বিশ্লেষণ
আবু জুবায়ের
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৮ এএম
তারেক রহমান: ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে অভাবনীয়, যুগান্তকারী এবং অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। দীর্ঘ পনেরো বছরের অধিক সময় ধরে চলে আসা একটি চরম কর্তৃত্ববাদী, অগণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতন কেবল একটি গতানুগতিক সরকার বা ক্ষমতার পরিবর্তনই ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা অকল্পনীয় দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার, ভোটাধিকার হরণ এবং চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক আগ্নেয়গিরিসম বিস্ফোরণ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৮০ জন শিশু ছিল এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
রাজনৈতিক এই অভাবনীয়
শূন্যতার মাঝে ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র মেরামতের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ
হাতে নিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং সংবিধান সংস্কারের
জন্য কাজ করেছে। এই দীর্ঘ সংস্কার ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার পর, অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি
২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ
বিজয় অর্জন করেছে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে
বিএনপি ৩০০ আসনের সংসদে প্রায় ২০০-এর অধিক আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং
তিনি দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
আগামী দিনের গণতান্ত্রিক
যাত্রায় একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার যে সুযোগ আজ দলটির সামনে এসেছে,
তা কেবল ক্ষমতা গ্রহণের গতানুগতিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি ভগ্নপ্রায় রাষ্ট্রকে
সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্গঠন করার এক বিশাল ঐতিহাসিক দায়ভার। রাজনীতিতে আদর্শের চরম
অবনতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং জবাবদিহিতাহীনতার যে সংস্কৃতি গত দেড় দশকে গড়ে
উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র
গঠনের স্বপ্ন আজ সর্বজনীন। এই প্রেক্ষাপটে, সদ্য নির্বাচিত দলটির সামনে একদিকে যেমন
রয়েছে হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা
এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল সংস্কারের মতো পর্বতসম চ্যালেঞ্জ।
আমাদের দেশের
রাজনীতি যেন এক অনন্ত স্রোত, যার প্রবাহ কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল এবং অধিকাংশ সময়ই
চরম অনিশ্চিত। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো আজও
জনগণের প্রকৃত প্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে
পারেনি। সরকার বদলেছে, ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের যে মৌলিক চরিত্র
যথা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, অকার্যকর আমলাতন্ত্র এবং জবাবদিহিতাহীনতা তা প্রায় অপরিবর্তিত
রয়ে গেছে। এই কাঠামোগত অপরিবর্তনশীলতা রাষ্ট্রের ভিতকে বারবার দুর্বল করেছে এবং সাধারণ
জনগণকে ক্ষমতার মূলকেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক
বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা
গঠনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির আত্মপ্রকাশ
ঘটেছিল একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের
ওপর গুরুত্ব আরোপকারী রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির
ভূমিকা ছিল মূলত ট্রানজিশনাল বা রূপান্তরকালীন। দলটি সামরিক শাসনের অবসান চেয়েছিল,
যা ১৯৯১ সালে সফল হয় এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে
দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা, অবাধ নির্বাচন নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
ফিরিয়ে আনার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান
অতীতের সকল আন্দোলনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাত্রা বহন করে। এই আন্দোলনে মানুষ
কেবল একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন চায়নি, তারা রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত দলীয় বিচারব্যবস্থা,
প্রহসনমূলক নির্বাচন, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং পদ্ধতিগত দুর্নীতির অবসান চেয়েছে। এই
অপূর্ণতাই বর্তমান সময়ে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠনের’ জোরালো দাবি জন্ম দিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে
সদ্য নির্বাচিত দল হিসেবে বিএনপির দায়ভার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। ১২
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাধারণ জনগণ মূলত তাদের দীর্ঘদিনের হারানো ভোটাধিকার প্রয়োগ
করে প্রশাসনকে জবাবদিহিতামূলক করা এবং বিচারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট
তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও সংগ্রামের পর নতুন করে
রাষ্ট্র পরিচালনার যে সুযোগ তিনি পেয়েছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব।
দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী
শাসনে রাষ্ট্রের যে ভয়াবহ ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা অনুধাবন করে বিএনপি বেশ আগেই রাষ্ট্র
সংস্কারের একটি বিশদ রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল। যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত অন্যান্য সমমনা
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে দলটি ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা
জাতির সামনে উপস্থাপন করে। ১২ ফেব্রুয়ারির বিজয়ের পর এই রূপরেখাটি কেবল আর একটি নির্বাচনী
প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক গুণগত পরিবর্তনের রাষ্ট্রীয়
ব্লুপ্রিন্ট। তারেক রহমান এই ৩১ দফাকে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক নতুন সংজ্ঞা
হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষী সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে।
এই সংস্কার প্রস্তাবের
সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকগুলো হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভারসাম্য
প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশে প্রচলিত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ বা যে বেশি ভোট পাবে সেই জয়ী
হবে এই নির্বাচনী ব্যবস্থাটি দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি করেছে। ক্ষমতার
এই একচ্ছত্র আধিপত্যের লাগাম টেনে ধরতে বিএনপি তাদের রূপরেখায় সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব
করেছে যে, কোনো ব্যক্তি পর পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হিসেবে
দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এর পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী
এবং রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য আনয়নের প্রস্তাব করা
হয়েছে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব হলো বর্তমান এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার পাশাপাশি
একটি ‘উচ্চকক্ষ’ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
বিএনপির এই রাষ্ট্র
মেরামতের দর্শনের একটি অন্যতম নান্দনিক এবং গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ‘রেইনবো
নেশন’ বা রঙধনু জাতি গঠনের অঙ্গীকার। বাংলাদেশে এই ধারণার প্রয়োগ বলতে বোঝায় এমন
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণ, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। প্রতিহিংসা
ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে একটি ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ বা জাতীয় ঐকমত্যের
কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ের পর তারেক রহমান স্পষ্টভাবে
জানিয়েছেন যে, তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশকে
ঐক্যবদ্ধ করা, কারণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে কোনো নীতিই সফল হবে না এবং প্রতিহিংসা
কখনোই সুফল বয়ে আনবে না।
রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর পাশাপাশি যে বিষয়টি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে, তা হলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে যে অর্থনীতি পেয়েছে তা আক্ষরিক অর্থেই এক ধ্বংসস্তূপ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ব্যাংকিং খাতের চরম বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নজিরবিহীন সংকট সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এক গভীর খাদের কিনারায় অবস্থান করছে।
আবু জুবায়ের
কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক