মাতৃভাষা
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২০ এএম
শহিদ মিনার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহনই হলো তার ভাষা। বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা হলেও মাতৃভাষা হিসেবে শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষার চর্চা দিনদিনই যেন গুরুত্ব হারাচ্ছে। যে ভাষার অধিকার আদায়ে শহীদরা রক্ত দিয়েছিল, মাতৃভাষার গুরুত্বকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করেছে যে জাতি সেই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে শুদ্ধভাবে ভাষা চর্চা করার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। অথচ শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা চর্চা দিনদিনই গুরুত্ব হারাচ্ছে।
বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের পোশাক-আশাকে, ভাবভঙ্গিমায় বাংলা সংস্কৃতির অনুপস্থিতি দিন দিন প্রবলতর হচ্ছে। বাংলা শিখবার আগেই আমাদের ঝোঁক কেবল ইংরেজি শিক্ষার দিকে। পাড়ায়, মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো যেন সেই বার্তাই দিয়ে যায়। এইসব বিদ্যালয়ের বাহারি ইংরেজি নাম আর জৌলুসের চাকচিক্যে বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর যেন জীর্ণকায় অবস্থা। একটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে, তবে শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত অবশ্যই মাতৃভাষা। ইংরেজি মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতির আবহে শিক্ষার্থীরা বড় হচ্ছে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে কী করে? বাংলা ব্যাকরণ নামে যে পাঠ্যপুস্তকটি বিদ্যালয়ে পড়ানো হয় সেটি সম্ভবত খুব কম পঠিত হয়, যেন কোনোভাবে সেই বিষয়ে পাস করলেই চলবে। অথচ শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে ও পড়তে গেলে কিছুটা ব্যাকরণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
শুদ্ধভাবে ভাষা চর্চায় নবীন প্রজন্মেরও আগ্রহ নিতান্তই কম। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভাবে উচ্চ শিক্ষার্থে যেহেতু তারা বিদেশে পাড়ি জমাবে তাই মাতৃভাষার জ্ঞানটা ভালোভাবে না জানা থাকলেও চলবে। রেডিও, টেলিভিশনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার ওপর চলছে এক অদৃশ্য নিপীড়ন, সামাজিক মাধ্যমে প্রমিত বাংলার ব্যবহার একেবারেই অনুপস্থিত। ফেসবুক আর ইউটিউবের চটকদার বিজ্ঞাপনগুলো যেন অশুদ্ধ বানান আর স্থূল রুচির সীমাহীন বহিঃপ্রকাশ। চলতে-ফিরতে রাস্তার সাইনবোর্ডে বাংলা নাম প্রায় অনুপস্থিত। যদি-বা থেকে থাকে তাতে ভুল বানানের সমারোহ। একমাত্র পহেলা বৈশাখ ছাড়া বাংলা মাস, তারিখের গুরুত্ব যেন আমাদের জীবনে হারিয়ে গেছে। রেডিওর এফ এম চ্যানেলগুলোতে বিকৃত বাংলা উচ্চারণ আর ইংরেজির ব্যবহার অত্যন্ত বেশি। রেডিও উপস্থাপকরা বাংলা ইংরেজির সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলেন।
যেকোনো ভাষা যুগের প্রয়োজনে সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে নতুন প্রজন্ম অতি স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে এমন কিছু শব্দ ভাষায় সংযোজন করছে, যা কিছুতেই আমাদের মাতৃভাষার শোভাবর্ধন করছে না। তবে এসব ভাষার ব্যবহার অভিভাবকদের কাছে হয়ে উঠছে রীতিমতো অস্বস্তিকর। এগুলো কোনোভাবেই আমাদের মাতৃভাষার অলংকরণ বৃদ্ধি করছে না, বরং সৌন্দর্যহানি ঘটছে।
প্রতিটি ভাষার সত্যিকারের প্রাণ লুকিয়ে থাকে তার গল্প, কবিতা তথা সাহিত্যে। বাংলা ভাষার সাহিত্য ভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সেইসব সৃজনশীল সাহিত্যে ডুব না দিলে ভাষার প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলা সাহিত্যের যে বিশাল জ্ঞানভান্ডার তার সান্নিধ্যে আসছে খুব কম আমাদের জীবন যাপনে ঢুকে পড়েছে অর্থহীন বিনোদনের এক দুনিয়া যেখানে সবকিছুই খুঁজে পেতে চাই পর্দায়। তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কেবল অনলাইন প্লাটফর্মের লেখাগুলোতে, যার গভীরতা কম। মুহূর্তে পাঠক পড়ছে আবার মুছেও দিচ্ছে। মননশীল চিন্তাসম্পন্ন বাংলা সাহিত্য পাঠকপ্রিয়তা হারাচ্ছে। স্মার্ট রিলস বা ভিডিও দেখা এখনকার প্রজন্মের প্রমিত বাংলার ব্যবহার দিন দিন কমে আসছে।
বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে যখন বাংলা ভাষা দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তখন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতির স্বকীয়তা বজায় রাখা। পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপনে কথ্য ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে শুদ্ধভাবে এর চর্চাটা জরুরি। কেননা একটি ভাষার বিকাশ আর সমৃদ্ধি খানিকটা তার ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের উচিত যথাসম্ভব প্রমিত বাংলা ব্যবহারে উদ্যোগী হওয়া। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যে দেশের অভ্যুদয় তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল ৫২ সালে ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে। সেই মাতৃভাষার গুরুত্ব যেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকেÑ নাগরিক হিসেবে সেদিকে আমাদের নজর রাখা অবশ্য কর্তব্য।
মাহজাবিন আলমগীর
শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখক