× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অমর একুশে

আত্মত্যাগের মহিমা ও আমাদের দায়

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০২ এএম

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪ এএম

আত্মত্যাগের মহিমা ও আমাদের দায়

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের এক অনন্য দিন। ভাষার অধিকার রক্ষায় জীবন বিসর্জনের ঐতিহাসিক দিন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যে রক্ত ঝরেছিল, তা কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতির জন্য ছিল না, তা ছিল জাতিসত্তা, আত্মপরিচয় ও মর্যাদার সংগ্রাম। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন মুহূর্তেই গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। এভাবে ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গের নজির বিশ্ব বহুজাতিক ভাষাভাষীর ইতিহাসে বিরল।

আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। এখন প্রতি বছর বিশ্বের সব দেশে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। এসব অবশ্যই আনন্দের কথা, যা আজ বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষিকতার প্রতীক। শহীদদের রক্তে রাঙা সেই পথ আজও আমাদের প্রেরণার উৎস।

ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল একটি জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই আন্দোলনের পথ ধরেই একাত্তরে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এর মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি প্রথম সংগঠিতভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে। পাকিস্তানি শাসকদের উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে, তা পরবর্তীতে স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে। একুশ তাই কেবল ভাষার দাবি নয়, এটি মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সূচনা। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়Ñ এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও চিন্তার আধার। মাতৃভাষা মানুষের আবেগ, স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার মূলভিত্তি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছেÑ নিজস্ব ভাষার অধিকার অস্বীকার করা মানে একটি জাতির আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা। সে সময়ের তরুণ ছাত্রসমাজ বুকের রক্ত দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা এনে দেয়। তাদের আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করে। ভাষা আন্দোলনের সেই স্পৃহা আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেও শক্তিশালী করেছে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক একরূপতার চাপ বাড়ছে, তখন একুশ আমাদের শেখায়Ñ নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বনাগরিক হওয়াই সত্যিকার অগ্রগতি।

প্রশ্ন উঠছে, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণের পাশাপাশি মাতৃভাষার উন্নয়নে কী করেছি, কী করতে পারিনি, সেসবও গভীরভাবে ভাবতে হবে। ভাষার অগ্রগতি হয় শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও জনসংখ্যার বিরাট অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ বরেণ্য মনীষীরা মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন।’ অথচ মাতৃভাষাকে এখনও আমরা সর্বস্তরে শিক্ষার বাহন করতে পারিনি। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিদ্যাসহ উচ্চশিক্ষার অনেক বিষয়ে বাংলায় বই নেই। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য. ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রাথমিক স্তরে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার যে সুপারিশ করেছিল, অদ্যাবধি তা বাস্তবায়িত হয়নি।

তাই একুশের চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা করা মানবসভ্যতার টিকে থাকার শর্ত। পৃথিবীর বহু ভাষা বিলুপ্তির পথে। মাতৃভাষার চর্চা ও সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যক্তিগত সচেতনতাও অপরিহার্য। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত শুদ্ধ ও সৃজনশীল ভাষা চর্চার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিতে বাংলা কনটেন্ট সমৃদ্ধ করা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় বাংলার ব্যবহার বাড়ানোÑ এসব এখন সময়ের দাবি।

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে কেবল শোকের দিন নয়; এটি আত্মমর্যাদা, চেতনা ও দায়িত্বের দিন। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সেই চেতনা যথাযথভাবে ধারণ করতে পেরেছি? ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা আন্তরিক? প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার এখনও নিশ্চিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি-নির্ভরতা যেন এক ধরনের মানসিক ঔপনিবেশিকতার প্রতিফলন। বিশ্বায়নের যুগে বহুভাষা শেখা অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু নিজের ভাষাকে অবহেলা করে নয়।

একুশ আমাদের আত্মসমালোচনার দিন। ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবেÑ বাংলা ভাষাকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ ও কার্যকর করে তুলব। তবেই একুশের আত্মত্যাগ সার্থক হবে, তবেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বৈশ্বিক তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে। আমরা বলতে চাই, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যেই একুশের দায়িত্ব শেষ নয়; বরং ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় প্রতিদিনের অঙ্গীকারই হোক প্রকৃত শ্রদ্ধা। কারণ, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ ও তার মহিমা আমাদের দায়। যে কারণে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার মধ্যেই একুশের পালন সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আমাদের আচরণ, চিন্তা ও কর্মে ভাষার প্রতি সম্মান প্রতিফলিত হতে হবে। নতুন প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানাতে হবে গভীরভাবে, যাতে তারা বুঝতে পারে স্বাধীনতা ও মর্যাদার পথ কত ত্যাগে নির্মিত।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা