তৃতীয় লিঙ্গ
মতিলাল দেব রায়
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৬ এএম
সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু ঠিকভাবে চিনি না। যাদের সাধারণত উপস্থিতি আমাদের উৎসব-আনন্দে। রাস্তাঘাটে, বাসস্ট্যান্ডে, ট্রেনের কামরায় কিংবা কোনো নবজাতকের আনন্দঘন মুহূর্তে হঠাৎ করেই তাদের দেখা মেলে। আবার জন্ম-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেও। তবুও তারা থেকে যান প্রান্তিক, উপেক্ষিত, অবহেলিত। রঙিন শাড়ি, হাততালি, এক ধরনের স্বতন্ত্র ভঙ্গি। আমরা চোখ ফিরিয়ে নেই, কেউ বিরক্ত হই, কেউ হাসি, কেউ ভয় পাই। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবি এই মানুষগুলো কারা? কেন তাদের জীবন এমন? তারা কি এই সমাজের বাইরে?
এদের পরিচয় এরা
‘হিজড়া’ সম্প্রদায়। সাংবিধানিক সংজ্ঞায় এদের পরিচয় তৃতীয় লিঙ্গের লোক। বাংলাদেশের সবচেয়ে
প্রাচীন অথচ অবহেলিত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, হিজড়া সম্প্রদায়ের
ইতিহাস এই ভূখণ্ডের ইতিহাসেরই অংশ। তারা বহিরাগত নয়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও উপমহাদেশীয়
সংস্কৃতিতে তৃতীয় লিঙ্গের অস্তিত্ব স্বীকৃত ছিল। ধর্মীয় গ্রন্থ, লোককথা, রাজকীয় ইতিহাস সবখানেই তাদের উপস্থিতি ছিল। মোগল আমলে হিজড়ারা রাজদরবারে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক
দায়িত্ব পালন করতেন। রাজপরিবারের নিরাপত্তা, হারেম ব্যবস্থাপনা এমনকি প্রশাসনিক কাজেও
তাদের ওপর আস্থা রাখা হতো। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন সেই ধারাবাহিকতায় একটা কালো
দাগ এঁকে দেয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ঔপনিবেশিক শাসকরা হিজড়া সম্প্রদায়কে ‘অস্বাভাবিক’ ও
‘সমাজের জন্য বিপজ্জনক’ আখ্যা দেয়। জানা যায়, ১৮৭১ সালের ‘ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট’-এর
মাধ্যমে হিজড়া সম্প্রদায়কে কার্যত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ তাদের জীবনযাপন,
চলাফেরা এমনকি পরিচয়কেও অপরাধ বানানো হয়। ১৯৫২ সালে ৩১ আগস্ট এই বৈষম্যমূলক আইনটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয় এবং
ওই দিনটি ‘বিমুক্তি দিবস’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাত দশকের বেশি সময় আইনটি বাতিল
হলেও তার সামাজিক প্রভাব আজও রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক ঘৃণা উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করছে
আমাদের সমাজ। ফলে আজও তাদের জীবন এক অবিরাম সংগ্রামের নাম।
হিজড়া জীবনের
সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ের শুরুটা পরিবার থেকেই। তারা জন্ম নেয় সাধারণ মা-বাবার ঘরেইÑ
মা-বাবার স্বপ্ন এবং নিকটজনদের স্নেহ-ভালোবাসা নিয়ে। কিন্তু শিশুকালেই যখন তাদের আচরণ
বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য সমাজের তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ ছকের সঙ্গে মেলে না, তখনই শুরু হয়
অবহেলা, তিরস্কার, কখনও নির্যাতন। হিজড়ারা সাধারণত শিশু-স্কুলে টিকতে পারে না। সহপাঠীদের
হাসি, শিক্ষকদের অবজ্ঞা, অভিভাবকদের ভয়Ñ সব মিলিয়ে শিক্ষা থেকে তারা ঝরে পড়ে। বাবা-মায়ের
ভালোবাসা অনেক সময় সামাজিক ভয়ের কাছে হার মানে। একসময় পরিবার ও আপনজন মুখ ফিরিয়ে নেয়।
ফলে স্বেচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়েই এক পর্যায়ে তারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। এভাবেই তারা আশ্রয়
নেন হিজড়া গুরুমা ও দেরার ছায়ায়। কিন্তু বাস্তবে বাবা-মা এবং পরিবার হারানো মানুষের
বুকে যে শূন্যতা, তা কোনো ‘দেরা’ কখনো পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না।
হিজড়া সম্প্রদায়ের
নিজস্ব সামাজিক কাঠামো রয়েছে গুরু-চেলা সম্পর্ক, দেরা সংস্কৃতি। সমাজ যখন তাদের জায়গা
দেয় না, তখন এই কাঠামোই হয়ে ওঠে বাঁচার অবলম্বন। এখানে তারা নিরাপত্তা পায়, পরিচয় পায়,
সম্মিলিত জীবনের শক্তি পায়। তবে এই জীবনও কষ্টমুক্ত নয়। দেরার নিয়ম কঠোর, অর্থ উপার্জনের
চাপ প্রবল। অধিকাংশ হিজড়া বাধ্য হন ভিক্ষা, নাচ-গান বা চাঁদা তোলার মতো পেশায়। সমাজ
তাদের জন্য সম্মানজনক কর্মক্ষেত্র তৈরি না করায় এই পেশাগুলোই হয়ে ওঠে জীবিকার শেষ ভরসা।
অথচ এই পেশার জন্যই সমাজ আবার তাদের ঘৃণা করেÑ যেন এক নির্মম দ্বিচারিতা।
বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল দেশেই কিছু বিচিত্র ও অস্বাভাবিক মানুষের পরিচয় পাওয়া
যায়। তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। আমাদের দেশে থার্ড জেন্ডার, তৃতীয় লিঙ্গ, হিজড়া
কেউ বা ট্রেন জেন্ডার বলে থাকেন। কিছু দিন যাবত তাদের নিয়ে দেশে কথাবার্তা চলছে। পরিসংখ্যান
বলছে, আমাদের দেশে এদের সংখ্যা প্রায় ১২৯২৬ জন। ভাবতে অবাক লাগে এরা এদেশের কারো না
কারোর সন্তান। তারা কোন কোন না কোন মাতৃগর্ভে জন্মেছে। মাতৃগর্ভে জন্ম নেওয়া অনেক প্রতিবন্ধি
সন্তান। যেমন এক হাত নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু, দুই পা নিয়ে অন্ধ জন্মানো শিশু, যমজ দুইজন
শিশুর জোড়া লাগানো মাথা নিয়ে জন্মায় তাদেরকে প্রতিবন্ধি হিসাবে দেশের সমাজ মেনে নেওয়া
হয়। কিন্তু হিজড়া সম্প্রদায়ের ব্যাপারটা সেভাবে দেখা হয় না। কেবল আমেরিকাতে প্রায় ১.৮ মিলিয়ন ট্রান্স জেন্ডার মানুষ আছে। বিশ্বের
প্রায় ২% মানুষ তৃতীয় লিঙ্গের বা ট্রান্স জেন্ডার। কিছু ক্ষেত্রে, তৃতীয় লিঙ্গের ধারণাটি
আন্তঃলিঙ্গ ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাদের ক্রোমোজোম, হরমোন বা যৌনাঙ্গে এমন
পার্থক্য থাকে যা প্রচলিত পুরুষ বা নারী সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি মেলে না। অনেক তৃতীয়
লিঙ্গের মানুষ সার্জারির মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকেন
অর্থাৎ জন্মের সময় তার লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারিত হয়েছিল তা তারা সার্জারির মাধ্যমে পরিবর্তন
করতে আগ্রহী। বিশেষ করে জন্ম নেওয়া সন্তানের লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যটা ছেলের মতোও নয়, মেয়ের
মতোও নয়, তাহলে সমস্যা।
আসলে বাংলাদেশে বিভিন্ন পরিবার থেকে আসা এমন ব্যক্তিরাই সঙ্গবদ্ধ হয়ে একটি আলাদা
হিজড়া সমাজ গড়ে তুলেছে। এই অসাম্প্রাদায়িক হিজড়া সমাজে সবার সমান অধিকার রয়েছে। তবে
এ কথা সত্যি, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী বা গুপ্ত
লিঙ্গের ব্যক্তিকে চিকিৎসা এবং পারিবারিকভাবে পুনর্বাসন করে স্বাভাবিক জীবনে ধরে রাখার
চেষ্টা করা হয়ে থাকে। কিন্তু নিম্নবিত্তের প্রায় সকল জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধীরা হিজড়া
দলে আসতে বাধ্য হয়।একটি পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয় এবং লিঙ্গ পরিচয় চিহ্নিত হয় তখন থেকেই বৈষ্যমের শিকার হয়।
বাংলাদেশের অনেক বাবা-মা তাদের গুপ্ত লিঙ্গের সন্তানকে হিজড়া ভেবে হিজড়া পল্লিতে
দিয়ে আসেন। অত্যন্ত দুঃখের কথা এই যে বেশিরভাগ পরিবারে হিজড়া সন্তানরা সহানুভুতি পায়
না। গুপ্ত লিঙ্গের কারণে এ ধরনের ব্যক্তিরা যৌন জীবন সমাজ ও পরিবারের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক।
আর এই কারণেই তারা পরিবারের ও সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিভাবেই পরিবারের সাথে
এদের দূরত্ব তৈরি হয়। এমনকি তারা হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ। এসব সামাজিক অসঙ্গতির কারণে অনেকে
স্বেচ্ছায় হিজড়া দলে চলে আসে। সমাজ যে চোখেই দেখুক না কেনো, ধর্ম যেভাবেই উপলব্ধি করুক,
মানুষ হিসেবে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এ
দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না!
শত বঞ্চনার পরও
তারা আশার আলো দেখে ২০১৩ সালে। সেবার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীকে
‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যা ছিল নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, ঐতিহাসিক
সিদ্ধান্ত। তখন থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টে ‘হিজড়া’ পরিচয়ের সুযোগ তৈরি হয়। সরকারের
উদ্যোগে তাদের জন্য কয়েকটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও চালু করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ ওই স্বীকৃতি ও সহযোগিতা এখনও
অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। আইনের স্বীকৃতি আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, হাসপাতালÑ প্রায় সর্বত্রই তারা বৈষম্যের শিকার। অনেক
সময় সরকারি কর্মকর্তারাও তাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করেন। সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে
কিন্তু তা কাগজে এবং জীবনে নয়। কর্মক্ষেত্রে হিজড়া মানুষ চাকরি পান না। বিশ্লেষকরা
বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যদি সামাজিক স্বীকৃতিতে রূপ না নেয়, তবে তা কেবল ফাইলবন্দি
অগ্রগতি হয়েই থাকে।
হিজড়া সম্প্রদায়ের
স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ। নিরাপদ চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, হরমোন থেরাপিÑ এসব
বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা প্রায় নেই বললেই চলে। অনেকে অনিরাপদ পদ্ধতিতে শরীর পরিবর্তনের
চেষ্টা করেন, যার ফলে গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। তাদের মানসিক যন্ত্রণা আরও গভীর।
অপমান, প্রত্যাখ্যান, একাকিত্বÑ এই তিনটি যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। আত্মহত্যার প্রবণতা
হিজড়া সম্প্রদায়ের মধ্যে তুলনামূলক বেশি, যা আমাদের সমাজের ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি।
আমাদের সমাজ ধর্মপ্রাণ।
অথচ ধর্মের মূল শিক্ষাÑ মানুষের মর্যাদা। সেটিই আমরা তাদের ক্ষেত্রে ভুলে যাই। হিজড়া
মানুষও স্রষ্টার সৃষ্টি। তবু ধর্মের নামে, সংস্কৃতির নামে আমরা তাদের দূরে ঠেলে দেই
কেন? বলা যায়, অদ্ভুত এক দ্বিচারিতা আমাদের সমাজে কাজ করে। সন্তান জন্মালে হিজড়াদের
ডেকে আশীর্বাদ নেই, আবার রাস্তায় দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেই। এই দ্বিচারিতাই আমাদের সামাজিক
নৈতিকতার সবচেয়ে বড় সংকট।
আমি মনে করি,
আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবন বদলাতে হলে কেবল তাদের নিয়ে
প্রকল্প করলেই হবে না। বদলাতে হবে আমাদের মানসিকতা। পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা, স্কুলে নিরাপদ
পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগÑ এসব নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।
গণমাধ্যম, সাহিত্য
ও শিক্ষাব্যবস্থায় হিজড়াদের ইতিহাস এবং জীবনচিত্র জায়গা পেতে হবে। করুণা নয়, তাদের
প্রয়োজন সম্মান। দয়া নয়, প্রয়োজন অধিকার। হিজড়া সম্প্রদায় বাংলাদেশের বাইরের কেউ নয়।
তারা আমাদেরই সমাজের মানুষÑ আমাদের ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী। একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য
হয়, যখন সে তার সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিককেও মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়।
হিজড়া সম্প্রদায়
বাংলাদেশেরই মানুষ। তাদের কান্না, হাসি, স্বপ্নÑ সবই আমাদের সমাজের অংশ। তাদের বঞ্চনা
মানে আমাদের সভ্যতার ক্ষত। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়, যখন সে তার
সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিককেও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে দেয়।
তাই আমি মনে করি, হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবন বদলাতে হলে কেবল তাদের বদলানোর কথা বললে চলবে না। তারা মানুষের করুণা চান না। তারা চান সুযোগ, নিজেদের মতো করে মানুষ হয়ে বাঁচার সুযোগ। বদলাতে হবে আমাদের মানসিকতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সুযোগ দিতে প্রস্তুত?
মতিলাল দেব রায়
কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক