তেলেগু সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজন নীতিনির্ভর উদ্যোগ। প্রথমত, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা ও ভাষান্তর সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও বিকল্প পেশায় প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। চতুর্থত, নির্ভরযোগ্য জনগণনা ও গবেষণা জরুরিÑ যাতে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থা জানা যায়। নীতি প্রণয়নের ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্য।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শ্রমকে সম্মান করা মানে শুধু পরিচ্ছন্ন শহর উপভোগ করা নয়; শ্রমিকের মর্যাদাও স্বীকার করা। তেলেগুরা সহানুভূতির বিষয় নয়; তারা অধিকারের দাবিদার নাগরিক। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার অগ্রগতির আলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনেও পৌঁছাবে। তেলেগুরা এই দেশের ইতিহাসের অংশ, শ্রমের অংশ, সংস্কৃতির অংশ। এখন প্রয়োজন তাদের নাগরিক মর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতি। রাষ্ট্র যদি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিশ্বাস করে, তবে তেলেগু সম্প্রদায়কে নীতির প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের আলোচনায় আনতে হবে। মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য করুণা নয়, সুযোগ দিতে হবে। দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে দেশের তেলেগু সমাজ।
যোশেফ-ইউকে নন্দম জয়
সাধারণ সম্পাদক
তেলেগু কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি