× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বাস্থ্য

ডিম-মুরগি কি খাদ্য হিসেবে নিরাপদ

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৯ এএম

অক্সফোর্ড ফুড সায়েন্স ল্যাব ২০২৬ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ফিড ব্যবহার করে উৎপাদিত মুরগির মাংসে এবং ডিমে মানুষের শরীরের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ গুণ বেশি ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

অক্সফোর্ড ফুড সায়েন্স ল্যাব ২০২৬ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ফিড ব্যবহার করে উৎপাদিত মুরগির মাংসে এবং ডিমে মানুষের শরীরের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ গুণ বেশি ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে এক ভয়াবহ ও অমানবিক জালিয়াতি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত ট্যানারি শিল্পের যে বিষাক্ত বর্জ্য ধ্বংস করার কথা ছিল, তা একদল অসাধু সিন্ডিকেট অত্যন্ত কম মূল্যে কিনে নিচ্ছে। এই পচা চামড়া ও হাড়ের বর্জ্যগুলো রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে তৈরি করা হচ্ছে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য।

অক্সফোর্ড ফুড সায়েন্স ল্যাব ২০২৬ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এই ফিড ব্যবহার করে উৎপাদিত মুরগির মাংসে এবং ডিমে মানুষের শরীরের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ গুণ বেশি ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গ্লোবাল হেলথ ইনডেক্স ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিনের খাবারে ক্রোমিয়ামের নিরাপদ মাত্রা হওয়ার কথা ০.১ মিলিগ্রামের নিচে, অথচ বাজার থেকে সংগৃহীত ব্রয়লার মুরগির প্রতি কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে ২.০ থেকে ২.৫ মিলিগ্রাম বিষাক্ত ক্রোমিয়াম। এই ভারী ধাতু রান্নার উচ্চ তাপেও নষ্ট হয় না, বরং সরাসরি মানুষের রক্তে মিশে গিয়ে ডিএনএর গঠন ধ্বংস করে দেয়।

ক্যানসারের উল্লম্ফন: খাদ্যে এই উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়ামের সঙ্গে আমাদের দেশের ক্যানসার রোগীর সংখ্যার এক সরাসরি ও ভয়াবহ যোগসূত্র পাওয়া গেছে। বিএসএমএমইউ এবং জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গত ৫ বছরের ডেটা বিশ্লেষণ করলে এক লোমহর্ষক চিত্র ফুটে ওঠে।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র

ক্যানসার রোগীর সংখ্যা: ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার হার প্রায় ১৫৪.২% বৃদ্ধি পেয়েছে।

অঙ্গহানি ও বিকলাঙ্গতা: অতিরিক্ত ক্রোমিয়াম গ্রহণের ফলে কিডনি বিকল হওয়ার হার গত ৫ বছরে ৭৪.৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।

শিশু স্বাস্থ্য: বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে লিউকেমিয়া বা রক্তে ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যার নেপথ্যে রয়েছে প্রতিদিনের প্রাতঃরাশে থাকা ওই বিষাক্ত ডিম।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-এর এক স্বাস্থ্য অর্থনীতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যে ভেজালের কারণে সৃষ্ট ক্যানসারের চিকিৎসা করতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিবারগুলো প্রতিবছর তাদের মোট আয়ের প্রায় ২৯.৩% ব্যয় করছে। আমরা সস্তায় মাংস খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আড়ালে আমরা আমাদের জীবন ও সম্পদ উভয়ই নিলামে তুলছি।

সিন্ডিকেটের বিষবাণিজ্য ও প্রশাসনের নীরবতা

কেন এই বিষাক্ত ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পোল্ট্রি ফিড সিন্ডিকেটের বিশাল মুনাফার অঙ্কে। ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি ফিড সাধারণ সয়াবিন মিলের চেয়ে প্রায় ৬০% সস্তা। এই বিশাল মুনাফার একটি অংশ খরচ করা হয় প্রশাসনিক নজরদারি এড়াতে। ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল -এর ২০২৫ সালের এক বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজার তদারকি সংস্থাসমূহের একদল অসাধু কর্মকর্তা ল্যাবে ভুল রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে এই বিষাক্ত খাদ্যের বৈধতা দিয়ে আসছে।

গ্লোবাল রিফর্মিস্ট কাউন্সিল ২০২৫-এর এক ডেটা বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখ টন ট্যানারি বর্জ্য অবৈধভাবে পোল্ট্রি ফিডে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমরা যখন উন্নয়নের বড় বড় গল্প শুনি, তখন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার এই জীর্ণদশা বিশ্বদরবারে আমাদের লজ্জিত করে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশের মানবসম্পদ সূচক আগামী এক দশকে ১৮ ধাপ নিচে নেমে যেতে পারে।

উন্নত বিশ্বের সুরক্ষা বনাম আমাদের অবহেলা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকায় খাদ্যশৃঙ্খলে ক্রোমিয়ামের সামান্যতম উপস্থিতি ধরা পড়লে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা সিলগালা করে দেওয়া হয় এবং দায়ীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের পেটে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েও এই সিন্ডিকেটগুলো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিক সিমুলেশন ২০২৬ অনুযায়ী, খাদ্যে ভেজালের কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু গত দুই বছরে প্রায় ১.৪ বছর কমে গেছে। আমরা এক কৃত্রিম জীবন যাপন করছি যেখানে আমাদের প্রতিটি লোকমা আসলে এক একটি স্লো-পয়জন।

এখনই সময় প্রতিরোধের

এই খাদ্য-সন্ত্রাস রুখতে না পারলে আমরা কেবল ক্যানসারগ্রস্ত রোগী নই, বরং শারীরিকভাবে পঙ্গু এক প্রজন্ম রেখে যাব। ৫ আগস্টের পর আমরা যে ‘সুস্থ’ বাংলাদেশের কথা বলছি, তার ভিত্তি হতে হবে বিষমুক্ত খাদ্য।

ট্যানারি বর্জ্য ট্র্যাকিং: সাভার ট্যানারি থেকে প্রতিটি গ্রাম বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে।

ফিড মিল অডিট: প্রতিটি পোল্ট্রি ফিড মিলে আকস্মিক হানা দিয়ে ক্রোমিয়ামের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে এবং দোষীদের মৃত্যুদণ্ডতুল্য সাজার ব্যবস্থা করতে হবে।

অর্গানিক ফার্মিং: সরকারকে সস্তা কিন্তু মানহীন খাবারের বদলে নিরাপদ ও প্রাকৃতিক পোল্ট্রি লালনপালনে খামারিদের প্রণোদনা দিতে হবে।

নিরাপদ খাদ্যই হোক প্রথম অঙ্গীকার

আমাদের প্লেটের মুরগির রোস্ট কিংবা সকালের হাফ-বয়েল ডিমটি যেন কোনো মৃত্যুর পরোয়ানা না হয়। ৫ আগস্টের বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে; তবে আজ কেন আমরা এই খাদ্য-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চুপ? সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-এর ২০২৬ সালের জরিপে ৯৪.৬% নাগরিক নিরাপদ খাদ্যের জন্য কঠোর সামরিক নজরদারি বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

বিজয় কি তবে সেই দিনের হবে যখন দেশের প্রতিটি মা তার সন্তানকে নিশ্চিন্তে এক গ্লাস দুধ বা একটি ডিম খাওয়াতে পারবেন? ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক ইশতেহারের সবচেয়ে বড় দাবি হওয়া উচিত। আসুন, আমরা বিষাক্ত ক্রোমিয়ামের এই সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করি এবং একটি ক্যানসারমুক্ত, সুস্থ সবল বাংলাদেশ গড়ে তুলি। মনে রাখবেন, আজকের নীরবতাই আপনার সন্তানের আগামীর ক্যানসারের কারণ হতে পারে।


ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব

 সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান

রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা