× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অমর একুশে

যে চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশ

ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৬ এএম

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪ এএম

যে চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশ

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যায় ভাষানীতির বিরুদ্ধে বাঙালি শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই ছিল না এটি ছিল আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের জন্য এক ঐতিহাসিক জাগরণ। ঢাকার রাজপথে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের রক্তে রঞ্জিত সেই দিন বাঙালি জাতিকে শিখিয়েছিল অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয়, মাথা নত করে নয়, মাথা উঁচু করে। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরÑ এই নামগুলো কেবল ইতিহাসের পাতা নয়, বাঙালির চেতনার মর্মমূলে গাঁথা আছে। একুশে ফেব্রুয়ারি, শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যা পরবর্তীতে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশের জাতিসত্তা, রাষ্ট্রচিন্তা ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার কেন্দ্রে যে শক্তিশালী প্রেরণা অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালির ওপর চেপে বসেছিল উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিষবাষ্প। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল বাংলাভাষী, তথাপি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের মুখের ভাষা। তবে কার্যত ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ১৯৪৮ সালে যখন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত ছিল সাংস্কৃতিক দমননীতির প্রকাশ। প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। সেই রক্তস্নাত ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি কখনও মাথা নত করেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে, ভাষার মর্যাদা রক্ষায় পথে নামলে, তৎকালীন পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণে রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার পিচঢালা রাজপথ। এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। মাতৃভাষার জন্য বিশ্বের ইতিহাসে এটাই এখনও একমাত্র রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।

এই ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেয় যে, বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ। পরবর্তীতে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। সবশেষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। একুশের পথ ধরেই আমরা পেয়েছি আমাদের পতাকা, আমাদের মানচিত্র। কাজেই, একুশ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চেতনার উৎস, যা অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। ভাষার অধিকার থেকে শুরু হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে অভিযাত্রা, তার বীজ রোপিত হয়েছিল একুশের মাটিতেই। তাই একুশ ভাষার দিবস নয়; এটি আমাদের স্বাধীনতারও প্রেরণাস্থল।

একুশ আমাদের ঐক্যেরও প্রতীক। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালি জাতি ভাষার প্রশ্নে এক হয়েছিল। আজও রাষ্ট্র ও সমাজের যেকোনো সংকটে সেই ঐক্যের চেতনাই হতে পারে আমাদের প্রধান শক্তি। বিভাজনের রাজনীতি, অসহিষ্ণুতা কিংবা বৈষম্য একুশের আদর্শের পরিপন্থী। ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছেÑ সম্মিলিত প্রতিবাদই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একুশের তাৎপর্য অনন্য। আজকের বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি শেখার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষের কাছে বাঙালির এই ত্যাগের মহিমার দৃষ্টান্ত পৌঁছে গেছে। ফলে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ বিশ্ববাসীর কাছে হয়ে ওঠে ভাষার অধিকার রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের বুকে বাঙালি আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, কারণ আমরা দেখিয়েছি নিজের মায়ের ভাষার জন্য কীভাবে জীবন দেওয়া যায়।

একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই দিবসের তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ১৯৫২ থেকে ২০২৬। ভাষা আন্দোলন পার করেছে ৭৪ বছর। এটি যেমন আমাদের জন্য গৌরবের, তেমনি আত্মজিজ্ঞাসারও। এই দীর্ঘ সময় আমরা মাতৃভাষার উন্নয়নে কী করেছি, কী করতে পারিনি, সেটাও গভীরভাবে ভাবা দরকার। ভাষার উন্নয়ন হয় শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে। অথচ স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও জনসংখ্যার বিরাট অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘কোনো শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে চাইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চিরপরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়।’ অথচ মাতৃভাষাকে এখনও আমরা সর্বস্তরে শিক্ষার বাহন করতে পারিনি। প্রকৌশল, চিকিৎসাবিদ্যাসহ উচ্চশিক্ষার অনেক বিষয়ে বাংলায় বই নেই। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে পালিত ও স্মরিত হয়। কিন্তু যে মাতৃভাষার জন্য তরুণেরা জীবন দিয়েছেন, সেই ভাষার মর্যাদা আমরা কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? ভাষার মর্যাদা মানে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে এর প্রচলন। একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই সরকারের নীতিনির্ধারকরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রবর্তনের কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। কিন্তু দিবসটি চলে গেলে তারা ভুলে যান। সরকারি কাজকর্মে বাংলা চালু থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, গবেষণাসহ নানা ক্ষেত্রে ইংরেজি প্রাধান্য পেয়ে আসছে। বাংলায় আইন প্রণীত হচ্ছে, কিন্তু উচ্চ আদালত এখনও প্রধানত ইংরেজি-নির্ভর। বেশ কয়েক বছর আগে উচ্চ আদালত বাংলা ভাষা ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনতে একটি কমিটি করে দিলেও তার অগ্রগতি নেই। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের দৈনন্দিন কাজে মাতৃভাষার ব্যবহারও কমে যাচ্ছে। বাংলা পরিভাষা হচ্ছে না। হরহামেশা ঢুকে পড়ছে অধিকাংশ স্থাপনার নামফলক লেখা হচ্ছে ইংরেজিতে। যে দেশে ভাষার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই দেশে মাতৃভাষার প্রতি এ অবহেলা খুবই দুঃখজনক।

একুশের চেতনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? প্রথমত, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস জোগায়। দ্বিতীয়ত, এটি সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাবোধকে শক্তিশালী করে। তৃতীয়ত, এটি গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধের ধারক। মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মানে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধ কোথাও যেন হারিয়ে না যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবন, অফিস-আদালত, উচ্চশিক্ষা, এমনকি চটকদার কথাবার্তায় ইংরেজির অতিরিক্ত ব্যবহার একুশের চেতনার পরিপন্থী। যারা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা ও সর্বস্তরে তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

রক্তে লেখা সেই একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে, সে জাতি কখনও পরাজিত হয় না। অমর একুশের চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশ তাই মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবে, নিজের সংস্কৃতি ও স্বকীয়তাকে ধারণ করে, ন্যায় ও মানবিকতার পথে অবিচল থেকে। অতএব, অমর একুশে কেবল অতীতের গৌরবগাথা নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, প্রভাতফেরি বা কবিতা পাঠের মধ্যেই একুশের দায় শেষ হয় না। বরং ন্যায়, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত এক সমাজ গড়ে তোলাই একুশের প্রকৃত দাবি। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক চেতনায় দৃঢ় থাকাÑ এসবই একুশের প্রতি আমাদের বাস্তব অঙ্গীকার।

মনে রাখা দরকার, ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি স্মৃতিবহ দিবস নয়। তাই শহীদ মিনারের ফুলেল শ্রদ্ধা যেন নিছক আচারে পরিণত না হয়, তা যেন আমাদের অন্তরে চেতনার অগ্নিশিখা প্রোজ্জ্বলিত করে রাখে। আমরাই পারি একুশের মহিমাকে ধারণ করে গড়ে তুলতে পারি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত বাংলাদেশ।


ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী

সহকারী অধ্যাপক, বিআইজিএমএ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা