চতুর্মুখী অর্থনৈতিক চাপ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৭ এএম
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে। প্রবল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সংস্কারের চাপ মাথায় নিয়েই আজ দলটির নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন সরকারকে দেশের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। দলটির সামনে সংবিধান সংশোধনসহ দেশের সর্বময় ক্ষমতা পরিচালনা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ম্যান্ডেট রয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, স্থবির বিনিয়োগ, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই চতুর্মুখী চাপের মুখে দায়িত্ব নেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবুও সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনার বীজ থাকেÑ এখন প্রয়োজন সঠিক নীতি, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদিও দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান ও রাজস্ব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রথম দিন থেকেই ওই চতুর্মুখী অর্থনৈতিক সংকট বিএনপি সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, গত দেড় বছরে অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলার অবনতি,
বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব, শ্রমিক ছাঁটাই, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া,
তৈরি পোশাক শিল্পে নৈরাজ্য ও স্থবিরতা দেশকে এক ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে
দিয়েছে। বিদেশিদের সঙ্গে এমন অনেক কেনাকাটা ও বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে সে সম্পর্কে
জনগণ অন্ধকারে রয়েছে। এমনকি বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের মতো বড় সিদ্ধান্ত
নিয়েও জনগণকে জানানো হয়নি। এসবের দায়ও টানতে হবে নতুন সরকারকে। তারা বলছেন,
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে অর্থনীতি যে
সংকটে পড়েছে, তা থেকে দেশকে দ্রুত বের করে আনতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকার গঠন করতে যাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে রাষ্ট্র
পরিচালনার পরিকল্পনায় অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন,
যে সরকার গঠিত হতে চলেছে,
তা নিছক এক সরকার থেকে আরেক সরকারে পরিবর্তন নয়। মাঝে দেড় বছরের বেশি সময় ছিল অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার, যারা নির্বাচিত সরকার নয়। ফলে তাদের নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের
বিষয়গুলো সেভাবে দেখার সুযোগ হয়নি। এই ধরনের আপদকালীন সরকার দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায়
থাকায় সদ্য সরকার উত্তরাধিকার
সূত্রে যে অর্থনীতি পেয়েছে তা আক্ষরিক অর্থেই এক ধরনের ধ্বংসস্তূপ। সহজ করে বললে,
দেশের অর্থনীতি কার্যত এক গভীর খাদে। তাই
নতুন সরকারের চলার পথটা মোটেই সহজ হচ্ছে না।
ভুলে গেলে চলবে
না, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধাক্কা এখনও কাটেনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক
বারবার সতর্ক করে আসছেÑ উচ্চ সুদহার, জ্বালানি দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি। আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় বাংলাদেশে এর প্রভাব
আরও প্রকট। ডলার সংকট ও রিজার্ভের চাপে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব
পড়ছে দেশের শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা বাজারে।
এ কথা সত্য যে,
মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি
ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে চাপে ফেলেছে। তাই
কেবল বাজার তদারকি নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার ও কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা বাড়ানো জরুরি।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে এই চাপ
কমবে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য
নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে নতুন সরকারের প্রতি জন-আস্থা কমবে।
ব্যাকিং খাতের
দুর্বলতা অর্থনীতিকে অস্থির করছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, সুশাসনের অভাব এবং তারল্য
সংকট বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আর্থিক খাতে কাঠামোগত
সংস্কার প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদি
স্থিতিশীলতা আসবে না।
অন্যদিকে কর্মসংস্থান
ও বিনিয়োগ স্থবিরতা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতায়
দেশের বহু শিল্প-প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক লাখ
লোক কর্মহীন হয়েছে। সে কারণে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নীতি-স্থিতিশীলতা ও আইনের
শাসনের নিশ্চয়তা চান। দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট হলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতি
যদি না কমানো যায়, তবে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসবে না। রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের
বিষয়ও। এসব বিবেচনায় রেখে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ
গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের করণীয় স্পষ্ট।
প্রথমত, বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয়সংযম নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর-জিডিপি
অনুপাত বাড়াতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন, যাতে রাজস্ব আহরণ টেকসই হয়। তৃতীয়ত, দুর্নীতির
বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবেÑ এটি শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও
পূর্বশর্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জন-আস্থা পুনর্গঠন। অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতা হবে ভবিষ্যৎ সাফল্যের চাবিকাঠি। এখন সুপরিকল্পিত নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশল এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে এই সংকটই হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত উদ্যোগের। আমরা বলব, দেশের অর্থ খাতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমরা বিশ্বাস করি, কার্যকর সংস্কার ও দায়িত্বশীল নীতির মাধ্যমেই দেশের অর্থ খাতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।