অমর একুশে
জিবলু রহমান
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৯ এএম
ভারতের সর্বত্রই অনেকে মোটামুটিভাবে উর্দুভাষা বুঝিতে পারে। এমনকি আরব, ইরান ও আফগানিস্তানেও উর্দুর খানিকটা প্রচলন আছে। এই ভাষা আরবি অক্ষরে লিখিত হয় বলিয়া আরব, ইরান, আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসীগণও সহজে অনুকরণ করিতে পারিবেন। এই দিক দিয়া উর্দুর হিন্দি অপেক্ষা ইংরেজির দাবি অগ্রগণ্য।
ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে যে সুবিধা পাওয়া হইবে উর্দু ভাষা যেসব তুলনায় নগণ্য। আরবি ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে। কারণ ইহা কোরআন, হাদিসের ভাষা এবং ইহা আটলান্টিক উপকূল হইতে প্রশান্ত মহাসাগর উপকূল পর্যন্ত সকল মুছলমানের নিকট পরিচিত। পাকিস্তান ডোমিনিয়ন বা অন্য যেকোনো ডোমিনিয়নের প্রদেশসমূহের বিচারালয়, আইন পরিষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভাষা ব্যবহৃত হইবে তাহার সহিত রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে একত্রে জড়িত করিয়া দেখা উচিত... বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয় শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক নীতিবিরোধী নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিগর্হিতও বটে।’
রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলা ভাষার বিরোধী বক্তব্যও আজাদে নিয়মিত উপস্থিত
হতে দেখা যায়, যা ওই সময়ে সরকারি হাতকে শক্তিশালী করে। ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর আজাদ
পত্রিকার ‘অহেতুক উত্তেজনা’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলা হয়Ñ‘... পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়
ভাষা উপলক্ষে দেশে অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এই উত্তেজনার কোনো সংগত কারণ
নেই।’
অহেতুক উত্তেজনার কথা বলে দৈনিক আজাদ এই সম্পাদকীয়টিতে পাকিস্তানের
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি এড়িয়ে গেছে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ
দত্তের প্রস্তাবের পর প্রস্তাবটি ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতাদের বিরোধিতার ফলে অগ্রাহ্য
হয়। গণপরিষদে ‘বাংলা’ ভাষাকে কটাক্ষ করে ওইসব নেতৃবৃন্দ যে বক্তব্য প্রদান করেন তার
বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে অনেক বিবৃতি ও সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।
গণপরিষদে মুসলিম লীগের ভূমিকার বিরুদ্ধে ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘বাংলা
ভাষা ও পাকিস্তান’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে দৈনিক আজাদ উল্লেখ করেছিলÑ‘পাক-গণপরিষদের সদস্যগণের
সংখ্যাগুরু অংশ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬১ ভাগেরও অধিক পূর্ব-পাকিস্তানের
ও তাহাদের শতকরা ৯৯ জনেরও অধিক বাংলা ভাষী। এমতাবস্থায় বাংলা ভাষাতো উপেক্ষিত হইতেই
পারে না, অধিকস্ত ইহা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ইবার যোগ্যতা রাখে...উর্দু মুসলমানদের
জাতীয় ভাষা হওয়ার অধিকার কবে এবং কোথায় অর্জন করিল? এই অবস্থায় গণপরিষদের পূর্ব পাকিস্তানের
প্রতিনিধিগণের এখন হইতে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাহাতে বাংলা ভাষার অধিকতর অসম্মান
তাহাদের নিষ্ক্রিয়তায় না ঘটে।’
আজাদ ২৯ ফেব্রুয়ারি (১৬ ফালগুন, ১৩৫৪ বঙ্গাব্ধ) তারিখে ‘বাংলা ভাষার
অপমান’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছিলÑ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পূর্ব্ব
হইতেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে, তাহা লইয়া অনেক বাদানুবাদ শুরু হয়। পাকিস্তান
প্রতিষ্ঠার পর এই বাদানুবাদের তীব্রতা বৃদ্ধি হয় এবং পূর্ব্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত মহলে-বিশেষ
করিয়া ছাত্র ও যুবক মহলে এই আশংকা জাগে যে, পাকিস্তানে বাংলা ভাষা উপেক্ষিত হইবে। কিন্তু
গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বুদ্ধিমান মানুষ এই আশঙ্কাকে অমূলক মনে করিয়াছিলেন, কারণ পাক-গণপরিষদের
সদস্যগণের সংখ্যাগুরু অংশ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬১ ভাগেরও অধিক
পূর্ব্ব-পাকিস্তানের ও তাহাদের শতকরা ৯৯ জনেরও অধিক বাংলাভাষী। এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা
তো উপেক্ষিত হইতেই পারে না, অধিকন্ত ইহা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবার যোগ্যতা
রাখে।
কিন্তু পাক-গণপরিষদের সিদ্ধান্তে পূর্ব্ব পাকিস্তানের আশাবাদী বিদগ্ধ
সমাজের সকল স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হইতে চলিয়াছে। পাক-গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা
ভাষাকে গ্রহণ করার দাবী উপেক্ষিত হওয়ায় এই আশঙ্কাই বদ্ধমূল হইতেছে যে, পূর্ব্ব পাকিস্তানের
জনগণের ভাষা আজাদ পাকিস্তানে কোন স্থান পাইবে না এবং উহার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পূর্ব্ব-পাকিস্তানের
সর্বাঙ্গীণ অগ্রগতি আশংকাজনকভাবে ব্যাহত হইবে। শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাক-গণপরিষদে
বাংলাভাষাকে পরিষদের অন্যান্য ভাষার সহিত সমানাধিকার দানের প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াছিলেন।
পাক-ডোমিনিয়নের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ নাগরিকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ যে ভাষায় কথা বলে,
সেই ভাষাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা বলিয়া দাবি করার মধ্যে অযৌক্তিকতা কোথায়, তাহা আমাদের
বোধগম্য হইতেছে না। পাক-ডোমিনিয়নের প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খাঁ শ্রীযুক্ত দত্তের
প্রস্তাবের বিরোধীতা করিতে যাইয়া যে উক্তি করিয়াছেন, তাহাও আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক
করিয়াছে।এইসব অযৌক্তিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলা ভাষার দাবিকে অগ্রাহ্য করিয়া পূর্ব পাকিস্তানের
জনগণের মনোভাবের উপরে নিষ্ঠুর আঘাত হানা হইয়াছে।
এই অবস্থায় গণ-পরিষদের পূর্ব্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিগণের এখন হইতে
সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাহাতে বাংলা ভাষার অধিকতর অসম্মান তাঁহাদের নিষ্ক্রিয়তায়
না ঘটে। বাংলা ভাষার মাধ্যমে পূর্ব্ব-পাকিস্তান তহজিব তমদ্দুনে যে কামিয়াবী হাসেল করিয়াছে,
তাহা সে হারাইতে চায় না; নূতন ভাষায় জগদ্দল পাথর কাঁধে চাপাইয়া তাহার গতি ব্যাহত করার
ক্ষীণতম প্রচেষ্টা ও সে ভবিষ্যতে বরদাশত করিবে না। আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা কি হইবে, তাহার
আলোচনা এখানে না করিয়া আমরা বলিব, প্রাদেশিক শিক্ষার মাধ্যম ও প্রাদেশিক দফতরের ভাষা
বাংলা হইবে এবং পূর্ব্ব পাকিস্তানের এই সর্ব্বসম্মত দাবী পূরণ করার গুরুতর কর্তব্য
গণপরিষদের তাহাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের পালন করিতে হইবে। এই দাবীর বিরুদ্ধতা যাঁহারা
করিবেন, তাঁহাদের পদত্যাগ করিয়া পুননির্বাচনের জন্য প্রার্থী হওয়াই গণতন্ত্র সম্মত
একমাত্র কর্তব্য।
১৯৪৮ সালের মতো দৈনিক আজাদ পত্রিকাকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায়
সাহসিকতার ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। দৈনিক আজাদ পত্রিকা ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি
সংখ্যায় তার গুরুত্বের প্রমাণ মেলে। এই সংখ্যায় দৈনিক আজাদের প্রথম পৃষ্ঠায় বড়ো বড়ো
টাইপে ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে ছাত্র সমাবেশের ওপর গুলিবর্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের
তিন ছাত্রসহ চার ব্যক্তি নিহত ও সতেরো ব্যক্তি আহত, স্কুল ছাত্রসহ ৬২ জন গ্রেফতার,
গুলিবর্ষণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তদন্তের আশ্বাস দান’ ইত্যাদি শিরোনামে প্রতিবেদনগুলো
ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ হলে সন্ধ্যায় আজাদ পত্রিকার
দু’পাতার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সাত কলামব্যাপী ব্যানার হেডিং ছিলÑ‘ছাত্রদের তাজা
খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত।’
কিন্তু ভুলবশত সশস্ত্র পুলিশের গুলিবর্ষণের জায়গায় ছাপা হয়েছিল ‘সৈন্যবাহিনীর
গুলিবর্ষণ।’ এই উছিলায় নূরুল আমীন সরকার ত্বরিত সিদ্ধান্তে দৈনিক আজাদের আলোচ্য বিশেষ
সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে। অবশ্য ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদের পাতঃকালীন সংখ্যায় এই ভ্রম
সংশোধন করা হয়।এছাড়াও মন্ত্রিসভায় পদত্যাগরে দাবি করে ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির সংখ্যায়
‘পদত্যাগ করুন’ শীর্ষক শিরোনামে প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক বিশেষ সম্পাদকীয়তে মন্তব্য
করেছিলÑ‘...ঢাকা শহরের বুকে যেসব কান্ড ঘটিতেছে, সে সমস্ত শোকাবহ নয়, বর্বরোচিতও বলা
চলে।
২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনামগুলো বিশেষভাবে
লক্ষনীয়। এগুলো হচ্ছে
১. পুলিশ ও সৈন্যদের গুলিতে ৪ জন নিহত ॥ ৭ ঘন্টার জন্য কারফিউ।
২. শুক্রবার শহরের অবস্থার আরও অবনতি ঃ সরকার কর্তৃক সামরিক বাহিনী
তলব।
৩. শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে শহরে স্বতঃস্ফুর্ত
হরতাল পালন।
৪. পুলিশের জুলুমের প্রতিবাদে আজাদ সম্পাদক আবুল কালম শামসুদ্দীনের
সদস্য পদ ইস্তফা।
এসময় মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দলের জের হিসেবে মাওলানা
আকরাম খাঁর নির্দেশেই আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদের
সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। প্রকাশ, সম্পাদক হিসেবে তার বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
তবে একথা ঠিক যে, সেদিন আলোচ্য পদত্যাগের ফলে ছাত্রদের মধ্যে দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি
হয়েছিল। এরই ফলে শামসুদ্দীনকে দিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় শহিদ মিনারের উদ্বোধন
করা হয়। এদিন সন্ধ্যায় সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় একদল সশস্ত্র পুলিশ প্রথম শহিদ ধুলিস্যাৎ করে দেয়।
১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নাগাদ দৈনিক আজাদ সুর পাল্টাতে শুরু করে।
নারায়ণগঞ্জে জনৈক পুলিশ কনস্টেবল গুলিতে নিহত হলে মর্নিং নিউজ এবং দৈনিক সংবাদ এর পাশাপাশি
আজাদ পত্রিকাতেও ভাষা আন্দোলনকারীদের প্রতি বিদ্রুপ মন্তব্য প্রকাশিত হয়। এমনকি আন্দোলনকারী
ছাত্রদের মধ্যে ভারতীয় অনুচরদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ পর্যন্ত উত্থাপন করা হয়। অথচ অনেকের
মতে এই হত্যাকা- ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত।
২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা সাপ্তাহ জুড়েই নারায়ণগঞ্জে চলেছিল বিক্ষোভ।
সরকারি প্ররোচনার ফলে ২৯ ফেব্রুয়ারি তা চরম রূপ নেয়। মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান
শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগমকে এদিন গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ
বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই সংক্রান্ত ১ মার্চের আজাদের প্রতিবেদন এরইরূপÑ‘সকালবেলা স্থানীয়
পুলিশ নারায়ণগঞ্জ মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মিসেস মমতাজ বেগমকে
গ্রেপ্তার করে মহকুমা হাকিমের আদালতে হাজির করে। সংবাদ পেয়ে একদল ছাত্র ও নাগরিক আদালতের
সামনে হাজির হয়, বিনাশর্তে তাঁর মুক্তি দাবি করে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ইত্যাদি ধ্বনি
করতে থাকে। মহকুমা হাকিম ইমতিয়াজী তখন বাইরে এসে বলেন, মমতাজ বেগমকে স্কুলের তহবিল-তছরুপের
দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গ্রেপ্তারির কোনো সম্পর্ক
নেই। বৈকালে পুলিশ মোটরযোগে মমতাজ বেগমকে নিয়ে ঢাকা রওনা হলে চাষাড়া স্টেশনের কাছে
জনতা বাধা দেয়। তাতে পুলিশ ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠি চার্জ করে। ফলে উভয়
পক্ষে প্রায় ৪৫ জন আহত হয়। নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের দু’জন ডাক্তার ঘটনস্থলে গিয়ে আহতদের
প্রাথমিক চিকিৎসা করেন এবং নয়জনের আঘাত গুরুতর বিবেচিত হওয়ায় তাঁদের হাসপাতালে পাঠান।
পুলিশ স্থানীয় এম.এল.এ. ওসমান আলীর গৃহতল্লাশি করে এবং তাকেসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার
করে।’
নারায়ণগঞ্জের এদিনের ঘটনা সম্পর্কে অলি আহাদ বলেছেনÑ‘মর্গান হাই স্কুলের
প্রধান শিক্ষয়ত্রী মমতাজ বেগম ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। সরকার
ও সমাজের সর্বপ্রকার রক্তচক্ষুকে অবজ্ঞার সহিত উপেক্ষা করিয়া এই অপ্রতিরোধ্য তেজস্বিনী
নেত্রী যুবলীগ নেতা সামসুজ্জোহা, সফী হোসেন খান ও ডাঃ মুজিবুর রহমানের সহিত হাতে হাত
ও কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া শহীদদের রক্ত শপথে নারায়ণগঞ্জবাসীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে উজ্জীবিত
করেন। অধুনা পথেঘাটে বহু অগ্নিকন্যা দাবি ভূষিত বহু নেত্রীর নাম শুনা যায়, কিন্তু তাঁহারা
কেহ কি মিসেস মমতাজ বেগমের ন্যায় অগ্নি অতিক্রম করিয়া জনতার চেতনায় স্বীয় ত্যাগ ও কর্মোদ্যম
দ্বারা এবং জানমাল ও ইজ্জতের ঝুঁকি নিয়া আন্দোলনের আগুন ছড়াইতে কখনও সক্ষম হইয়াছেন?
সরকার মমতাজ বেগমের এই সাংগঠনিক শক্তি ও সাহস লক্ষ্য করিয়াছিল। পুলিশের আক্রমণে নিরস্ত্র
বিদ্রোহী জনতা এক পর্যায়ে রেলওয়ে রাস্তার পাথরগুলিকে পুলিশের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক
অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ অফিসার জনাব
দেলওয়ার হোসেন আহত হন। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রাজপথের উভয় পার্শ্বস্থ গ্রামগুলি
হইতে হাজার হাজার জনতা আন্দোলনে শরীক হয়।
১ মার্চের পরবর্তী সংখ্যাগুলো থেকে দৈনিক আজাদ ভাষা আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের
নিয়েও রহস্য তৈরি করার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দৈনিক আজাদ পত্রিকার ১৯৫২
সালের ২ মার্চ তারিখের সংখ্যায় নারায়ণগঞ্জ শহরের ভাষা সৈনিক মমতাজ বেগমের জীবন পরিচয়কে
রহস্যময় করে দেখাবার চেষ্টা করে এবং তাকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ বলে মন্তব্য করতেও দ্বিধাবোধ
করেনি। এছাড়াও দৈনিক আজাদের ১৯৫২ সালের ১ মার্চের ‘আজিকার প্রশ্ন’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে
ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সমাজকে অন্ধ আবেগাপ্লুত বলে বর্ণনা করে। পত্রিকাটিতে
উল্লেখ করেÑ‘ভাষা-সংক্রান্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া সম্প্রতি যে পরিস্থিতির উদ্ভব
হইয়াছে, উহাকে কিছু নয় বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া কোনমতেই যুক্তসঙ্গত নয়। ইহার মধ্যে যে সব
সমস্যা দেখা দিয়াছে, তাতে সবচাইতে বেশী প্রকট হইয়াছে সাধারণ মানুষের গভীর নৈরাশ্য ও
সহায়তা।
২ মার্চের ‘আজাদে’ ‘মমতাজ বেগমের বিচিত্র জীবন’ বেগম মমতাজ মুনাফ’-এর
জীবন-পরিচয়কে রহস্যময় করে দেখানোর একটা প্রয়াস হয়েছে। তবে তাতে বলা হয়েছে, তিনি পূর্বে
ছিলেন হিন্দু, নাম ছিল কল্যাণী রাণী, ডাক নাম নিনু। অলি আহাদ যাদের গ্রেফতারের কথা
বলেছেন তার সমর্থন ২ মার্চের আজাদে রয়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা পুলিশ মেডিক্যাল
কলেজ হোস্টেলেও দেড় ঘণ্টা ধরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়, ১০ জনকে গ্রেফতার করে।
১ মার্চ মুন্সিগঞ্জে ঢাকা জেলা শিক্ষক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ডঃ
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির অভিভাষণের সূচনায় তিনি বলেনÑ‘আমরা কোনো
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানভূক্ত নই। তবু ছাত্ররা যেসব ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত, আমরা সে সম্পর্কে
নীরব থাকতে পারি না। ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে আমরা অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করছি।
আমরা আশা করি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দ্বারা এই ঘটনা সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা
হবে। আমরা মনে করি, জনসাধারণ স্বাধীনতা প্রিয় না হলে কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে
না।’
১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আর একটি ঘটনা ঘটে। ২ ও ৩ মার্চের আজাদের প্রতিবেদন
অনুযায়ী, রাত আটটায় কালীরবাজারে পাহারারত একজন পুলিশ কনস্টেবল অজ্ঞাত গুলির আঘাতে নিহত
ও একজন আনসার আহত হন। পূর্ব বাংলা সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী, কনস্টেবলটির সঙ্গে সঙ্গে
মৃত্যু হয়, আহত আনসারটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আনসারটির গলায় গুলী লাগে। ১ মার্চই
আনসারটির নাম বলা হয় খলিল আহমদ। কিন্তু পরদিন নিহত কনস্টেবলের নাম জানানো হয় সৈয়দ জোবেদুল
হক।
২ মার্চ ঢাকা শহরের নওয়াবগঞ্জের একটি গৃহে বোমা বিস্ফোরণ হয়, ঘরের
টিনের চাল উড়ে যায়, দেয়াল ফেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ৭৬ নম্বর এনায়েতগঞ্জ লেনের এই বাড়ি
থেকে বাসিন্দা বোঁচা মিঞা ও তাঁর পুত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জন হিন্দুকে এ সম্পর্কে
গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের একজন ওই বাড়িটির মালিক।
পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং গণপরিষদের সদস্য আব্দুল্লাহ আল
মাহমুদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সমর্থন করার জন্য গণপরিষদে একটি প্রস্তাব
উত্থাপনের নোটিশ দেন। ২ মার্চের আজাদে সংবাদটি খুবই দুর্লক্ষণীয়ভাবে মুদ্রিত হয়। আজাদ
২ মার্চ সম্পাদকীয় লেখেÑ‘নারায়ণগঞ্জের ঘটনা’, ৩ মার্চ লেখেÑ‘শোচনীয় হত্যাকা-।’ উভয়
সম্পাদকীয়তেই সরকারি বক্তব্যকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা হয়।
সরকার এবং তাদের সহযোগীরা এই সময় বিপুল প্রচার অভিযানে নামেন। মজার
কথা, তারা গুজবের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে বলেন কিন্তু নিজেরাই ব্যাপকভাবে
গুজব-রটনার কাজে ব্যাপৃত হয়ে পড়েন। নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি
সৈয়দ আব্দুল আজিজ ও মীর সিরাজুল হক এবং ঢাকা শহর-সম্পাদক ফজলুল হক ২ মার্চ একটি বিবৃতি
দিয়ে সরকারি বক্তব্যকে সমর্থন করেন। তারা বলেনÑ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই আন্দোলনের
মধ্যে কমিউনিস্টদের অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য জনসাধারণ প্রয়োজনীয় সকল রকম ব্যবস্থাই
অবলম্বন করবেন।’
নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এর আগে, ভাষা-আন্দোলনের জোয়ারের
সময় অন্যরকম বক্তব্য পেশ করেছিলেন। তবে ৩ মার্চ নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের
ওয়ার্কিং কমিটি যে-সব প্রস্তাব গ্রহণ করে তার সুর একটু অন্যরকম। গণপরিষদ সদস্যদের সতর্ক
করে দেওয়া হয় যে, বাংলাকে যদি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা না হয় তাহলে আবার রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন
হবে এবং তাতে তারা যোগদান করবেন।
৪ মার্চের আজাদের প্রথম পৃষ্টায় জনসাধারণে উদ্দেশ্যে সুদৃশ্যভাবে
নিুরূপ ছয়-দফা (সরকারি) আবেদন প্রচার করা হয়Ñ ‘গুজবে বিশ্বাস করিবেন না। রাষ্ট্রের
শত্রুর ফাঁদে পা দিবেন না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। দেশের
শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একতা ও সংহতি অপরিহার্য। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা শুধু দেশের
অগ্রগতিকেই ব্যাহত করিবে না-আজাদীর মূলেও কুঠারাঘাত করিবে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও
দৈনন্দিন কার্যকলাপ অব্যাহত রাখুন।’
আমরা এর পাশাপাশি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ অনুমোদিত ভাষা
আন্দোলনের স্লোগানগুলিও দেখতে পারি: পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। শহীদের খুন-ভুলব না। জালিমশাহীর-পতন
চাই। খুনীদের ফাঁসি চাই। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা-বাংলা চাই। বাংলা-উর্দু-বিরোধ নাই। নিরাপত্তা
বন্দীদের মুক্তি চাই। লীগ সরকার-জুলুম করে। আমাদের-গুলী করে। মুসলিম লীগে-থাকব না।
গুলী- খেয়ে মরব না।
অত্যন্ত সুকৌশলে তরুণদের অবাধ্য বলার প্রয়াসও পায় দৈনিক আজাদ পত্রিকাটিতে। দৈনিক আজাদের স্ববিরোধী ভূমিকা যেমন ইতিহাসে স্থান পেয়েছে, তেমনি প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তার ইতিবাচক ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ।