× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গণতন্ত্রের নতুন বাঁকে বাংলাদশের রাজনীতি

জাকির হোসেন

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৫ এএম

রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ভুলগুলো বিরোধী দল ছায়া কেবিনেটের মাধ্যমে সামনে আনে। প্রতীকী ছবি

রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ভুলগুলো বিরোধী দল ছায়া কেবিনেটের মাধ্যমে সামনে আনে। প্রতীকী ছবি

এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচনের দিন সারাদেশে ছিল অনেকটা উৎসবের আমেজ। কোনো প্রকার হাঙ্গামা ছাড়াই শেষ হয়েছে নির্বাচন। পরাজিত পক্ষ পরাজয় মেনে নিয়ে জাতীয় সংসদে গঠণতান্ত্রিক বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেছে। শপথের আগেই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াত আমিরের বাসায় গিয়েছেন এবং জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তার বাসায় দেখা করেছেন। পাশাপাশি শেডো কেবিটেন বা ছায়ামন্ত্রী পরিষদ গঠনের কথা বলেছে বিরোধী পক্ষ—যেটা বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রয়েছে। নির্বাচন এবং নির্বাচনের পর তিন দিনের মধ্যেই আমরা এই ঘটনাগুলো দেখেছি। যেটা বাংলাদেশের রাজনীতির ৫৪ বছরেও দেখিনি। এসব গণতানুগতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত। তাই বলা যায়, গণতন্ত্রের নতুন বাঁকে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে রাজনীতি।

১৯৯১ সালকে বলা হয়, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার সময়। ওই নির্বাচনে আগে একটা স্বৈরাচারি সরকারকে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এদেশের মানুষ বিদায় করেছিল। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়েছিল। যেটা নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়া ছিল। নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আন্তরিকতা, সখ্যতা ছিল, নির্বাচনের পর এক মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যায়। নির্বাচনে পরাজিত দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তোলে। শুরু হয় বিরোধিতা। এই বিরোধিতা থেমে থাকেনি। বলা যায়, ২০২৪-এ ক্ষমতা ছেড়ে ভারত চলে যাওয়া পর্যন্ত ছিল। কারণ ৯১-এর নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই নেত্রীকে শেষবারের মতো পাশাপাশি বসতে দেখেছি। এরপর আর কখনও তাদের মুখ দেখাদেখি ছিল না। ওয়ান ইলেভেনের সময় একবার ফোনে কথোপকথন হলেও তা ছিল তীর্যক ভাষার। ফলে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলতে যেটা বোঝায় সেটা সব সময়ই অনুপস্থিত থাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এই শিষ্টাচার বলবৎ থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই নেত্রী হয়ে থাকতেন গণতন্ত্রের আইকন।

বিশ্বের অনেক দেশেই গণতন্ত্রের জন্য নেতৃত্ব দেওয়া মানুষটিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মনে রাখে। ৯১-এর গণতন্ত্রের পথে যাত্রাটি ঠিক তেমনই ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। তাই বলে নিরাশ করেননি তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহশীলতার শিক্ষা নিয়ে এসেছেন। যার কিছুটা প্রয়োগ আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি। নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের বক্তব্য এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর পর্ব এবং সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে ভাষণে আমরা লক্ষ্য করেছি। 

জামায়াত আমির ফেসবুক স্ট্যাটাসে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের কথা বলেছেন। ফলে রাজনীতির মাঠে বিরোধিতা থাকলেও নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্য যে থাকতে পারে তার প্রমাণ হয়েছে। এবার দেখার বিষয় রাষ্ট্র পরিচালনার পর দলগুলো নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব এবং গঠনমূলক সমালোচনা বা বিরোধিতা কতটা তুলে ধরতে পারে। ইতোমধ্যে ছায়া মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বে অনেক গণতান্ত্রিক দেশে ছায়া কেবিনেট চালু আছে। কবে থেকে এই ছায়া কেবিনেট প্রথা চালু হয়েছে তা সুস্পষ্ট না করা গেলেও যুক্তরাজ্যকে বলা হয় এই প্রথার জনক। কারণ যুক্তরাজ্যে ছায়া কেবিনেট সফলভাবে কাজ করছে। মূলত রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ভুলগুলো বিরোধী দল ছায়া কেবিনেটের মাধ্যমে সামনে আনে। সংসদে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে অনেক সময় সরকারকে বিতর্কিত বিল সংশোধন, অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বাধ্য করে। মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সরকারের সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প পরিকল্পনা দেয় ছায়া মন্ত্রিপরিষদ। 

ছায়া মন্ত্রিপরিষদ সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। সরকার একচেটিয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। নীতি গ্রহণে বিতর্ক ও স্বচ্ছতা বাড়ে। সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা প্রকাশ করে বলে সরকার সব সময় তটস্থ থাকে। গণমাধ্যম ও জনমত সক্রিয় থাকে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে সক্রিয় থাকে এই ছায়া মন্ত্রিপরিষদ।

স্বাস্থ্য খাতে শেডো কেবিনেটের ভূমিকা প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, লেবার পার্টির শেডো হেলথ সেক্রেটারি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কনজারভেটিভ সরকারের এনএইচএস-এ সংস্কার ও বেসরকারিকরণের প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেন। সাফল্য : বার্নহ্যামের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এনএইচএস-এর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। তারা স্থানীয় হাসপাতালের সংকট এবং চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রচারণা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, এনএইচএসর ভবিষ্যৎ ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনের একটি প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়। যদিও লেবার পার্টি নির্বাচনে জিততে পারেনি, তবে তারা সরকারকে এনএইচএস নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং জনসেবা রক্ষায় নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করে।

শেডো ক্যাবিনেটের একটি বড় সাফল্য হলো সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতা সংসদে এবং গণমাধ্যমে তুলে ধরা। যুক্তরাজ্যে ২০২১-২২ সালে যখন জানা যায় যে, ডাউনিং স্ট্রিটে লকডাউনের সময়ও পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল, তখন লেবার পার্টির শেডো কেবিনেট এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। শেডো মিনিস্টাররা সংসদে প্রতিনিয়ত এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সরকারের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের জনপ্রিয়তা ও কর্তৃত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়।

সংসদীয় প্রক্রিয়ায় শেডো কেবিনেট সরাসরি বিলের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দেয় এবং অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকারকে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। যদিও সরকারের সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তবুও শেডো কেবিনেট চাপ এবং জনমতের সমর্থন নিয়ে অনেক সময় তারা সরকারকে তাদের বিলে পরিবর্তন আনতে রাজি করাতে পারে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার এবং পরিবেশ-সংক্রান্ত বিষয়ে এরকম সাফল্যের উদাহরণ রয়েছে।

এই উদাহরণগুলো থেকে বোঝা যায়, শেডো কেবিনেটের সাফল্য শুধু ক্ষমতা দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সরকারের নীতি-নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার, জনমত গঠন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও পরিমাপ করা হয়।

বাংলাদেশে শেডো কেবিনেট চালুর বিষয়ে একবার আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সেটা আলোর মুখ দেখেনি। এবার নির্বাচনের পর জামায়াতের এক নেতা এবং এনসিপির এক নেতা শেডো কেবিনেট বা ছায়া মন্ত্রিসভার কথা বলেছেন। যদিও এটি কীভাবে গঠিত হবে। এর কাজ তারা কীভাবে করবেন তার বিস্তারিত কিছু বলেন। তাদের এই ইচ্ছা এখনও ফেসবুক পোস্টেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে গেলে এই পথে হাঁটতে পারে জামায়াতের নেতৃত্বধীন ১১ দলীয় জোট। এটা তাদের ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে প্রশস্ত করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলের গুরুত্ব রয়েছে। সরকারের ভুল ধরিয়ে দিতে এবং সরকারের অন্যায্য নীতি থেকে বিরত রাখতে বিরোধী দলকে ভূমিকা পালন করতে হয়। তবে সেটা অবশ্যই গঠনতান্ত্রিক হতে হবে। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদে ওয়াক আউট প্রথা চালু আছে। বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের রীতি চালু আছে। নেই শুধু গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা।

আমাদের রাজনীতিকরা রাজপথকে বেশি পছন্দ করেন। যেকোনো দাবিদাওয়া সংসদে আলোচনা না করেই দলবল নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের কথা বলার জন্যই তো সংসদ। দাবি আদায়ের জন্যই তো সংসদ। তবে রাজপথ কেন। আশার কথা হচ্ছে বিএনপিতে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। সেই নেতৃত্বের হাতেই নতুন বাংলাদেশের শাসন ভার। এই নতুন নেতৃত্ব আমাদের ইতিবাচক ধারার রাজনীতির পথে নিয়ে যাবে এমনটাই আশা করা যায়।


জাকির হোসেন

সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা