অমর একুশে
অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২০ এএম
শহিদ মিনার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যে আগ্রহ নিয়ে বাংলা ভাষাকে রক্ষার আন্দোলনে নেমেছিল বাঙালি জাতি, সেই আশা এখনও পূরণ হয়নি। যেদিন থেকে ভাষা আমাদের হলো তারপর থেকেই ভাষার প্রতি আমাদের দরদ কমে গেল। ভাষাকে আমরা এখন আর আপন মনে করি না। আমরা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছি কিন্তু ভাষাকে ছড়াতে পারিনি।
‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’Ñ ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর অতিক্রম করছি। বাংলা ভাষা বাঙালি জাতির অহংকার। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। পৃথিবীতে কোনো জাতিকে ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়নি।
বর্তমানে বাংলা ভাষা যেভাবে বিকৃত করা হচ্ছে, এতে মনে হয়Ñ আমরা ভুলে গেছি এই ভাষার নেপথ্যে আমাদের আন্দোলনের কথা। যে ভাষার জন্য আমাদের সূর্যসন্তানÑ সালাম, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকে শহিদ হয়েছেন। ওই ভাষার বিকৃতি চলছে নগ্নভাবে। আমরা বাংলা ভাষার জন্য গর্ববোধ করি। আবার বিকৃতির জন্যও খারাপ লাগে।
ভাষা অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাঙালি জাতি জীবন উৎসর্গ করে তা প্রমাণ করেছে। বর্তমান বিশ্বের সমৃদ্ধিশালী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অবস্থান চতুর্থ। বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা বাংলা। বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাৎপর্যপূর্ণ বাংলা ভাষাকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত দিয়েছে।
প্রতিনিয়ত ভাষায় যুক্ত হচ্ছে নানা বিচিত্রতা। এই বিচিত্রতা যে সব সময় সঠিক পথে চালিত হচ্ছে, তা বলা যাবে না। ইতিবাচক বিষয়ের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে নানা অসংগতিসহ ভাষা বিকৃতির বিভিন্ন ধরন। রক্তে কেনা বাংলা ভাষার এই বিকৃতি আজ আমাদের লজ্জায় ফেলেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ভাষাকে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা আঙ্গিকে। গণমাধ্যম, সিনেমা, নাটকে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।
গণমাধ্যম সমাজের দর্শন। কিন্তু গণমাধ্যমে ভাষার ব্যবহার লক্ষণীয়। কিছু দায়িত্বহীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে আপত্তি রয়েছে। শিশু-কিশোর যদি গণমাধ্যমের এই বিকৃত ভাষার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, তা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। গণমাধ্যমে যেমন আঞ্চলিক ভাষা চলে না, ঠিক তেমনি বিকৃত ভাষাও চলতে পারে না। অনেক সময় ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য উচ্চারণগত সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু ভাষা বিকৃতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ভাষা প্রায়ই না প্রমিত, না কোনো অঞ্চলের নির্দিষ্ট উপভাষা তা বোঝার কোনো উপায় নেই। এসব অনুষ্ঠানের রচয়িতা ও কুশীলবরা যে ভাষা ব্যবহার করেন, তা দর্শকের বোধগম্য নয়। টিভি সিরিয়ালগুলোর মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। এতে বিশেষ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বিদ্যমান। এসব আঞ্চলিক ভাষায় নাটক প্রচারিত হচ্ছে ও দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে। কিন্তু বাংলা, ইংরেজি, আঞ্চলিকতা একসঙ্গে মিলিয়ে যে জটিলতা তৈরি করে ভাষার বারোটা বাজানো হচ্ছে। নাটকে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াও শুদ্ধ ভাষাচর্চার অন্তরায়। বর্তমানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আলোকে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত সিরিয়ালগুলোয় এক অদ্ভুত ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে।
এফএম রেডিও চ্যানেলগুলো বাংলা ভাষাকে যেমন ইচ্ছা, তেমনভাবে ব্যবহার করছে। সেখানে ভাষা ব্যবহারের ভয়াবহতা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। কখনও ইংরেজি-বাংলা, কখনও হিন্দিÑ যে যেভাবে পারছেন বাংলা ভাষাকে টেনেহিঁচড়ে একাকার করে ফেলছেন। উচ্চারণের ক্ষেত্রে শোনা যায় নানা ধরনের ভঙ্গি।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক, রিকশার পেছনে লেখা, বাজার, ফুটপাত, যানবাহন ও বিলবোর্ডগুলো বানানের ভুল প্রয়োগ ও বিকৃতিতে ছেয়ে গেছে। এ-সংক্রান্ত গবেষণাতেও ভাষা বিকৃতির ভয়াবহ চিত্রের প্রমাণ মিলেছে। দিনের পর দিন এমন ভুল বানান দৃশ্যমান হলেও এগুলো নজরদারি করার মতো কেউ নেই।
ভাষাবিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে যত দাপুটে ভাষা আছে, এগুলোয় বানানের সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে নিয়ম রয়েছে। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম মেনে এ ধরনের ভুল সহজেই এড়ানো যায়। বিকৃত উচ্চারণে বাংলার সঙ্গে বিদেশি শব্দের মিশ্রণ করে কথা বলাটাকে অনেকে গৌরবের মনে করেন। এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যত্রতত্র বাংলা বানানে ভুল ভাষার জন্য অমর্যাদাকর।
আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বিশ্বদরবারে আমরা বাংলা ভাষার মাধ্যমেই পরিচিতি লাভ করেছি। কেবল তা নয়, বাংলাকে জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজেই বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে হলে আমাদের উচিত সবার সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধ করা। একই সঙ্গে আরেকটি দাবি করতেই পারি যে, শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে বছরজুড়ে বাংলার চর্চা চলুক।
পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই একমাত্র ঘটনা যে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য এত মানুষ প্রাণ দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার চেতনায় উজ্জীবিত হই। বাকি ১১ মাস ঘুম পাড়িয়ে রাখি মাতৃভাষার চেতনাকে। ভুলে যাই আমরা আমাদের অতীতের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতিকে।
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতার বিখ্যাত লাইন দুটি ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিল, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।’ মাতৃভাষা রক্ষার জন্য সন্তান রাজপথে নেমেছে আন্দোলনে। মা সন্তানকে চিঠি দিয়েছে বাড়ি ফেরার জন্য। কিন্তু সেই চিঠি বুক পকেটে নিয়ে ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছে ভাষা সংগ্রামীরা। শহীদ হওয়ার পর সন্তানের পকেটে পাওয়া যায় মায়ের চিঠি। লাল রক্তে ভিজে ছিঁড়ে গেছে। আমাদের ভাষাটা এমনি এমনিই আসেনি। এরকম নানা দুঃসহ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি আমাদের ভাষা।
মায়ের ভাষার বিকৃতি রোধে চাই পারিবারিক সচেতনতা। আপনার সন্তানকে যদি আপনি ভাষাকে সম্মান ও মর্যাদা দিতে শেখান, তাহলে বড় হয়ে সে মাতৃভাষাকে দূষিত করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি নিয়ে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
সেসব আন্দোলনে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ ছিল দেখার মতো। তবে কিছু কিছু আন্দোলনকারীর হাতে এমন কিছু প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে, যেগুলোয় অকথ্য ভাষায় সরকার বা প্রশাসনকে গালি দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কথায় আছেÑ যে কাজ বন্দুকের গুলি দিয়ে হয় না; সেই কাজ মুখের মিষ্টি কথায় হওয়া সম্ভব।
অহিদুর রহমান
পরিবেশ ও সমাজকর্মী