× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অমর একুশে

ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে যেসব দৈনিক

জিবলু রহমান

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫১ এএম

ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে যেসব দৈনিক

১৯৪৭ সালের জুন মাস থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা বিষয়টি লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ সময় সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং ওই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় এবং বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

তবে ভাষা আন্দোলন চলাকালীন পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত দৈনিক আজাদ ও মর্নিং নিউজ, পাকিস্তান অবজারভার, দৈনিক ইনসাফ এবং দৈনিক জিন্দেগীর মালিকানা বদলের পর নব কলেবরে দৈনিক সংবাদ।

এসব পত্রিকার মধ্যে সবকটাই যে, ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল তা নয়। কারণ পত্রিকাগুলো যতটা না সাংবাদিক নীতি, নিষ্ঠা ও সততার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে তার চেয়ে বেশি চালিত হয়েছে তাদের রাজনৈতিক নীতি ও উদ্দেশ্যের প্রভাবে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতিদানের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে শুধু মুসলিম লীগ সরকার সমর্থক পত্রিকা মর্নিং নিউজ ও সংবাদকে বাদ দিলে অন্যান্য পত্রিকার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে দৈনিক ইত্তেহাদ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হলেও পূর্ব বাংলার মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল।

ইংরেজি পত্রিকা মর্নিং নিউজের নীতি ছিল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর। পত্রিকাটি বরাবরই অবাঙালি মুসলমানদের স্বার্থে সোচ্চার ছিল। পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার কিছুকাল পরে মর্নিং নিউজ কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়ে প্রথমে সাপ্তাহিক এবং পরে দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পত্রিকা শুরু থেকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাঙালি কৃষ্টি ও লোকাচার সবকিছুকেই ‘হিন্দুয়ানী’ আখ্যায়িত করে বিষোদগার অব্যাহত রাখে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের তীব্র বিরোধিতা করাই ছিল পত্রিকাটির অন্যতম নীতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ ক’জন জ্ঞানী ও শ্রদ্ধাভাজন অমুসলিম শিক্ষক বিতাড়নের মূল উদ্যোগ ছিল এই মর্নিং নিউজ পত্রিকার। এক কথায় মর্নিং নিউজ ছিল আগাগোড়া বাঙালি তথা গণবিরোধী পত্রিকা। ভাষা আন্দোলনে মর্নিং নিউজ পত্রিকার ভূমিকা প্রসঙ্গে আব্দুল মতিন ও আহমদ রফিক ‘ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য’ গ্রন্থে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেনÑ‘... অবাঙালি স্বার্থের প্রতিনিধি এবং মূলত পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধি মর্নিং নিউজ ভাষা আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং তার চরিত্র হননের জন্য যত ধরনের সম্ভব মিথ্যা, মনগড়া সংবাদ পরিবেশ করেছিল এবং জঘন্য কুৎসামূলক সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখে বাংলা ও বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেই কর্তব্য শেষ করেনি, সাম্প্রদায়িকতার উদ্দেশ্যমূলক উস্কানিও দিয়েছে।’

মর্নিং নিউজ প্রথম থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা এবং উগ্র প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সর্বপ্রথম সাধারণ ছাত্র সমাবেশ সংগঠিত হয়। এই সভাতেও মর্নিং নিউজের প্রচারণার বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়। উক্ত সভায় যে প্রস্তাবগুলো পেশ করা হয়, তাতে মর্নিং নিউজ সম্পর্কে বলা হয়েছিলÑ‘... সভা মর্নিং নিউজের বাঙালি বিরোধী প্রচার প্রচারণার প্রতি নিন্দা করেছে এবং জনসাধারণের ইচ্ছার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের জন্য পত্রিকাটিকে সাবধান করে দিচ্ছে।’

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় মর্নিং নিউজ ছাপা হতো পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের (ভিক্টোরিয়া পার্ক) কাছে এক গলির ভেতরে অবস্থিত জুবিলী প্রেস থেকে। গুলিবর্ষণের পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে ভাষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘গায়েবানা জানাজা’ ও শোক শোভাযাত্রায় ব্যস্ত ঠিক তখনই একদল বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা জুবিলী প্রেসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে এই ছাপাখানা সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়। এই খবরের পর মর্নিং নিউজের সম্পাদক মহসিন আলী ঢাকার লাট ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন পূর্ববঙ্গের গভর্নর ছিলেন অবাঙালি মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান।

মর্নিং নিউজ পত্রিকার ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদেও আলোচিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন হলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘মুসলিম লীগ, লীগ সরকার, আর মর্নিং নিউজ ছাড়া প্রত্যেকেই বাংলা ভাষা চায়।’

রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ মর্নিং নিউজকে বাংলা ভাষা বিরোধী পক্ষ হিসেবে বর্জনের জন্য জনগণকে আহ্বান জানিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মর্নিং নিউজ পত্রিকার কর্তৃপক্ষ জুবিলী প্রেস পুড়িয়ে দেওয়ায় থানায় লিখিত এজাহার দাখিল করে। বিবাদীর তালিকায় প্রথম নাম ছিল পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক আব্দুস সালামের। এজাহারে এ মর্মে বলা হয়, ‘২২ ফেব্রুয়ারি বালতি করে যারা পেট্রোল নিয়ে জুবিলী প্রেসে আগুন ধরিয়েছিল তাদের মধ্যে আব্দুস সালাম ছিলেন অন্যতম।’

অচিরেই কোর্ট থেকে সমন জারি হলো। বিচারাধীন আসামি হিসেবে পাকিস্তান আমলের প্রখ্যাত পেশাদার সম্পাদক আব্দুস সালাম প্রায় মাস তিনেকের মতো কারাগারে আটক ছিলেন। জামিনে মুক্তিলাভের পর শুরু হয় তার বেকারত্বের দুর্বিষহ জীবন। পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রকাশনা তখন বন্ধ।

আইয়ুব খানের আমলে মর্নিং নিউজ পাকিস্তান সরকারের উদ্যোগে গঠিত প্রেস ট্রাস্ট-এর অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একই সঙ্গে ঢাকা ও করাচি থেকে এর সংস্করণ প্রকাশিত হতে থাকে। ৬-দফা দাবির প্রেক্ষিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উম্মেষের প্রাক্কালে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্রুদ্ধ জনতা মর্নিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার অফিস ও ছাপাখানা পুড়িয়ে দেয়। মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক মহসিন আলী ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর আর কোনোদিন ঢাকা সফরে সাহসী হননি।

মর্নিং নিউজের পাশাপাশি দৈনিক সংবাদও সরকারি প্রচারণার দায়িত্ব পালনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। দৈনিক সংবাদ নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের মুখপত্র হওয়া সত্ত্বেও বহু মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এবং বামপন্থী চিন্তাধারার বুদ্ধিজীবী, এমনকি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির খোঁড়া সমর্থক পর্যন্ত এই পত্রিকায় চাকরিরত ছিলেন। এদের মধ্যে জহুর হোসেন চৌধুরী, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিশ, সৈয়দ নূরুদ্দীন, আব্দুল গণি হাজারী, খন্দকার গোলাম মুস্তাফা, লায়লা সামাদ, সরদার জয়েন উদ্দিন, মুস্তাফা নুরউল ইসলাম, ফজলে লোহানী, তোসাদ্দক আহম্মদ, আনিস চৌধুরী অন্যতম। দৈনিক সংবাদের সম্পাদক খায়রুল কবীরের প্রচেষ্টায় একমাত্র রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়া পত্রিকাটি অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রে একটা পরিচ্ছন্ন সাংবাদিকতার সূচনা করতে সক্ষম হয়েছিল। উপরন্তু এ সময় মাসান্তে নিয়মিতভাবে ভালো অঙ্কের বেতন সংবাদ-এ চাকরির অন্যতম আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় দৈনিক সংবাদের গণবিরোধী ভূমিকা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। এই পত্রিকা বাংলা ভাষা আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুর নাগাদ ছাত্র-জনতার একটা ক্রুদ্ধ দল ঢাকার বংশাল রোডে অগ্নিসংযোগের জন্য আক্রমণ করে। কিন্তু সশস্ত্র পুলিশের গুলিবর্ষণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে জনতা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। এ সময় দৈনিক সংবাদের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকার প্রতিবাদে দুজন সহকারী সম্পাদক যথাক্রমে মুস্তাফা নুর-উল ইসলাম এবং ফজলে লোহানী পদত্যাগ করেন। উপরন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে যুগ্ম বার্তা সম্পাদক খন্দকার গোলাম মুস্তাফা খান তখন আত্মগোপনে।

ভাষা আন্দোলনের সময় দৈনিক আজাদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষণীয়। এই পত্রিকার মালিক ছিলেন ক্ষমতাসীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরম খাঁ। দৈনিক আজাদ পত্রিকার নীতি ছিল, কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার মতোই রক্ষণশীল ও দক্ষিণপন্থী। এ সময় পত্রিকার বেতনভুক্ত সম্পাদক ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন এমএলএ। সে আমলে পূর্ববাংলায় সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক আজাদে স্বাভাবিকভাবেই ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্বের খবরাখবর বিশেষ ছাপা হয়নি বললেই চলে। মুসলিম লীগের পত্রিকা হওয়া সত্ত্বেও দৈনিক আজাদ পত্রিকা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। দৈনিক আজাদ পত্রিকাতে বাংলা ভাষাকে সমর্থন করে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে। দৈনিক আজাদে বাংলা ভাষাকে সমর্থন করে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হলেও আজাদের কোনো স্থির মনোভাব ছিল না।

ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন প্রকাশ্য এক বিবৃতি দেন। এর প্রতিবাদে ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই আজাদে প্রকাশিত হয় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর (প্রবন্ধটিতে মুহম্মদ বানান ভুল রয়েছে) ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি। তাতে বলা হয়েছিলÑ ‘ভারতীয় গণ-পরিষদের কংগ্রেসি সদস্যবৃন্দ দেবনাগরী অক্ষরে হিন্দি ভাষাকে ভারতীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার সিদ্ধান্ত করিয়াছেন। মহাত্মা গান্ধী এবং আরও কতিপয় কংগ্রেসি নেতা উর্দু ও দেবনাগরী অক্ষরে হিন্দুস্থানি ভাষাকে চালু করিবার পক্ষপাতী। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে সে বিষয়ে মোছলেম লীগ নেতৃবৃন্দ বিবেচনা করিতেছেন। আরবি ভাষাকেই আমি বিশ্বের মুছলমানদের জাতীয় ভাষারূপে গণ্য করি.... ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করার স্বপক্ষে অভিমত দিয়াছেন। কিন্তু তিনি বোধ হয় এ কথা ভুলিয়া গিয়াছেন যে, পাকিস্তানে মুছলমান ব্যতীত বহু সংখ্যক হিন্দু ও শিখ নাগরিক আছে। অনেকেই এরূপ ধারণার বশবর্তী যে, একটি রাষ্ট্রে একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকিবে। সোভিয়েত রাশিয়ায় কয়েকটি ভাষাই রাষ্ট্রভাষা রূপে পরিগণিত হইয়াছে... কংগ্রেসের অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাদগমনই হইবে। আমরা ইংরেজকে পরিত্যাগ করিতে পারি, কিন্তু ইংরেজিকে ত্যাগ করিতে পারি না। ইহা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং আধুনিক চিন্তাধারা ও বিজ্ঞানের বাহন... ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তি এই যে, ইহা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনো প্রদেশের অধিবাসীরই মাতৃভাষা নয়। উর্দুর বিপক্ষেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমনÑ পুস্তু, বেলুচি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি এবং বাংলা। কিন্তু উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই মাতৃভাষারূপে চালু নয়। উপরোক্ত ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলাসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করিয়াছে। অধিক সংখ্যক লোকে একটি ভাষা বলে এই অনুযায়ী বাংলা ভাষা বিশ্বভাষার মধ্যে সপ্তম স্থান অধিকার করিয়াছে। যদি বিদেশি ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নাই। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে কতকগুলো অসুবিধার দরুন বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ওকালতি করা যায় না। যদি কোনো দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবি বিবেচনা করা কর্তব্য।

ভারতের সর্বত্রই অনেকে মোটামুটিভাবে উর্দুভাষা বুঝিতে পারে। এমনকি, আরব, ইরান ও আফগানিস্তানেও উর্দুর খানিকটা প্রচলন আছে। এই ভাষা আরবি অক্ষরে লিখিত হয় বলিয়া আরব, ইরান, আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসীগণও সহজে অনুকরণ করিতে পারিবেন। এই দিক দিয়া উর্দুর হিন্দি অপেক্ষা ইংরেজির দাবি অগ্রগণ্য। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে যে সুবিধা পাওয়া হইবে উর্দু ভাষা যেসব তুলনায় নগণ্য। আরবি ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে। কারণ ইহা কোরআন, হাদিসের ভাষা এবং ইহা আটলান্টিক উপকূল হইতে প্রশান্ত মহাসাগর উপকূল পর্যন্ত সকল মুছলমানের নিকট পরিচিত। পাকিস্তান ডোমিনিয়ন বা অন্য যেকোনো ডোমিনিয়নের প্রদেশসমূহের বিচারালয়, আইন পরিষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভাষা ব্যবহৃত হইবে তাহার সহিত রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে একত্রে জড়িত করিয়া দেখা উচিত... বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয় শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক নীতিবিরোধী নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিগর্হিতও বটে।’

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলা ভাষার বিরোধী বক্তব্যও আজাদে নিয়মিত উপস্থিত হতে দেখা যায়, যা ওই সময়ে সরকারি হাতকে শক্তিশালী করে। ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর আজাদ পত্রিকার ‘অহেতুক উত্তেজনা’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলা হয়Ñ‘... পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা উপলক্ষে দেশে অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এই উত্তেজনার কোনো সংগত কারণ নেই।’

অহেতুক উত্তেজনার কথা বলে দৈনিক আজাদ এই সম্পাদকীয়টিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি এড়িয়ে গেছে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের পর প্রস্তাবটি ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতাদের বিরোধিতার ফলে অগ্রাহ্য হয়। গণপরিষদে ‘বাংলা’ ভাষাকে কটাক্ষ করে ওইসব নেতৃবৃন্দ যে বক্তব্য প্রদান করেন তার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে অনেক বিবৃতি ও সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।

 

পর্ব-দুই

………………………

গণপরিষদে মুসলিম লীগের ভূমিকার বিরুদ্ধে ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘বাংলা ভাষা ও পাকিস্তান’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে দৈনিক আজাদ উল্লেখ করেছিলÑ‘পাক-গণপরিষদের সদস্যগণের সংখ্যাগুরু অংশ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬১ ভাগেরও অধিক পূর্ব-পাকিস্তানের ও তাহাদের শতকরা ৯৯ জনেরও অধিক বাংলা ভাষাী। এমতাবস্থায় বাংলা ভাষাতো উপেক্ষিত হইতেই পারে না, অধিকস্ত ইহা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ইবার যোগ্যতা রাখে...উর্দু মুসলমানদের জাতীয় ভাষা হওয়ার অধিকার কবে এবং কোথায় অর্জন করিল? এই অবস্থায় গণপরিষদের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিগণের এখন হইতে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাহাতে বাংলা ভাষার অধিকতর অসম্মান তাহাদের নিষ্ক্রিয়তায় না ঘটে।’

আজাদ ২৯ ফেব্রুয়ারি (১৬ ফালগুন, ১৩৫৪ বঙ্গাব্ধ) তারিখে ‘বাংলা ভাষার অপমান’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছিলÑ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পূর্ব্ব হইতেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে, তাহা লইয়া অনেক বাদানুবাদ শুরু হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই বাদানুবাদের তীব্রতা বৃদ্ধি হয় এবং পূর্ব্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত মহলে-বিশেষ করিয়া ছাত্র ও যুবক মহলে এই আশংকা জাগে যে, পাকিস্তানে বাংলা ভাষা উপেক্ষিত হইবে। কিন্তু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বুদ্ধিমান মানুষ এই আশঙ্কাকে অমূলক মনে করিয়াছিলেন, কারণ পাক-গণপরিষদের সদস্যগণের সংখ্যাগুরু অংশ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬১ ভাগেরও অধিক পূর্ব্ব-পাকিস্তানের ও তাহাদের শতকরা ৯৯ জনেরও অধিক বাংলাভাষী। এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা তো উপেক্ষিত হইতেই পারে না, অধিকন্ত ইহা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবার যোগ্যতা রাখে।

কিন্তু পাক-গণপরিষদের সিদ্ধান্তে পূর্ব্ব পাকিস্তানের আশাবাদী বিদগ্ধ সমাজের সকল স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হইতে চলিয়াছে। পাক-গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করার দাবী উপেক্ষিত হওয়ায় এই আশঙ্কাই বদ্ধমূল হইতেছে যে, পূর্ব্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষা আজাদ পাকিস্তানে কোন স্থান পাইবে না এবং উহার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পূর্ব্ব-পাকিস্তানের সর্বাঙ্গীণ অগ্রগতি আশংকাজনকভাবে ব্যাহত হইবে। শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাক-গণপরিষদে বাংলাভাষাকে পরিষদের অন্যান্য ভাষার সহিত সমানাধিকার দানের প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াছিলেন। পাক-ডোমিনিয়নের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ নাগরিকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা বলিয়া দাবী করার মধ্যে অযৌক্তিকতা কোথায়, তাহা আমাদের বোধগম্য হইতেছে না। পাক-ডোমিনিয়নের প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খাঁ শ্রীযুক্ত দত্তের প্রস্তাবের বিরোধীতা করিতে যাইয়া যে উক্তি করিয়াছেন, তাহাও আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করিয়াছে।

তিনি বলিয়াছেন, পাকিস্তান হইতেছে মোছলেম রাষ্ট্র এবং মুছলমানের জাতীয় ভাষা উর্দ্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হইবে। জনাব লিয়াকত আলী পাকিস্তানকে মোছলেম রাষ্ট্র বলিয়া ঘোষণা করিলেও কায়েদে আজম বহুবার তাঁহার ঘোষণায় ও বিবৃতিতে পাকিস্তানকে ঝবপঁষধৎ ঝঃধঃব (ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র) বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন, সুতরাং জনাব লিয়াকত আলীর প্রথমাংশের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিব না-কিন্তু শেষোক্ত অংশটি আমাদের হাস্যোদ্রেক করিয়াছে। উর্দ্দু মুছলমানদের জাতীয় ভাষা হওয়ার অধিকার কবে এবং কোথায় অর্জন করিল? মোগল শাসনের আমলে ভারতবর্ষে বিভিন্ন সংমিশ্রণে যে ভাষার সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহাই উর্দ্দু ভাষা এবং উর্দ্দু ভাষার উন্নতির কালে ফার্সি ছিল মোগল দরবারের এবং রাষ্ট্রের ভাষা। বর্তমানে জনাব লিয়াকত আলী যে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী সেই রাষ্ট্রের এক নগণ্যসংখ্যক লোক উর্দ্দু ভাষাভাষী। সিন্ধু, সীমান্ত ও পাঞ্জাব উর্দ্দু-ভাষী নহে। কাজেই পাকিস্তানের মুছলমান জনসাধারণের জাতীয় ভাষা উর্দ্দু বলিয়া দাবীর মধ্যে কোন যুক্তির সন্ধান পাওয়া যায় না।

এইসব অযৌক্তিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলা ভাষার দাবীকে অগ্রাহ্য করিয়া পূর্ব্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোভাবের উপরে নিষ্ঠুর আঘাত হানা হইয়াছে। দুইশত বৎসরের সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসন যে কাজ করিতে সাহস পাই নাই, আজাদ পাকিস্তান তাহা অনায়াসে করিয়া বসিল। বৃটিশ আমলে মুদ্রা, নোট ও মানিঅর্ডার ফরমের উপর বাংলা সসম্মানে স্থান পাইয়াছে, কিন্তু পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এরূপ নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপ আজাদ পাকিস্তানে সম্ভবপর হইবে তাহা কেহ কল্পনা করে নাই এবং ইহা সম্ভবপর হইল গণপরিষদে পূর্ব্ব-পাকিস্তানের নির্ব্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিকাংশের অক্ষমতার জন্য। গণ-পরিষদের সিদ্ধান্তে পূর্ব্ব-বাংলা আজ বিক্ষুব্ধ। ছাত্র, যুবক ও জনগণ তাহাদের ন্যায্য দাবীর প্রতি উপেক্ষায় মর্মাহত।

এই অবস্থায় গণ-পরিষদের পূর্ব্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিগণের এখন হইতে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাহাতে বাংলা ভাষার অধিকতর অসম্মান তাঁহাদের নিষ্ক্রিয়তায় না ঘটে। বাংলা ভাষার মাধ্যমে পূর্ব্ব-পাকিস্তান তহজিব তমদ্দুনে যে কামিয়াবী হাসেল করিয়াছে, তাহা সে হারাইতে চায় না; নূতন ভাষায় জগদ্দল পাথর কাঁধে চাপাইয়া তাহার গতি ব্যাহত করার ক্ষীণতম প্রচেষ্টা ও সে ভবিষ্যতে বরদাশত করিবে না। আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা কি হইবে, তাহার আলোচনা এখানে না করিয়া আমরা বলিব, প্রাদেশিক শিক্ষার মাধ্যম ও প্রাদেশিক দফতরের ভাষা বাংলা হইবে এবং পূর্ব্ব পাকিস্তানের এই সর্ব্বসম্মত দাবী পূরণ করার গুরুতর কর্তব্য গণপরিষদের তাহাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের পালন করিতে হইবে। এই দাবীর বিরুদ্ধতা যাঁহারা করিবেন, তাঁহাদের পদত্যাগ করিয়া পুননির্বাচনের জন্য প্রার্থী হওয়াই গণতন্ত্র সম্মত একমাত্র কর্তব্য।

মাননীয় জনাব নাজেমুদ্দিন গণ-পরিষদে তাঁহার বক্তৃতায় বাংলা ভাষা সম্পর্কে জনমত কিরূপ প্রবল, তাহা ব্যক্ত করিয়াছেন...জনাব নাজেমুদ্দিন জানিতে পারিয়াছেন যে, আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা হিসেবে পূর্ব্ব-বাংলা উর্দ্দুভাষাকেই গ্রহন করিতে চায়, কিন্তু শিক্ষার মাধ্যম ও প্রাদেশিক দফতরের ভাষা হিসেবে পূর্ব্ববাংলায় প্রবল জনমত বাংলা ভাষার পক্ষেই। জনাব নাজিমুদ্দিন এই জনমতের কি মর্যাদা দান করেন, তাহা আমরা ঔৎসুকের সহিত লক্ষ্য করিব। তাঁহার কণ্ঠে এ পর্যন্ত কোন প্রতিশ্রুতি ধ্বনিত হয় নাই। পূর্ব্ব বাংলার পরিষদের অধিবেশন আগামী এক পক্ষকালের মধ্যে আরম্ভ হইবে। এই অধিবেশনে প্রাদেশিক দফতরের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমে হিসেবে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করিয়া তিনি ও গণপরিষদের পূর্ব্ববঙ্গীয় সদস্যগণ তাঁহাদের পূর্ব্বকৃত ভুলের কিঞ্চিত প্রতিকার করিবেন বলিয়া আশা করি।’

সম্পাদকীয়টি তীব্র হলেও এতে কিছু ফাঁক রয়েছে। শেষ বাক্যে পূর্ব্বকৃত ভুলের যে প্রতিকার করার উপদেশ পূর্ব্ব-বাংলার প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে সেই ভুলটি কী? ‘আজাদ’ বলতে চেয়েছেন, পূর্ববঙ্গীয় পরিষদের অধিবেশনে যেন বাংলাকে পূর্ব বাংলার সরকারি কাজের ও শিক্ষা মাধ্যমরূপে গ্রহণ করানো হয়। কিন্তু সম্পাদকীয়তে তো দেখা যাচ্ছে, নাজিমুদ্দিন গণ-পরিষদের বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন, শিক্ষার মাধ্যম ও প্রাদেশিক দফতরের ভাষা হিসেবে পূর্ব বাংলার প্রবল জনমত বাংলা ভাষার পক্ষেই।

১৯৪৮ সালের মতো দৈনিক আজাদ পত্রিকাকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় সাহসিকতার ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। দৈনিক আজাদ পত্রিকা ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় তার গুরুত্বের প্রমাণ মেলে। এই সংখ্যায় দৈনিক আজাদের প্রথম পৃষ্ঠায় বড়ো বড়ো টাইপে ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে ছাত্র সমাবেশের ওপর গুলিবর্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রসহ চার ব্যক্তি নিহত ও সতেরো ব্যক্তি আহত, স্কুল ছাত্রসহ ৬২ জন গ্রেফতার, গুলিবর্ষণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তদন্তের আশ্বাস দান’ ইত্যাদি শিরোনামে প্রতিবেদনগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ হলে সন্ধ্যায় আজাদ পত্রিকার দু’পাতার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সাত কলামব্যাপী ব্যানার হেডিং ছিলÑ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত।’

কিন্তু ভুলবশত সশস্ত্র পুলিশের গুলিবর্ষণের জায়গায় ছাপা হয়েছিল ‘সৈন্যবাহিনীর গুলিবর্ষণ।’ এই উছিলায় নূরুল আমীন সরকার ত্বরিত সিদ্ধান্তে দৈনিক আজাদের আলোচ্য বিশেষ সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে। অবশ্য ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদের পাতঃকালীন সংখ্যায় এই ভ্রম সংশোধন করা হয়।

এছাড়াও মন্ত্রিসভায় পদত্যাগরে দাবি করে ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির সংখ্যায় ‘পদত্যাগ করুন’ শীর্ষক শিরোনামে প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক বিশেষ সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছিলÑ‘...ঢাকা শহরের বুকে যেসব কান্ড ঘটিতেছে, সে সমস্ত শোকাবহ নয়, বর্বরোচিতও বলা চলে। জনাব নূরুল আমীন পুলিশ সম্বন্ধে তদন্তের কথা বলিয়াছিলেন এবং ১৪৪ ধারা জারীর যৌক্তিকতা সম্বন্ধেও ইতস্ততার ভাব প্রকাশ করিয়াছিলেন। কিন্তু সে তদন্তের কোনো ব্যবস্থা হইল না এবং ১৪৪ ধারাও বরবৎ রহিয়াছে। ফলে গুলিতে মানুষ হতাহত হইতেছে এবং মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হইতেছে। নূরুল আমীন মন্ত্রিসভায় ব্যর্থতা চরমভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমরা এই মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করিতেছি।’

২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনামগুলো বিশেষভাবে লক্ষনীয়। এগুলো হচ্ছেÑ

১. পুলিশ ও সৈন্যদের গুলিতে ৪ জন নিহত ॥ ৭ ঘন্টার জন্য কারফিউ।

২. শুক্রবার শহরের অবস্থার আরও অবনতি ঃ সরকার কর্তৃক সামরিক বাহিনী তলব।

৩. শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে শহরে স্বতঃস্ফুর্ত হরতাল পালন।

৪. পুলিশের জুলুমের প্রতিবাদে আজাদ সম্পাদক আবুল কালম শামসুদ্দীনের সদস্য পদ ইস্তফা।

এসময় মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দলের জের হিসেবে মাওলানা আকরাম খাঁর নির্দেশেই আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। প্রকাশ, সম্পাদক হিসেবে তার বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তবে একথা ঠিক যে, সেদিন আলোচ্য পদত্যাগের ফলে ছাত্রদের মধ্যে দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। এরই ফলে শামসুদ্দীনকে দিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় শহিদ মিনারের উদ্বোধন করা হয়। এদিন সন্ধ্যায় সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় একদল সশস্ত্র পুলিশ প্রথম শহিদ ধুলিস্যাৎ করে দেয়।

১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নাগাদ দৈনিক আজাদ সুর পাল্টাতে শুরু করে। নারায়ণগঞ্জে জনৈক পুলিশ কনস্টেবল গুলিতে নিহত হলে মর্নিং নিউজ এবং দৈনিক সংবাদ এর পাশাপাশি আজাদ পত্রিকাতেও ভাষা আন্দোলনকারীদের প্রতি বিদ্রুপ মন্তব্য প্রকাশিত হয়। এমনকি আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে ভারতীয় অনুচরদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ পর্যন্ত উত্থাপন করা হয়। অথচ অনেকের মতে এই হত্যাকা- ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত।

২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা সাপ্তাহ জুড়েই নারায়ণগঞ্জে চলেছিল বিক্ষোভ। সরকারি প্ররোচনার ফলে ২৯ ফেব্রুয়ারি তা চরম রূপ নেয়। মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগমকে এদিন গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই সংক্রান্ত ১ মার্চের আজাদের প্রতিবেদন এরইরূপÑ‘সকালবেলা স্থানীয় পুলিশ নারায়ণগঞ্জ মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মিসেস মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করে মহকুমা হাকিমের আদালতে হাজির করে। সংবাদ পেয়ে একদল ছাত্র ও নাগরিক আদালতের সামনে হাজির হয়, বিনাশর্তে তাঁর মুক্তি দাবি করে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ইত্যাদি ধ্বনি করতে থাকে। মহকুমা হাকিম ইমতিয়াজী তখন বাইরে এসে বলেন, মমতাজ বেগমকে স্কুলের তহবিল-তছরুপের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গ্রেপ্তারির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু জনতা তা বিশ্বাস করে না, বলতে থাকে মমতাজ বেগমকে নারায়ণগঞ্জ রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্মী বলেই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। সুতরাং তাঁকে বিনাশর্তে মুক্তি না দিলে তারা আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাবে না। পুলিশ তখন মৃদু লাঠিচার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। বৈকালে পুলিশ মোটরযোগে মমতাজ বেগমকে নিয়ে ঢাকা রওনা হলে চাষাড়া স্টেশনের কাছে জনতা বাধা দেয়। তাতে পুলিশ ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠি চার্জ করে। ফলে উভয় পক্ষে প্রায় ৪৫ জন আহত হয়। নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের দু’জন ডাক্তার ঘটনস্থলে গিয়ে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন এবং নয়জনের আঘাত গুরুতর বিবেচিত হওয়ায় তাঁদের হাসপাতালে পাঠান। (ওই নয়জনের মধ্যে পুলিশের লোক ছিল না) তাঁদের নাম- সিরাজুদ্দিন ভুঁইয়া (২০), মোহাম্মদ রফিকুল্লা (১৮), বসির আহমদ (২৫), মোহাম্মদ ইউসুফ (২৫), সদরুদ্দিন (১৭), আব্দুস সাত্তার (১২), কফিলুদ্দিন (১২), মোহাম্মদ ইউসুফ (৩০), আর এক ব্যক্তি মূক-বধির। মোহাম্মদ ইউসুফের অবস্থা খুবই আশংকাজনক। পুলিশ স্থানীয় এম.এল.এ. ওসমান আলীর গৃহতল্লাশি করে এবং ওসমান আলী ও আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।’

নারায়ণগঞ্জের এদিনের ঘটনা সম্পর্কে অলি আহাদ বলেছেনÑ‘মর্গান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষয়ত্রী মমতাজ বেগম ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। সরকার ও সমাজের সর্বপ্রকার রক্তচক্ষুকে অবজ্ঞার সহিত উপেক্ষা করিয়া এই অপ্রতিরোধ্য তেজস্বিনী নেত্রী যুবলীগ নেতা সামসুজ্জোহা, সফী হোসেন খান ও ডাঃ মুজিবুর রহমানের সহিত হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া শহীদদের রক্ত শপথে নারায়ণগঞ্জবাসীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে উজ্জীবিত করেন। অধুনা পথেঘাটে বহু অগ্নিকন্যা দাবি ভূষিত বহু নেত্রীর নাম শুনা যায়, কিন্তু তাঁহারা কেহ কি মিসেস মমতাজ বেগমের ন্যায় অগ্নি অতিক্রম করিয়া জনতার চেতনায় স্বীয় ত্যাগ ও কর্মোদ্যম দ্বারা এবং জানমাল ও ইজ্জতের ঝুঁকি নিয়া আন্দোলনের আগুন ছড়াইতে কখনও সক্ষম হইয়াছেন? সরকার মমতাজ বেগমের এই সাংগঠনিক শক্তি ও সাহস লক্ষ্য করিয়াছিল। তাই ২৯ ফেব্রুয়ারী মর্গান স্কুল হইতে যুবলীগ নেতা সামসুজ্জোহার বাড়ী হীরামহল গমনকালে পথিমধ্যে পঁচিশ হাজার টাকা তহবিল তসরূপের মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগে পুলিশ বাহিনী মিসেস মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করে। তাঁহাকে নারায়ণগঞ্জে লইয়া যাওয়া হয় ও তাঁহার পক্ষে জামিন প্রার্থনা করা হইলে, উহা নামঞ্জুর হয়। এমনকি ভাষা আন্দোলনের সমর্থক কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি নগদ দশহাজার টাকা মহামান্য আদালতের নিকট জামিন হিসেবে তৎক্ষণাৎ জমা দিতে চাওয়া সত্ত্বেও মিসেস মমতাজ বেগমকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয় নাই। ইতিমধ্যে তাঁহার গ্রেপ্তারের উৎকণ্ঠিত ও উত্তেজিত হাজার হাজার জনতা কোর্ট ঘেরাও করিয়া ফেলে এবং মমতাজ বেগমকে লইয়া পুলিশ বাহিনী ঢাকার পথে অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিলে ক্রুদ্ধ জনতা সরকারী কারসাজীর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়া রুখিয়া দাঁড়ায়। বিদ্রোহী জনসমুদ্রের অটল অবিচল দৃঢ়তা উপেক্ষা করিয়া পুলিশ ভ্যান জনতার উপর দিয়া অগ্রসর হইতে ব্যর্থ হয়। ক্রোধান্বিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ অবশেষে পশুশক্তি প্রয়োগের আদেশ দেয়। পুলিশ জনতাকে বেদম প্রহার শুরু করিলে জনতা সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়ে; এবং সেই সুযোগে বন্দী মমতাজ বেগমকে নিয়া পুলিশ ভ্যানে ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা হয়। কিন্তু চাষাড়া রেলওয়ে ক্রসিং-এ বিক্ষুব্ধ জনতা রেলওয়ে গেইট ফেলিয়া দিয়া পুলিশভ্যানের গতিরোধ করে। এ স্থলে জনতা ও পুলিশে আরেকদফা সংঘর্ষ বাঁধে। জজকোর্ট মমতাজ বেগমের জামিনের জন্য জনাব শামসুজ্জোহা ও ডাঃ মুজিবুর রহমান ঢাকায় চলিয়া আসায় যুবলীগ নেতা সফী হোসেন খানকেই সেই দিনকার সংকটময় মুহূর্তের নেতৃত্ব দিতে হয়। পুলিশের আক্রমণে নিরস্ত্র বিদ্রোহী জনতা এক পর্যায়ে রেলওয়ে রাস্তার পাথরগুলিকে পুলিশের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ অফিসার জনাব দেলওয়ার হোসেন আহত হন। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রাজপথের উভয় পার্শ্বস্থ গ্রামগুলি হইতে হাজার হাজার জনতা আন্দোলনে শরীক হয়। তাহারা চাষাড়া হইতে পাগলা পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাইল রাস্তায় একশত ষাটটি বটগাছ কাটিয়া ঢাকামুখী পথকে অবরুদ্ধ করিয়া ফেলে। বেগতিক অবস্থাকে আয়ত্তে আনিবার নিমিত্ত কর্তৃপক্ষ শেষমেষ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসকে তলব করে। পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ সদস্য খান সাহেব ওসমান আলীর বাসস্থান বায়তুল আমান খানা তল্লাশী করা হয়। খানা তল্লাশীকালে বায়তুল আমানের বহু টাকা-পয়সা ও সোনাগহনা লুট হয়, বহু বাড়ীঘরেরও বিস্তার ক্ষতি সাধিত হয় এবং খানসাহ্বে ওসমান আলীকেই নহে, পুলিশ তাঁহার পুত্র মোস্তফা সারওয়ারকেও গ্রেপ্তার করে। সেই আন্দোলনের মূল কর্ণধার যুবলীগ নেতা সফী হোসেন খান, ইলা বক্শী ও ছাত্রী বেলুও গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারকৃত অপর বন্দী কমরুদ্দীনও ও দবিরকে পুলিশ বেদম প্রহার করে। দিনকয়েকের মধ্যেই সামসুজ্জোহা, জামিল, লুৎফর রহমান এবং সাত বৎসর বয়স্ক বালক মেসবাহউদ্দিন কারারুদ্ধ হন....(অনুচ্ছেদ)....রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কারণে অনেককেই গুরুতর মাশুল দিতে হইয়াছে। কারাগার হইতে বন্ড সহি করিয়া মুক্তিক্রয় করিতে অস্বীকার করিলে মিসেস মমতাজ বেগমকে তাঁহার স্বামী তালাক দেন। এভাবেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে যোগ দিবার অপরাধে মমতাজ বেগমের সংসার তছনছ হইয়া যায়। তাঁহার এই ত্যাগ আমরা মূল্যায়ন করিতে সক্ষম হইয়াছি কি? এবং সেই অনুযায়ী জাতির কর্ণধারগণ তাঁহাকে যথোপয্ক্তু সম্মান দেখাইয়াছেন কি?’

১ মার্চের পরবর্তী সংখ্যাগুলো থেকে দৈনিক আজাদ ভাষা আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের নিয়েও রহস্য তৈরি করার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দৈনিক আজাদ পত্রিকার ১৯৫২ সালের ২ মার্চ তারিখের সংখ্যায় নারায়ণগঞ্জ শহরের ভাষা সৈনিক মমতাজ বেগমের জীবন পরিচয়কে রহস্যময় করে দেখাবার চেষ্টা করে এবং তাকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ বলে মন্তব্য করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। এছাড়াও দৈনিক আজাদের ১৯৫২ সালের ১ মার্চের ‘আজিকার প্রশ্ন’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সমাজকে অন্ধ আবেগাপ্লুত বলে বর্ণনা করে। পত্রিকাটিতে উল্লেখ করেÑ‘ভাষা-সংক্রান্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া সম্প্রতি যে পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে, উহাকে কিছু নয় বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া কোনমতেই যুক্তসঙ্গত নয়। ইহার মধ্যে যে সব সমস্যা দেখা দিয়াছে, তাতে সবচাইতে বেশী প্রকট হইয়াছে সাধারণ মানুষের গভীর নৈরাশ্য ও সহায়তা। ছাত্র ও যুবকদের সম্পর্কে কথাটা আরও বেশী করিয়া প্রযোজ্য। যে আদর্শের ঘোষণা তারা শুনিয়াছিল, যা তাদের একদিন পাকিস্তানের জন্য সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল, পরবর্তীকালে তারা বাস্তবে উহার সাক্ষাৎ পাইতেছে না। তাদের অন্তর তাই আজ হিমশীতল; কিন্তু যৌবনসূলভ উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাব নেই। তাই তারা অন্ধভাবে ছুটিয়া চলে; সুবিধাবাদী ও পাকিস্তানবিরোধীরা তাহাদের এই উদ্যম ও উৎসাহকে নিজের কাজে লাগায়। (অনুচ্ছেদ) এই নৈরাশ্যই আবার গভীর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও একটা কঠিন মনোভাব সৃষ্টি করিয়াছে। এক মানুষ অপর মানুষকে বিশ্বাস করে না, মমত্ব ও বেদনাবোধের অভাব সর্বত্র। ঘরে-বাহিরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তা, স্বার্থপরতা ও ঔদাসীন্য। পুত্র-পিতার, ছাত্র-শিক্ষকের, ভাই-ভাইয়ের কথা শুনে না। শুনিবেই বা কেন? তারা দেখে, তাদের চিন্তা, বচন ও কার্য্যরে মধ্যে সামঞ্জস্য তো নাইই, বরঞ্চ তা পরস্পর বিরোধী। পশ্চিমা পুঁথিতে তাহারা অনেক কিছু পড়িতেছে। গণতন্ত্র, সাম্য, জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র-এসব কথা কিন্তু আসলে তাহাদের কাছে শ্লোগান হিসেবেই থাকিয়া যাইতেছে। বাস্তব জীবনে তা কার্যকরী হয় নাই।’

২ মার্চের ‘আজাদে’ ‘মমতাজ বেগমের বিচিত্র জীবন’ বেগম মমতাজ মুনাফ’-এর জীবন-পরিচয়কে রহস্যময় করে দেখানোর একটা প্রয়াস হয়েছে। তবে তাতে বলা হয়েছে, তিনি পূর্বে ছিলেন হিন্দু, নাম ছিল কল্যাণী রাণী, ডাক নাম নিনু। অলি আহাদ যাদের গ্রেফতারের কথা বলেছেন তার সমর্থন ২ মার্চের আজাদে রয়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা পুলিশ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলেও দেড় ঘণ্টা ধরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়, ১০ জনকে গ্রেফতার করে।

১ মার্চ মুন্সিগঞ্জে ঢাকা জেলা শিক্ষক-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির অভিভাষণের সূচনায় তিনি বলেনÑ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানভূক্ত নই। তবু ছাত্ররা যেসব ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত, আমরা সে সম্পর্কে নীরব থাকতে পারি না। ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে আমরা অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা আশা করি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দ্বারা এই ঘটনা সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা হবে। আমরা মনে করি, জনসাধারণ স্বাধীনতা প্রিয় না হলে কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। আবার রাষ্ট্রানুগত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যরেখে বাক্য, চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা না দেয়া হলে জনসাধারণও স্বাধীনতাপ্রিয় হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করাও প্রত্যেক সরকারের কর্তব্য। আমরা নিহতদের পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানাচ্ছি এবং জনসাধারণ, বিশেষত শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতি শান্ত পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে সাহায্য করার আবেদন জানাচ্ছি।’

১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আর একটি ঘটনা ঘটে। ২ ও ৩ মার্চের আজাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত আটটায় কালীরবাজারে পাহারারত একজন পুলিশ কনস্টেবল অজ্ঞাত গুলির আঘাতে নিহত ও একজন আনসার আহত হন। পূর্ব বাংলা সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী, কনস্টেবলটির সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়, আহত আনসারটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আনসারটির গলায় গুলী লাগে। ১ মার্চই আনসারটির নাম বলা হয় খলিল আহমদ। কিন্তু পরদিন নিহত কনস্টেবলের নাম জানানো হয় সৈয়দ জোবেদুল হক।

প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন ১ মার্চ রাতেই নিহত ব্যক্তির শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি ও আহত ব্যক্তির প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে জনগণকে প্রদেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে বলেন। তিনি বলেনÑ‘এই ঘটনায় তিনি ব্যথিত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করে কনস্টেবল কর্তব্যপরায়ণতার মহান দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন। তাঁর বিশ্বাস, তদ্দৃষ্টে জনগণের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার দৃঢ়তা আরো বৃদ্ধি পাবে।’

তিনি বলেনÑ‘ভাষার প্রশ্নের আবরণের নিচে যে একটি রাষ্ট্রধ্বংসী কুপ্রয়াস চলে আসছে তা ক্রমশ বের হয়ে পড়ছে।’

নূরুল আমিন ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত করার পূর্বেই এইসব কথা বলেন। ২ মার্চ সরকার নিহত কনস্টেবলের পোষ্যদের এককালীন দশ হাজার টাকার ভাতা দানের এবং আনসারটিকে দুই হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দানের সিদ্ধান্ত করেন। আনসারটি প্রাণে রক্ষা পান। কনস্টেবলটির বয়স ছিল ২৫। এই ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জে এদিন ধরপাকড় শুরু হয়। মোট ১৮ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কালীরবাজার এলাকার দশটা বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ নারায়ণগঞ্জের ৩ মাইল উত্তরে শীতলক্ষার পূর্বতীরে নবীগঞ্জ গ্রাম থেকে একটি লাইসেন্সওয়ালা বন্দুক আটক করে।

বেলা ২টায় চাষাড়ার গোরস্থানে কনস্টেবল সৈয়দ জোবেদুল হকের লাশ দাফন করা হয়। জি.ও.সি, ঢাকার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল, পুলিশ সুপার ও বহু নাগরিক দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জে পৌর-কার্যালয় প্রাঙ্গন থেকে মিছিল করে গোরস্থানে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়, সামরিক মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়। কালীরবাজারে শনিবার রাত ১১ টা থেকে সোমবার ভোর ৫টা পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টার জন্য এবং শহরের অন্যান্য এলাকায় রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ৭ ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন ও অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪-ধারা জারি করা হয়।

এই ঘটনার জন্য প্রকৃত দায়ী কে বা কারা তা বলা আজ আর সম্ভবপর নয়। সরকার যে ক্রমাগত বহিঃশত্রুর চক্রান্ত ও উস্কানির কথা বলে চলেছিলেন, যার পক্ষে কোনো বাস্তব-সম্মত প্রমাণ দেখানো সম্ভব হয়নি, তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্যই সরকারই এই নৃশংস অপকর্ম করেছিলেন কিনা তা বলা যায় না, যদিও সরকার-বিরোধীরা তাই অনুমান করেছেন। ভাষা-আন্দোলনকারীরা ইচ্ছা করলে সরকার-বিরোধী নাশকতা যথেষ্ট করতে পারতেন। কিন্তু তারা তা করেননি।

২ মার্চ ঢাকা শহরের নওয়াবগঞ্জের একটি গৃহে বোমা বিস্ফোরণ হয়, ঘরের টিনের চাল উড়ে যায়, দেয়াল ফেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ৭৬ নম্বর এনায়েতগঞ্জ লেনের এই বাড়ি থেকে বাসিন্দা বোঁচা মিঞা ও তাঁর পুত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জন হিন্দুকে এ সম্পর্কে গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের একজন ওই বাড়িটির মালিক।

পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং গণপরিষদের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সমর্থন করার জন্য গণপরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ দেন। ২ মার্চের আজাদে সংবাদটি খুবই দুর্লক্ষণীয়ভাবে মুদ্রিত হয়। আজাদ ২ মার্চ সম্পাদকীয় লেখেÑ‘নারায়ণগঞ্জের ঘটনা’, ৩ মার্চ লেখেÑ‘শোচনীয় হত্যাকা-।’ উভয় সম্পাদকীয়তেই সরকারি বক্তব্যকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা হয়।

সরকার এবং তাদের সহযোগীরা এই সময় বিপুল প্রচার অভিযানে নামেন। মজার কথা, তারা গুজবের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে বলেন কিন্তু নিজেরাই ব্যাপকভাবে গুজব-রটনার কাজে ব্যাপৃত হয়ে পড়েন। নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ আব্দুল আজিজ ও মীর সিরাজুল হক এবং ঢাকা শহর-সম্পাদক ফজলুল হক ২ মার্চ একটি বিবৃতি দিয়ে সরকারি বক্তব্যকে সমর্থন করেন। তারা বলেনÑ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই আন্দোলনের মধ্যে কমিউনিস্টদের অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য জনসাধারণ প্রয়োজনীয় সকল রকম ব্যবস্থাই অবলম্বন করবেন।’

নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এর আগে, ভাষা-আন্দোলনের জোয়ারের সময় অন্যরকম বক্তব্য পেশ করেছিলেন। তবে ৩ মার্চ নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ওয়ার্কিং কমিটি যে-সব প্রস্তাব গ্রহণ করে তার সুর একটু অন্যরকম। গণপরিষদ সদস্যদের সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, বাংলাকে যদি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা না হয় তাহলে আবার রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন হবে এবং তাতে তারা যোগদান করবেন।

৪ মার্চের আজাদের প্রথম পৃষ্টায় জনসাধারণে উদ্দেশ্যে সুদৃশ্যভাবে নিুরূপ ছয়-দফা (সরকারি) আবেদন প্রচার করা হয়Ñ

‘গুজবে বিশ্বাস করিবেন না। রাষ্ট্রের শত্রুর ফাঁদে পা দিবেন না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একতা ও সংহতি অপরিহার্য। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা শুধু দেশের অগ্রগতিকেই ব্যাহত করিবে না-আজাদীর মূলেও কুঠারাঘাত করিবে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কার্যকলাপ অব্যাহত রাখুন।’

আমরা এর পাশাপাশি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ অনুমোদিত ভাষা আন্দোলনের স্লোগানগুলিও দেখতে পারি ঃ পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। শহীদের খুন-ভুলব না। জালিমশাহীর-পতন চাই। খুনীদের ফাঁসি চাই। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা-বাংলা চাই। বাংলা-উর্দু-বিরোধ নাই। নিরাপত্তা বন্দীদের মুক্তি চাই। লীগ সরকার-জুলুম করে। আমাদের-গুলী করে। মুসলিম লীগে-থাকব না। গুলী- খেয়ে মরব না।

অত্যন্ত সুকৌশলে তরুণদের অবাধ্য বলার প্রয়াসও পায় দৈনিক আজাদ পত্রিকাটিতে। দৈনিক আজাদের স্ববিরোধী ভূমিকা যেমন ইতিহাসে স্থান পেয়েছে, তেমনি প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তার ইতিবাচক ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ।



জিবলু রহমান

গবেষক, কলাম লেখক ও গ্রন্থকার

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা