× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আত্মতুষ্টি ও উচ্ছ্বাস

বিচ্যুতি খোলে বিপর্যয়ের পথ

হাবীব ইমন

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৭ এএম

বিচ্যুতি খোলে বিপর্যয়ের পথ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতার বলয় ভেঙে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তার কেন্দ্রে এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই মুহূর্ত কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে পুনর্বিন্যাস করার এক সন্ধিক্ষণ। সম্ভাবনার দুয়ার যেমন উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে দায়বদ্ধতা ও প্রত্যাশা, কারণ জনগণের রায় সব সময়ই শর্তসাপেক্ষ এবং ইতিহাস তার বিচার সংরক্ষণ করে রাখে।

দীর্ঘ ছত্রিশ বছরের নারীশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থা অবসানের পর যে নতুন রাজনৈতিক মুহূর্তের সূচনা হয়েছে, তা নিছক নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাবনা বহন করে। কিন্তু ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণ যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি তা কঠিন দায়বদ্ধতারও। জনপ্রত্যাশা পূরণে সামান্য বিচ্যুতি, আত্মতুষ্টি কিংবা ক্ষমতার উচ্ছ্বাস দ্রুতই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পথ তৈরি করতে পারে। সামনে রয়েছে প্রশাসনিক পুনর্গঠন, রাজনৈতিক সংস্কার, বহিঃশক্তির কূটনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির জটিল বাস্তবতা এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী দোসরদের সক্রিয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।

গণতন্ত্রের উত্তরণ কখনও স্বয়ংক্রিয় নয়; এটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক সংগ্রামের ফল। এর ভিত্তি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ভোটাধিকার কেবল সাংবিধানিক বিধান নয়, এটি নাগরিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের কেন্দ্রীয় উপাদান। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় প্রকৃত অর্থে ক্ষমতার পালাবদল অনুপস্থিত থাকায় একদিকে একদলীয় প্রাধান্য ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিহাস বলে, যখন ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ সংকুচিত হয়, তখন জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই দীর্ঘ সংকোচনের পর একটি সম্ভাব্য উন্মোচনের মুহূর্ত।

গত চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোর পুনর্গঠন সম্ভব, যদিও তা সহজ নয়। এবারের নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; এটি ছিল জনগণের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।

ভোটাররা শুধু পছন্দের দলকে সমর্থন দেয়নি, তারা একটি শাসনধারার বিরুদ্ধে অবস্থানও নিয়েছে। বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও বড় ধরনের কারচুপির প্রমাণ না পাওয়া ইতিবাচক ইঙ্গিত। উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক হতাশা সত্ত্বেও জনগণ এখনও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখে। সহিংসতামুক্ত পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদার আচরণেরও প্রতিফলন।

এই প্রেক্ষাপটে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। ইতালীয় চিন্তাবিদ অ্যান্তনিও গ্রামশির মতে, রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি রাজনৈতিক সমাজ ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত ক্ষেত্র। কেবল বলপ্রয়োগে নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্মতি নির্মাণের মাধ্যমেই স্থায়ী গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জিত হয়।

একইভাবে নোয়াম চমস্কি সতর্ক করেছেন, গণমাধ্যম ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত হলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে জনতার উচ্ছ্বাস-নির্ভর শাসনে রূপ নিতে পারে যেখানে আবেগ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার যুক্তিবোধকে ছাপিয়ে যায়। অতএব অতি আত্মবিশ্বাস যেমন বিপজ্জনক, তেমনি প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়ন করাও রাজনৈতিক ভুলের জন্ম দেয়।

অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রশ্নে মিসরীয় অর্থনীতিবিদ সমির আমিন স্মরণ করিয়ে দেন, রাজনৈতিক সংস্কার একা যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও কাঠামোগত স্থিতিশীলতা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। বিদেশি-নির্ভরতা, বৈদেশিক বিনিয়োগের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শক্তির অসম বণ্টন একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। তাই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তরুণ ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এই তাত্ত্বিক আলোচনার সারকথা হলোÑ গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনতার উচ্ছ্বাস-নির্ভর শাসনের ঝুঁকি বন্ধ করতে হবে, অতি আত্মবিশ্বাস ও অবমূল্যায়নের ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে। গণতন্ত্র তখনই জীবন্ত থাকে, যখন তা নীতি, প্রশাসন ও সামাজিক চর্চায় প্রতিফলিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে মনে রাখা জরুরি মানুষ কোনো প্রতীকের জন্য নয়, একটি কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য ভোট দেয়। ভোট ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রের পক্ষে, একদলীয় প্রাধান্য ও প্রভাবশালী জোট-রাজনীতির বিরুদ্ধে। জনগণ সময়মতো তার জবাব দেয়; ভোট কোনো দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়, এটি শর্তসাপেক্ষ ম্যান্ডেট। জনগণ যেমন ক্ষমতা দেয়, তেমনি প্রত্যাহারও করে।

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ তাই বহুমাত্রিক। প্রশাসনে পেশাদারত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা সুদৃঢ় করা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নাগরিক সমাজের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বহিঃশক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনাÑ সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্প সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের রূপরেখা বাস্তবায়িত না হলে আস্থাহীনতা আবারও ফিরে আসতে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক নতুন বাঁক। সংযম, প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও সামাজিক চেতনায় রূপ নেবে। ইতিহাসের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাইÑ নতুন নেতৃত্ব কি এই আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে রূপ দিতে পারবে, না কি অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। সময়ই তার উত্তর দেবে।


হাবীব ইমন

কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা