অমর একুশে বইমেলা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫ এএম
মোদের গরব ভাস্কর্য, ঢাকা। ছবি: সংগৃহীত
তারিখ পেছানোর দাবি উপেক্ষা করে এক দিন পর অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’। কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত ঘিরে জনমনে যেমন কৌতূহল, তেমনি রয়েছে বিতর্ক। উল্লেখ্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় সৃজনশীল প্রকাশনাসহ মূলধারার প্রায় ৩৫০ সৃজনশীল প্রকাশকের ঈদের পরে মেলা আয়োজনের দাবি উপেক্ষা করে এই মেলার আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলা একাডেমি। কয়েক দফা তারিখ পেছানোর পর অবশেষে ২০ ফেব্রুয়ারি বাদ দিয়ে অমর একুশের দিন অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা আয়োজনের রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু এবার দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষিতে সরকার মেলার তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও প্রকাশকদের দাবি ছিল নির্বাচনের জন্য ৩-৪ দিন বন্ধ রেখে মেলা চালু রাখার।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ‘অমর একুশে বইমেলা’ কেবল একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়Ñ এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল প্রতীক। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিজুড়ে এই মেলা বাঙালির মননে নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়, লেখক-পাঠক-প্রকাশকের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। নতুনভাবে নির্ধারিত সময়ে বইমেলা হলে প্রকাশকরা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। আমরা চাই, প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার এই বইমেলা যেন পাঠকহীন, প্রশ্নবিদ্ধ ও নিয়মরক্ষার মেলায় পরিণত না হয়। তবে এবার সিংহভাগ প্রকাশক বাইরে রেখে বইমেলা আয়োজনের বিষয়ে কোনো দায় নিচ্ছে না বাংলা একাডেমি। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য সরকার ও প্রকাশকদের সিদ্ধান্তে মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে; তারা শুধু নির্দেশ পালন করছে।
জানা গেছে, এবার স্টল বরাদ্দের প্রকাশিত তালিকায় ২৯৯টি প্রকাশনীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ১৫০-এর বেশি বাপুসের সদস্য নন এবং তারা অপরিচিত প্রকাশনা সংস্থা। আর ৭০-এর বেশি প্রকাশক গত বইমেলায় অংশ নেননি এবং কেউ কেউ আগে কখনও বইমেলায় অংশ নেয়নি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের তথ্য মতে, এখনও বইমেলার দুই প্রাঙ্গণÑ বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে স্টল নির্মাণের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে। তার মানে ২১ তারিখের পরেও কাজ করা লাগবে। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। মেলা অনেক বড় ব্যাপারÑ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়। তবে আমরা এখনও অনুরোধ করব, বড় প্রকাশকরা যেন মেলায় আসেন। তারা না এলে মেলার সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হবে। অন্যদিকে ঈদের পর বইমেলা করার দাবিতে গঠিত সৃজনশীল প্রকাশকদের অস্থায়ী সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’ বলছেÑ রোজা ও ঈদ বাজারের কারণে প্রকাশকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিনিয়োগকৃত টাকাও তুলতে পারবে না। ফলে অনেক প্রকাশককে পথে বসতে হবে। এ পরিস্থিতিতে বইমেলাকে ঈদের পর আয়োজনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ৩২১ জন প্রকাশককে নিয়ে গঠিত ‘প্রকাশক ঐক্য’ প্রকাশনা শিল্প রক্ষায় রোজার ঈদের পরে মেলা আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার একুশে ফেব্রুয়ারি বইমেলার উদ্বোধন করবেন।
দাবির প্রাসঙ্গিকতা যাই হোক, আয়োজকদের সিদ্ধান্তÑ নির্ধারিত সময়েই ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরুÑ একটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। মহান ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত এদিনটিকে ঘিরেই বইমেলার ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। একুশ মানেই বই, বই মানেই একুশÑ এই আবেগ ও ইতিহাসকে অক্ষুণ্ন রাখার দায়ও কম নয়। সময় পেছালে হয়তো আয়োজনের কিছু সুবিধা বাড়ত, কিন্তু ঐতিহাসিক তাৎপর্যের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ার আশঙ্কাও থেকে যেত। এখন প্রশ্ন হলো, প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব কি না। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত শৌচাগার, প্রবেশ-প্রস্থান ব্যবস্থাপনা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রকাশকদের স্টল বরাদ্দ, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সুবিধা, বই পরিবহনের লজিস্টিক সহায়তাও সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে।
বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়; এটি মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লেখক ও প্রকাশকদের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা আমলে নেওয়া জরুরি। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ কিন্তু সহিংসতা বা ভীতির সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নিরাপদ ও উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। কাগজের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রণ ব্যয় ও বাজারের মন্দাভাব প্রকাশনা শিল্পকে চাপে ফেলেছে। নির্ধারিত সময়েই মেলা শুরু হলে প্রকাশকদের বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়। লেখকরাও নতুন বই প্রকাশের উপযুক্ত মঞ্চ পান। পাঠকের জন্য এটি সারা বছরের অপেক্ষার প্রাপ্তি।
আমরা মনে করি, তারিখ পেছানোর দাবি উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময়েই বইমেলা শুরুর সিদ্ধান্ত সাহসী হলেও তা দায়িত্ববোধের পরীক্ষাও বটে। ঐতিহ্য রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি জননিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রস্তুতি হয় যথাযথ ও সমন্বিত, তবে ২১ ফেব্রুয়ারির বইমেলা আবারও প্রমাণ করতে পারবেÑ বই ও সংস্কৃতির শক্তিই বাঙালির জাতিবৈশিষ্ট্যের মূলভিত্তি।