শুভ বড়দিন
রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ ০০:০০ এএম
পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ জন্মগ্রহণ করে বাঁচার জন্য; একমাত্র যিশু খ্রিস্ট জন্মেছিলেন মৃত্যুর জন্য। তাঁর সে মৃত্যু ছিল পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ঈশ্বরীয় যজ্ঞ। তার মাধ্যমে খ্রিস্ট ঈশ্বরের পবিত্রতা ও ন্যায্যতার দাবি ও মান পূর্ণ করেছেন। তাঁর আত্মদান মানুষের পাপমুক্তির জন্য সম্পূর্ণ, সর্বশ্রেষ্ঠ ও চূড়ান্ত মূল্য। পুরাতন নিয়মের ধারাবাহিকতার শেষ ভাববাদী বাপ্তাইজক যোহন যিশুকে লক্ষ করে বলেছিলেন, ‘ওই দেখো ঈশ্বরের মেষশাবক, যিনি জগতের পাপভার লইয়া যান।’ (যোহন লিখিত সুসমাচার ১:২৯)। পুরাতন নিয়মের সকল পশুবলি ও যাগযজ্ঞ খ্রিস্টের আত্মযজ্ঞের ছায়াস্বরূপ মাত্র, তার কোনো কিছুতেই মানবের পাপমুক্তি হয় না। তাই ঈশ্বর তাঁর প্রেমে আপন নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক পুত্রকে আমাদের পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে দান করলেন।
ছবি : সংগৃহীত
যিশু খ্রিস্ট জগতের সর্বকালের সকল মানুষের মধ্যে অনুপম। বলা প্রয়োজন যে, আমরা প্রতিটি মানুষ আমাদের জিনগত বিশ্লেষণে অন্য সকলের চেয়ে ভিন্ন বা পৃথক। কিন্তু যিশু খ্রিস্টের অনুপমত্ব ঐশিক বা পারমার্থিক সত্যে। তিনি স্রষ্টা ঈশ্বর সৃষ্টিরূপে সৃষ্টির পরিত্রাণের জন্য সৃষ্টির মধ্যে এলেন। তিনি সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়েও পাপী মানুষের পরিত্রাণের জন্য মানুষের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে শনাক্ত করলেন—একমাত্র পাপের বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠ টিকাকার পৌল লিখেছেন, ‘যিনি পাপ জানেন নাই, তাঁহাকে তিনি (অর্থাৎ ঈশ্বর) আমাদের পক্ষে পাপস্বরূপ করিলেন, যেন আমরা তাঁহাতে ঈশ্বরের ধার্মিকতাস্বরূপ হই।’ (২ করিন্থীয় ৫:২১)।
‘বড়দিন’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সমস্ত সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টা ও সার্বভৌম মঙ্গলময় ঈশ্বরের অনুগ্রহ ও প্রেমের কথা। শাশ্বত পিতা ঈশ্বরপুত্ররূপে তাঁর সৃষ্টিকে অনন্ত বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করে নিজের সঙ্গে তাকে সম্মিলিত করার জন্যই সৃষ্টির মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছেন। পবিত্র বাইবেল যে ঈশ্বরের কথা বলে, সে ঈশ্বর দার্শনিকের কিংবা কেবল বাণী প্রেরণের ঈশ্বর নন, কিন্তু তিনি স্রষ্টা ও রক্ষাকর্তা পিতা। মানুষের ইতিহাসে তিনি কাজ করেন। এ কারণেই খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসে পবিত্র ত্রিত্ত্ববাদের বিশ্বাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যিশু খ্রিস্ট কে? তিনি কী করেছেন? তাঁর শিক্ষা কী? এসব প্রশ্ন তাঁর অনুপমত্বের বিষয়ে একত্রে জড়িয়ে আছে। যিহুদিরা যিশুকে তাদের একজন ‘রব্বি’ বা ধর্মগুরু বা শিক্ষক বলেন। হিন্দুদের কাছে যিশু পরমেশ্বরের একজন অবতার। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ধর্মগুরু। খ্রিস্টে বিশ্বাসীদের কাছে তিনি ঈশ্বরের একজাত পুত্র, একমাত্র অবতার, পাপের দণ্ড থেকে মানুষের পরিত্রাণকর্তা, মৃত্যুঞ্জয়ী চিরঞ্জীব খ্রিস্ট। যোহন তাঁর রচিত সুসমাচারের আরম্ভে এ কথা লিখেছে, ‘আদিতে বাক্য ছিলেন, বাক্য ঈশ্বরের কাছে ছিলেন এবং বাক্য ঈশ্বর ছিলেন।’ সেই শাশ্বত বাক্য মানুষের আকারে-প্রকারে মানুষের পরিত্রাণের জন্য জগতে এসেছেন। তাঁর জন্ম , জীবনযাপন, তাঁর প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে কাজ প্রাকৃতিক বিশ্লেষণে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার কোনো কিছুই প্রাকৃতিক কোনো প্রক্রিয়ার আওতাধীন নয়। যোহন তাঁর সুসমাচার লিখেছিলেন ইফিষ নামক স্থান থেকে। স্থানটি তুরস্ক দেশের মধ্যে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ইফিষে বাস করতেন আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলে পরিচিত দার্শনিক হিরাক্লিটাস। হিরাক্লিটাস সবকিছুর, সব ঘটনার পেছনে দেখতে চাইতেন তার কারণ ও যুক্তি। তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ছিল, ‘কেন’। এই যুক্তি, কারণ, পরম কারণ বা চিন্তা বা মন, ইচ্ছা, শাশ্বত বাক্য ইত্যাদি বুঝাতে তিনি যে কথাটি ব্যবহার করেছেন গ্রিক ভাষায় তা হলো ‘লগোস’ বা বাক্য। চতুর্থ সুসমাচারের লেখক যিশুর সাক্ষাৎ শিষ্য যোহন যিশুকে ‘লগোস’ বলে তুলে ধরেছেন।
পুরাতন নিয়মে যিশুর জন্ম, শিক্ষা, কাজ, তাঁর মৃত্যু ও পুনরুত্থান ইত্যাদির বিষয়ে কমপক্ষে তিনশ ভাববাণী আছে। মূলত গোটা পুরাতন নিয়মই খ্রিস্টের প্রতি ইঙ্গিত করে। তিনি পুরাতন নিয়মকে পূর্ণ করেছেন। তাঁর অলৌকিক জন্ম, আশ্চর্য কাজ, অসাধারণ মৃত্যু, গৌরবদীপ্ত পুনরুত্থান ও স্বর্গারোহণ ইত্যাদি সবকিছুই তুলনাহীন। স্বর্গীয় দূত যে গাব্রিয়েল যিশুর জন্মের বিষয়ে মা কুমারী মরিয়মের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন সেই দূতই পাঁচশ বছর পূর্বে নবী দানিয়েলকে দর্শন দিয়ে তাঁরই মৃত্যুর কথা বলেছিলেন (দানিয়েল ৯:২৬)। ভাববাদীদের রাজপুত্র যিশাইয়ের ভাববাণীর মধ্যে ইসরায়েলের তথা মুক্তিদাতা খ্রিস্টের কথা কমপক্ষে চারটি গানের মধ্যে ব্যক্ত করা হয়েছে (যিশাইয় ৪২:১-৯; ৪৯:১-১৩; ৫০:৪-৯; ৫২:১৩-৫৩:১২)। সর্বশেষ গানটি, অর্থাৎ যিশাইয় ৫২:১৩-৫৩:১২ সম্পূর্ণ শাস্ত্রের মধ্যে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বাইবেলের পণ্ডিতদের কাছে ‘শব্দের জাদুকর’ বলে পরিচিত যিশাইয় নবী অপূর্ব সাহিত্যিক প্রতিভা ও রচনাশৈলীতে মানবমুক্তির বিষয়ে ঈশ্বরের অভিষিক্ত খ্রিস্টের অতুলনীয় আত্মদানের বিষয়টিকে ভাববাণীর মাধ্যমে চিত্রায়িত করেছেন। তাঁর সীমাহীন অপমান, লাঞ্ছনা ও নিগৃহীত হওয়ার অবস্থাকে ভাববাদী এভাবে বর্ণনা করলেন, ‘তাঁহার এমন রূপ কি শোভা নাই যে, তাঁহার প্রতি দৃষ্টি করি এবং এমন আকৃতি নাই যে তাঁহাকে ভালোবাসি। তিনি অবজ্ঞাত ও মনুষ্যদের ত্যাজ্য, ব্যথার পাত্র ও যাতনা পরিচিত হইলেন... তাঁহার ক্ষতসকল দ্বারা আমাদের আরোগ্য হইল। (যিশাইয় ৫৩:২-৫)
সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা ও সার্বভৌম প্রভু ও তাঁর সৃষ্ট মানুষের মধ্যে পাপের কারণে দুস্তর ব্যবধান। এ ব্যবধান ও বিচ্ছিন্নতা ঘুচানোর মূল্য অনেক বড়। একমাত্র প্রেমময় ঈশ্বরকেই সে মূল্য দিতে হবে। অন্য কারও সাধ্যে তা হয় না। তাই পিতা ঈশ্বর তাঁর একজাত পবিত্র পুত্রের ওপর আমাদের সকলের পাপ বর্তিয়েছেন। এমনকি খ্রিস্টের সেই ত্রাণদায়ী ক্রুশীয় মৃত্যুর ক্ষণে পিতা পুত্রকে পরিত্যাগও করলেন। ঈশ্বর থেকে ঈশ্বরের এ বিচ্ছিন্নতা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কঠিন, মর্মভেদী ও তাৎপর্যময় এক ঘটনা। জগতের জ্যোতি খ্রিস্টের সে মৃত্যুর সময়ে সূর্যও আলোরহিত হয়েছিল।
পুরাতন নিয়মে খ্রিস্টের জীবন ও কাজের বিষয়ে সেসব ভাববাণী আছে তার মধ্যে এই কয়েকটির সংগে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রাংশ উল্লেখ করছি মাত্র—আদিপুস্তক ৩:১৫; ইয়োব ১৯:২৫-২৬; গীতসংহিতা ১৬:১০, ২২; যিশাইয় ৭:১৪, ৯:৬-৭; ৫০:৪-৯; ৫৩ অধ্যায়; মীখা ৫:২; সখরীয় ১১:১২-১৩; ১৩:৭; দানিয়েল ৯:২৬)। পুরাতন নিয়ম খ্রিস্টের আগমনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে; নতুন নিয়মে সেই প্রত্যাশা ও ভাববাণী পূর্ণ হয়েছে। ইব্রীয়দের প্রতি পত্রের আরম্ভেই এ কথা এভাবে বলা হয়েছে, ‘ইনি তাঁহার (অর্থাৎ পিতা পরমেশ্বরের) প্রতাপের প্রভা ও তত্ত্বের মুদ্রাঙ্ক, এবং আপন পরাক্রমের বাক্যে ধারণকর্তা হইয়া পাপ ধৌত করিয়া ঊর্ধ্বলোকে মহিমার দক্ষিণে উপবিষ্ট হইলেন। (ইব্রীয় ১:৩)। অন্য কোনো মানুষের বিষয়ে কোথাও কখনও এমন কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়নি। তাঁর নিজের মৃত্যুর উপরে তাঁর ক্ষমতা ছিল। যোহন লিখেছে, ‘পিতা আমাকে এই জন্য প্রেম করেণ, কারণ আমি আপন প্রাণ সমর্পণ করি যেন পুনরায় তাহা গ্রহণ করি, কেহ আমা হইতে তাহা হরণ করে না, বরং আমা আপনা হইতেই তাহা সমর্পণ করি। তাহা সমর্পণ করিতে আমার ক্ষমতা আছে; এবং পুনরায় তাহা গ্রহণ করিতেও আমার ক্ষমতা আছে; এই আদেশ আমি আপন পিতা হইতে পাইয়াছি।’ (যোহন ১০:১৭-১৮)
মানবের পরিত্রাণার্থে পুত্র পিতার শ্রেষ্ঠ দানরূপে পুত্ররূপে মানুষরূপে জগতে আগমন করে মানবের ত্রাণকার্য সাধন করেন। সে কাজ সম্পূর্ণ করেছেন বলেই তিনি পিতার কাছে উপবিষ্ট হয়েছেন। তাইতো তিনি সমস্ত পরাক্রম, গৌরব ও মহিমায় মহিমান্বিত ও সবকিছুর ওপর রাজত্ব করার জন্য সুনির্দিষ্ট। খ্রিস্টই খ্রিস্টধর্ম। তাঁকে জানতেই এ ধর্মবিশ্বাসের মর্মবাণীকে জানা।
খ্রিস্টীয় মণ্ডলীতে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত বিশ্বাস-সূত্রগুলোর অন্যতম নাইসিন ক্রিড বা নিকীয় বিশ্বাসসূত্রে যথার্থই বলা আছে, ‘আমরা এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, যিনি স্বর্গ ও পৃথিবীর এবং দৃশ্য ও অদৃশ্য সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, সর্বশক্তিমান পিতা এবং এক প্রভু যিশু খ্রিস্টে, যিনি ঈশ্বরজাত পুত্র, সর্বযুগের পূর্বে পিতা হইতে জনিত, ঈশ্বরজাত ঈশ্বর, আলোকজাত আলোক, সত্য ঈশ্বরজাত সত্য ঈশ্বর, যিনি জনিত, সৃষ্ট নহেন, যাঁহার ও পিতার স্বত্ব অভিন্ন, যাঁহার দ্বারা সকল বস্তু সৃষ্ট। মানবের জন্য আমাদেরই পরিত্রাণের নিমিত্ত তিনি স্বর্গ হইতে অবতীর্ণ হইলেন, ও পবিত্র আত্মা দ্বারা কুমারী মরিয়মের গর্ভে দেহধারণ করিলেন ও মানব হইলেন। আমাদেরই জন্য পন্তীয় পীলাতের শাসনকালে তিনি ক্রুশবিদ্ধ হইলেন, দুঃখভোগ করিলেন ও সমাধিনিহিত হইলেন এবং শাস্ত্রানুসারে তৃতীয় দিবসে পুনরুত্থান করিলেন। পরে স্বর্গে আরোহণ করিলেন, তিনি পিতার দক্ষিণে বসিয়া আছেন এবং জীবিত ও মৃতদের বিচার করিতে সগৌরবে পুনরায় আসিবেন। তাঁহার রাজ্যের শেষ হইবে না।’ পিতা ঈশ্বর ও পুত্র ঈশ্বর একই স্বত্বাবিশিষ্ট, সমভাবে সদাকাল বিরাজিত। তিনি পিতা থেকে জাত, সৃষ্ট নন।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক গবেষণার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে পৃথিবীতে এযাবৎ ৬ বা ৭টি শিশুর জন্ম হয়েছে কুমারী মায়ের গর্ভে। ওইসব শিশুর সব কজনই ছিল কন্যাশিশু। কারণ তাদের মায়েদের জরায়ুতে ডিম্বাণুগুলো কোনো কারণে আপনা থেকেই উর্বর হয়ে কন্যাসন্তান জন্ম দিয়েছে, যেহেতু ওইসব ডিম্বাণু কোনা পুরুষের বীর্যের সাহায্যে উর্বর হয়নি। তাই কুমারী মরিয়মের গর্ভে যিশুর জন্ম হয়েছিল কারণ ঈশ্বরের পবিত্র আত্মার প্রভাবেই তা হয়েছিল, উল্লিখিত কন্যাশিশুদের মায়েদের বেলায় যেমন আপনা-আপনি ঘটেছিল তেমন নয়।
যিশুর প্রকাশ্য পরিচর্যাকাজের সবচেয়ে বড় একটা অংশ ছিল তাঁর নানাবিধ অলৌকিক কাজ। ওইসব অলৌকিক কাজ প্রাকৃতিক কোনো জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সবকিছুই ছিল ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে, এবং মানুষের উপকারের জন্য, কোনো চমক সৃষ্টির জন্য নয়, বরং তিনি যে ঈশ্বরপুত্র তার চিহ্নস্বরূপ। তাঁর ক্রুশীয় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রকৃতিরাজ্যে ঘটেছে অনেক অলৌকিক ঘটনা। তাঁর পুনরুত্থান ও তৎপরবর্তী শিষ্যদের সঙ্গে তাঁর দর্শন এবং তাঁর স্বর্গারোহণের ঘটনার সবকিছুই ছিল মানববুদ্ধি ও ব্যাখ্যার অতীত।
তাঁর অতি উত্তম চরিত্র, নৈতিকতা, মানুষের প্রতি নিস্বার্থ প্রেম ও ক্ষমার কারণে তিনি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাঁর কথা ও কাজ ছিল এক। ফিলিপীয় ২:৬-১১ “ঈশ্বরের স্বরূপবিশিষ্ট থাকিতে তিনি ঈশ্বরের সহিত সমান থাকা ধরিয়া লইবার বিষয় জ্ঞান করিলেন না, কিন্তু আপনাকে শূন্য করিলেন, দাসের রূপ ধারণ করিলেন, মনুষ্যদের সাদৃশ্যে জন্মিলেন; এবং আকার প্রকারে মনুষ্যবৎ প্রত্যক্ষ হইয়া আপনাকে অবনত করিলেন; মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি, ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত আজ্ঞাবহ হইলেন। এই কারণে ঈশ্বর তাঁহাকে অতিশয় উচ্চপদান্বিতও করিলেন, এবং তাঁহাকে সেই নাম দান করিলেন, যাহা সমুদয় নাম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; যেন যিশুর নামে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালনিবাসীদের সমুদয় জানু পাতিত হয়, এবং সমুদয় জিহ্ব যেন স্বীকার করে যে, যিশুখ্রিস্টই প্রভু, এইরূপে পিতা ঈশ্বর যেন মহিমান্বিত হন।’
যিশু সম্পূর্ণ মানবীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে জগতে এসেছিলেন। কুমারী মরিয়ম পবিত্র আত্মার প্রভাবে তাঁকে গর্ভে ধারণ করেছেন; কিন্তু তাঁর ভূমিষ্ঠ হওয়া ছিল অন্য সব শিশুর মতোই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে। মানুষ হিসেবে অন্য সকলের মতোই তাঁর দৈহিক বা শারীরিক চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা ছিল। তবে তিনি পরীক্ষিত হলেও সব পরীক্ষা-প্রলোভনের ওপরে জয়লাভ করেছেন। মথি ৪, লূক ৪, মথি ১৬:২১-২৩; লুক ২২:৪২; যোহন ৮:৪৬; রোমীয় ৮:৩; ফিলিপীয় ২:৭; ইব্রীয় ২:৮-১৮; ৪:১৫— সকল শাস্ত্রাংশে আমরা এ বিষয়েই শিক্ষা পাই। যিশু খ্রিস্টের মধ্যে মানবস্বভাব ও ঐশ্বরিক স্বভাব একই ব্যক্তিসত্তায় সমভাবে বিরাজিত ছিল। ঈশ্বর অমর, তাই তাঁকে মানবরূপে আসতে হলো যেন তিনি মারা যেতে পারেন এবং তার মধ্য দিয়ে পাপের ফল যে মৃত্যু তা দেখাতে পারেন। একই সাথে মানুষের পাপের দণ্ডও যেন তিনি বহন করতে পারেন। আর মৃত্যু না হলে পুনরুত্থানের প্রশ্নও আসে না। মৃত্যুর ওপর তাঁর বিজয়ের মাধ্যমে তাঁর ঈশ্বরত্ব প্রমাণিত হয়েছে; এবং তার কারণেই মানুষ বিশ্বাসহেতু পবিত্র ঈশ্বরের কাছে ধার্মিক বলে গণিত হতে পারে।
যিশু খ্রিস্ট অনুপম। আমাদের কোনো ভাষা, শব্দ, কি রচনায় তাঁর বিষয়ে যথেষ্ট বলা সম্ভব নয়। ঈশ্বরের কথা প্রকাশ করার জন্য আমাদের সব চেষ্টাই ঠুনকো। তাই অকৃত্রিম বিশ্বাসেই আমরা তাঁর কাছে আমাদের মাথা নত করি। তাঁর পবিত্র জীবন-চরিত্র, মানুষের জন্য তাঁর স্বর্গীয় প্রেম ও আত্মদানের কাজ, তাঁর উন্নত শিক্ষা, তাঁর ক্ষমা ও শান্তির কোনো তুলনা নাই। তিনি বলেছেন, তিনি এসেছেন যেন মানুষ প্রকৃত ও পরিপূর্ণ জীবন পায়। জগতে অনেক ধর্ম্মমত এসেছে, হয়তো আরও আসবে। আছে আচার-অনুষ্ঠান, ব্যবস্থা-বিধান ও আরও অনেক পথ ও মত। কিন্তু যিশু খ্রিস্টই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মানুষের সামগ্রিক মুক্তির জন্য তাঁর নিষ্পাপ জীবন স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি কে, কী-ই বা তাঁর কাজ ও তাঁর শিক্ষা বা বক্তব্য—তার সবকিছুই একই সূত্রে গাঁথা, একটি থেকে অন্য কোনোটি পৃথক করে দেখা যায় না। এ কারণেই আমরা দেখি যে, মসির মাধ্যমে দেওয়া ঈশ্বরের ব্যবস্থা তিনিই সম্পূর্ণরূপে ও সার্থকরূপে পালন করেছেন। তাই পৌল এ কথা বলেছেন, ‘প্রত্যেক বিশ্বাসীর পক্ষে খ্রিস্টই ব্যবস্থার পরিণাম।’ (রোমীয় ১০:৪)
খ্রিস্ট পুরাতন নিয়মের বিধিমালার মসিহমূলক ব্যাখ্যা করে তাকে পূর্ণ করেছেন। পর্বতে দত্ত তাঁর উপদেশের মধ্যে আমরা দেখতে পাই : ব্যবস্থা বলেছে, নরহত্যা করিও না, চুরি করিও না, ব্যভিচার করিও না, ইত্যাদি। যিশু বলেছেন, আমরা যেন আমাদের মনে ওইসব বিষয়ের চিন্তাও না করি। যিশু প্রাধান্য দিয়েছেন অন্তর বা মনের ওপর, দৃশ্যত কাজের ওপর নয়। জগৎ ও জীবনের বিষয়ে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তা-চেতনা, একেবারেই বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন তথা নতুন এক জন্মের কথা ছিল যিশুর। মানুষের জীবনকে একটু উন্নত বা সংস্কার বা কেবল নৈতিকভাবে জাগিয়ে তোলার বিষয়েই তাঁর উদ্দেশ্য সীমিত নয়। তিনি আহ্বান করেছেন ঈশ্বরের দিকে যেন সব মানুষ ফিরে আসে। তার ফল হবে এই যে, মানুষ সৃষ্টির সবকিছুই ঈশ্বরের চোখ দিয়ে দেখতে পারবে, ও তাঁর পবিত্র প্রেমে তাকে ব্যবহার করতেও পারবে।
যিশুর সঙ্গে বিরোধ ছিল আত্মধার্ম্মিক লোকদের। মানুষের আত্মধার্মিকতা ও আচারসর্বস্ব ধর্মকর্মের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সর্বদা সোচ্চার (বিশেষ করে দেখা যায় মথি ২৩ অধ্যায়ে)। ওই প্রকার ধর্মকর্মের প্রাধান্য বাইবেলের কোথাও নাই, যদি তার মধ্যে ঈশ্বরকে ভালোবাসার সঙ্গে মানুষের প্রতি ভালোবাসার কাজ না থাকে। তাঁর কাছে বেশি মূল্য প্রথামাফিক ধর্মকর্মের চেয়ে মানুষের জীবনের।
সুসমাচারগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়েই বর্ণনা করা হয়েছে যিশুর মৃত্যুর বিষয়ে। কোনো তাৎপর্য ছাড়া তো তা করা হয়নি। ধার্মিক খ্রিস্টের মৃত্যুতে পাপীর জীবন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানবসমাজে সবচেয়ে বড় আত্মিক বিপ্লবের সূত্রপাত করেছিলেন।
হঠাৎ করেই যিশু এ জগতে আসেননি। ‘কালের পূর্ণতায়’ (গালাতীয় ঈশ্বরের পরিকল্পনা অনুসারেই পিতা পুত্রকে পাঠিয়েছেন। সমস্ত জাতি ও সভ্যতার মধ্যে এক আত্মিক বন্ধ্যত্ব, রাজনৈতিক, সামাজিক, কৃষ্টিগত, ধর্মীয়ভাবে সবকিছুর মধ্যে খ্রিস্টের আগমনের জন্য পথ প্রস্তুত হয়েছিল। সমস্ত যিহুদি কি শমরীয় সমাজে ধিকৃত সেই শমরীয় স্ত্রীলোকটিও বুঝতে পেরেছিলেন যে যিশুই ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞাত খ্রিস্ট যোহন ৪:২৯)। পাপের কারণে মানুষের এমন কিছুই নাই যার বলে সে পবিত্র ও ধর্মময় ঈশ্বরের সামনে নির্দোষ বলে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু তার সবই আছে যার ফলে সে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যেতে পারে। তাই খ্রিস্ট এলেন মানুষ যেন ঈশ্বরের সঙ্গে সম্মিলিত হতে পারে, সম্মিলিত হতে পারে মানুষেরও সঙ্গে। খ্রিস্টকে বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে মানুষের জন্য খ্রিস্টের প্রয়োজনীয়তাকে।
লেখক : খ্রিস্টীয় ঈশ্বরতত্ত্বের শিক্ষক, বিশ্ব চার্চ পরিষদের আন্তর্ধর্মীয় সংলাপ বিভাগ, ওয়ার্ক গ্রুপের সাবেক সদস্য