হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৮ এএম
বাংলাদেশ এবং ভারতের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর দলীয় প্রধান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সমাজমাধ্যমে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে ‘উচ্ছ্বসিত’ হওয়ার কথাও জানান এবং বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রয়াসে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এর জবাবে বিএনপিও ভারতের স্বীকৃতি ও শুভেচ্ছার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। এই পারস্পরিক কূটনৈতিক সৌজন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সূচনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব এখনও প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও ভারতবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সামাল দেওয়ার জন্য কী বাস্তবসম্মত পথ অনুসরণ করা উচিতÑএই প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের শিকড় ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপড়েন বাড়তে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পরও সম্পর্কের উষ্ণতা ফেরেনি। এর পেছনে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা, পানি বণ্টন চুক্তির অগ্রগতি না হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ভারতপন্থী’ তকমা ব্যবহারÑএসব বিষয় কাজ করেছে। ফলে জনগণের একাংশ মনে করে, দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই জাতীয় স্বার্থে আপস। বিএনপির সামনে তাই প্রথম চ্যালেঞ্জÑ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গিয়ে যেন ‘নমনীয়’ বা ‘নির্ভরশীল’ ভাবমূর্তি তৈরি না হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে ‘স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি’। বিএনপি যদি পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে যে তাদের নীতি হবে পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন, তাহলে তা জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে। কূটনৈতিক ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘issue-based engagement’Ñযেখানে প্রতিটি বিষয়ে পৃথকভাবে আলোচনা হবে, সামগ্রিক আনুগত্যের ছাপ থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, জনমত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের একটি অংশ আবেগপ্রবণ জাতীয়তাবাদী বক্তব্যে দ্রুত সাড়া দেয়। বিএনপি যদি হঠাৎ করেই ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় এগোয়, তাহলে বিরোধী শক্তি এটিকে ‘আদর্শ বিসর্জন’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। তাই সরকারের উচিত হবে, গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বা সমঝোতার আগে সংসদীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও গণশুনানির মতো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। এতে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভারতবিরোধী প্রচারণার শক্তি কমবে।
তৃতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানো দরকার। সীমান্তে প্রাণহানি বাংলাদেশের জনগণের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। যদি বিএনপি সরকার সীমান্তে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ নেয় এবং দৃশ্যমান ফল আনে, তাহলে জনগণ বুঝবে যে সম্পর্ক উন্নয়ন মানে আত্মসমর্পণ নয়; বরং বাস্তব সমস্যার সমাধান।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা প্রয়োজন। ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার হলেও বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ আছে। বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে শুল্কহ্রাস, অশুল্ক বাধা কমানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং যৌথ শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ নিতে পারে। যদি জনগণ প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সুফলÑকর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধিÑদেখতে পায়, তাহলে ভারতবিরোধী মনোভাব অনেকটাই বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।
পঞ্চমত, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য। কেবল ভারতের ওপর নির্ভর না করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক সমান্তরালভাবে জোরদার করা হলে একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি হবে। এতে দেশীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে বার্তা যাবে যে সরকার বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে। ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলই ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য গঠন জরুরি। বিএনপি যদি জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে পররাষ্ট্রনীতির মূল দিকনির্দেশনায় সম্পৃক্ত করে, তাহলে ভারত ইস্যুতে বিভাজন কমবে। একটি বহুদলীয় পরামর্শক কাউন্সিল গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে মতামত নেওয়া যেতে পারে। এতে ভারতবিরোধী শক্তির ‘গোপন সমঝোতা’ অভিযোগ দুর্বল হবে।
সপ্তমত, কূটনৈতিক যোগাযোগের ভাষা ও প্রতীকী রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চপর্যায়ের সফর, যৌথ বিবৃতি ও জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সমতার বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরা উচিত। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথা বলা যেতে পারে, তবে তা যেন বর্তমান সমস্যাকে আড়াল করার কৌশল মনে না হয়।
অষ্টমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত গঠনে সচেতন কৌশল প্রয়োজন। ভুয়া তথ্য ও উস্কানিমূলক প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সরকার যদি তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রদান করে এবং স্বাধীন গণমাধ্যমকে কাজ করতে দেয়, তাহলে গুজবের জায়গা সংকুচিত হবে।
সবশেষে, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বিশ্বাসযোগ্যতা। দীর্ঘদিন ধরে তারা ভারতের প্রভাবের সমালোচনা করেছে। এখন ক্ষমতায় এসে যদি হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন আনে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে। তাই তাদের উচিত হবে ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবর্তন আনাÑঅর্থাৎ, সমালোচনার জায়গাগুলোকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে গিয়ে সমাধান খোঁজা কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন না করা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে অবিচ্ছেদ্য। আবেগের রাজনীতি দিয়ে সাময়িক লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আসে কৌশলগত ধৈর্য, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। যদি বিএনপি সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও আঞ্চলিক বাস্তবতার মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারে, তবে ভারতবিরোধী মনোভাবকে সংঘাতে না নিয়ে গিয়ে সংলাপ ও বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রশমিত করা সম্ভব।
হাবিব বাবুল
জার্মানিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক