মো. মসিউর রহমান হিমেল
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৫ পিএম
মো. মসিউর রহমান হিমেল। ফাইল ছবি
যখন কোন মানব শিশু পৃথিবীকূলে জন্ম গ্রহণ করে তখন তাকে কোননা কোন একটা নামে ডাকা হয়। এটা যেমন নব-জাতকের একটা জন্মগত অধিকার, নিজের মায়ের ভাষায় তথা তার নিজস্ব ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করাও শিশুটির জন্মগত অধিকার। এ অধিকার সমাজ বা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত নয়; এটা সম্পূর্ণ প্রকৃতি প্রদত্ত। পৃথিবীর যেই অবস্থানে বা প্রান্তেই তার জন্ম হউক না কেন, সে তার আপন ভাষায় সকল অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে করবেই। আর এটা জন্ম গ্রহণ ও মৃত্যুর মতই পরম সত্য। ইহার মত আর বড় সত্য এ জগতে নেই।
পৃথিবীর অভ্যন্তরে বহুভাষা আছে, আর এই বহু ভাষা-ভাষীর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে-বিশ্ব মানব বসতি। পৃথিবীতে বহু তার অস্তিত্ব ছিল, এখনো আছে, আবার থাকবে। কালের করাল গ্রাসে কিছু ভাষা বিলুপ্তও হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে ভাষা বা উপভাষার নিজস্ব গুরুত্ব কোন ক্রমেই ক্ষুণ্ন হয়নি। মানুষের মুখের ভাষা কত যে মর্মস্পর্শী তা কিছুটা উপলব্ধি করা যায়, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মুখের আঞ্চলিক ভাষার প্রতি কটাক্ষ করে বেফাঁস কিছু বলে ফেললে, মারামারির মত অবস্থা দাঁড়াই। ভাষা মানুষের অস্তিত্বের সাথে প্রতিনিয়ত একাত্ব হয়ে রয়েছে- তার শ্বাস প্রশ্বাসের মতো। পৃথিবীতে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির ভাষা রয়েছে। এই সব ভাষা কিন্তু ব্যকরণ সিদ্ধ নয়। অঞ্চল বিশেষে একই ভাষা বিভিন্ন ঢং এ ব্যবহৃত হওয়া সত্ত্বেও পন্ডিতদের কাছে ভাষা পরিভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এটা রীতিমত গবেষণার বিষয়বস্তু। নির্দ্ধিধায় বলা যায়, আজও বাংলাদেশের বেশীর ভাগ জনগোষ্ঠী ব্যকরণ স্বীকৃত সাধু বা কথ্য ভাষায় কথা না বলে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ভাষার এ গতি পথ রুদ্ধ করার সাধ্য কিন্তু কারো নেই। প্রাকৃতিক জলবায়ুর মতো ভাষাও কিন্তু আপন সত্ত্বায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বলেই ভাষা; মাতৃভাষা আরো বেশী মর্মস্পর্শী, বেশী গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে।
১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন বা ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকার রাজপথে রক্ত গঙ্গা বয়ে যায়। পাক সরকার রক্ত চক্ষু দেখিয়ে এদেশের মানুষের প্রাণের দাবী মাতৃভাষার মর্যাদা, সম্মান ভূলুন্ঠিত করতে পারেনি শকুনি শাসকচক্র। আমাদের বীর সন্তানদের বহু ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মাতৃভাষার মর্যাদা। তারা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেদের অমূল্য জীবন। অপরিসীম সাহসিকতায় শাসক গোষ্ঠির ভ্রুকুটির নিকুচি করে মাথা নত না করার মত এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই সবুজ বাংলা মায়ের অনুগত সন্তানেরা। এতে হতবাক হয়েছে বিশ্ববাসী, তাই মস্তক নুইয়ে আসে বীর সন্তাদের মাতৃপ্রেম, ভাষা প্রেম ও দেশ প্রেম দেখে।
বিভিন্ন দেশ জয়ে মানুষ প্রাণ দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য, আর্থিক অধিকার ও বাঁচার অধিকার আদায়ের জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে, নানা কারণে মানুষ প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে প্রাণ বিসর্জনের ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। বাংলার সূর্য সন্তানেরা ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে ভাষার জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিলেন ভাষার প্রশ্নে কোন আপোষ নেই। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি এদিন ঘটলেও তার ঐতিহাসিক পটভূমি রচিত হয়েছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ এর ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই অর্থাৎ ১৯৪৭ এ অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠী বাংলা ভাষার অধিকারের বিষয়ে স্বেচ্ছাচারিতার ঘৃণ্য পরিচয় দেয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির মতামত উপেক্ষা করে একটা অযৌক্তিক পদক্ষেপের পরিণাম শুভ নয় জেনেও নিলর্জের মতো প্রচন্ড আঘাত করে। প্রতিবাদ তখন তুঙ্গে উঠে, প্রতিরোধ উচ্চকিত হয়-রাজপথে, সংসদে। সর্বস্তরের মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার সত্ত্বেও পাক শাসক চক্র উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার একটা হীন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। ঘনিয়ে আসে ৫২'র সেই রক্ত ঝরা দিন ২১'শে ফেব্রুয়ারী। আর বুকের তাজা রক্ত দিয়েই রাখতে হলো মায়ের ভাষার মান।
শহীদ হলো- রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, আরো অনেক নাম না জানা কত। কবির ভাষায় ‘এক থোকা নাম’ রচিত হলো রক্তে লেখা এক ইতিহাস। নির্মিত হলো বাংলার মাটিতে শহীদ মিনার, সূচীত হলো স্বাধীকার আদায়ের স্তম্ভ। অবাক বিশ্বয়ে পৃথিবীর লোক প্রত্যক্ষ করলো বাঙ্গালী জাতির এক গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। মর্মস্পশী গীত রচিত হলো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কী ভুলিতে পারি’ এই অমোঘ সুর ও বাণীতে গোটা জাতি এই ভূমিকায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধায় ভক্তিতে ভালবাসায় আবেগ আপ্লুত অশ্রু সজল হয়ে পড়লো।
সেই মহান ৫২ এর পর থেকে প্রতিটি ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে মানুষ প্রভাত ফেরির মধ্যে দিয়ে শহীদ মিনারে সমবেত হয়, শহীদদের প্রতি তাঁদের হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে আসে। সর্বোচ্চ ত্যাগ তিতিক্ষার জীবন বিসর্জন দিয়ে তাঁরা আপামর হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারী এলেই আমরা সবাই শহীদ মিনারো যাবো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাতে।
বর্তমানে তাই ২১ শে ফেব্রুয়ারী ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন আঙ্গিকে প্রতিপালিত হয়। কারণ মহান একুশে ফেব্রুয়ারী বিশ্বসভায় স্বীকৃত। একুশে ফেব্রুয়ারী আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্ব সভায় তার স্বীকৃতির মাধ্যমে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এটা কিন্তু কোন অংশে কম গুরুত্ব বহন করে না। আমরা মে দিবসের কথা সবাই জানি, ৮ ঘন্টা কাজের দাবীতে শিকাগোর মেহনতি মানুষদের হত্যাকান্ডকে স্মরণ করেই বিশ্ববাসী কিন্তু ১'মে দিবস পালনের মধ্যে দিয়ে তাঁদের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। একই ভাবে ২১ ফেব্রুয়ারী দুই দশকের বেশী সময়ধরে (চলমান প্রায় তিন দশক) গোটা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এটা বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমাদের গৌরব ও পরম অহংকারের।
২১ শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মর্যাদা লাভের পেছনে যাঁদের অবদান রয়েছে তাঁরা সবাই ধন্যবাদের পাত্র, শ্রদ্ধার পাত্র। ভাষা শহীদ জব্বারের জন্মস্থান গফরগাঁও থেকে গফরগাঁও থিয়েটার নামক সংগঠণ, জনাব ইনামূল হক, কানাডায় বহু ভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা প্রেমিক গ্রুপ, প্যারিস জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংগঠণ ইউনেস্কো, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলা একাডেমী ও অন্যান্যদের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর বহু চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে মহান একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবেসের মর্যদা পায়। তাই গত দুই দশকেরও অধিক সময় থেকে মে দিবসের মতো গোটাবিশ্বে (গত বছর ২০২৫ এ ২৫তম বা রজতজয়ন্তী হিসেবে প্রায় ১৯৫ টি দেশে) মহান একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে পালিত হয়েছে। আশা করছি এবার বিশ্বের আরও অধিক দেশে মহান একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে উদযাপিত হবে। আর এই অভাবনীয় সাফল্যে যাঁদের অবদান রয়েছে বিশেষ করে তাঁদের প্রত্যেককেই আমাদের সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও সালাম জানাই।