শান্তিপূর্ণ ভোট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৩ পিএম
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়া দেশবাসীর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করেছেন। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে ভোটগ্রহণ ছিল শৃঙ্খলাপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক এবং কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। পাশাপাশি গণভোটে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের সুযোগ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই নির্বাচন ও গণভোট প্রমাণ করেছে, জনগণ সচেতন এবং তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নিজেদের মত প্রকাশ করতে চায়। আমরা চাই, ভবিষ্যতেও এমন নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই অব্যাহত থাকুক।
এ কথা মানতেই হবে, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় ভোটের মাধ্যমে। একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের পথই তৈরি করে না, এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করে। তাই শান্তিপূর্ণ ভোট মানেই গণতন্ত্রের বিজয় আর এই বিজয়ের নায়ক হলো দেশের সাধারণ জনগণ। যে কারণে গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে জনগণের মতামতকে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনগণের অংশগ্রহণের গুরুত্বের বাস্তব রূপ দেখা যায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে। আসলে মানুষ যখন ভয়ভীতি, প্রলোভন বা বাধা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন, তখনই গণতন্ত্র তার পূর্ণ মর্যাদা পায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন অনেক সময়ই বিতর্ক, সহিংসতা ও অনাস্থার ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়েছে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছেÑ ভোট যদি সংঘাতময় হয়, তাহলে তার ফলাফলও দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, শান্তিপূর্ণ ভোট শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনে না, জাতীয় ঐক্যকেও সুদৃঢ় করে। জনগণ যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়, তখন তা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটায়।
স্বীকার করতে হবে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীল মনোভাবও সমানভাবে প্রয়োজন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু তা যেন কখনও সহিংসতায় রূপ না নেয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতাই পারে শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে। যার প্রায় সবগুলোই পরিলক্ষিত হয়েছে এবারের নির্বাচনে। অবশ্য ভোটারদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ভোট প্রমাণ করেছেÑ একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও সুশৃঙ্খল ভোটার সমাজই পারে নির্বাচন উৎসবমুখর রাখতে। নারী ও তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও গণতন্ত্রকে নতুন প্রাণশক্তি দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির প্রবণতা ছিল, তাও এই গণতন্ত্রের মিছিলে ম্লান হয়ে গেছে।
আরেকটা বিষয় এখানে অগ্রগণ্যÑ শান্তিপূর্ণ ভোট দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দেয়। বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন একটি পরিণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মূল্যায়ন করে। সবচেয়ে বড় কথা, শান্তিপূর্ণ ভোট জনগণের আত্মমর্যাদা ও ক্ষমতায়নের প্রতীক। ভোটের মাধ্যমে মানুষ জানিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত মালিক তারাই। এই উপলব্ধিই গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে। ক্ষমতার পালাবদল যদি শান্তিপূর্ণভাবে হয়, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অস্থিরতার জায়গা সংকুচিত হয়।
মনে রাখতে হবে, একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের ফসল এই নির্বাচন। তাই নির্বাচন-পরবর্তী দেশবাসী আগামীর বাংলাদেশকে দেখতে চায় একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে। তারা এমন একটি দেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে গণতন্ত্র হবে কার্যকর, ভোট হবে নির্ভয়, আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে সুরক্ষিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবেÑ যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, সংবিধান ও ন্যায়বিচার হবে সবার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি।
মানুষ চায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তরুণরা চায় কর্মসংস্থানের সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়নের পরিবেশ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক অর্থনীতি। কৃষক ন্যায্যমূল্য চান, শ্রমিক চান ন্যায্য মজুরি, আর উদ্যোক্তারা চান সহায়ক নীতিমালা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত হবে সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত ও মানসম্মত। দেশবাসী এমন বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি অটুট থাকবে, নারী-পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করবে এবং পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। এক কথায় বাংলাদেশ হবে সম্ভাবনার, মানবিকতার ও অগ্রগতির এক আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র। যার কার্যকর অভাব বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করে আসছে।
আমরা বলতে চাই, শান্তিপূর্ণ ভোট কেবল একটি প্রশাসনিক সাফল্য নয়; এটি জাতির সম্মিলিত অর্জন। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিতÑ উৎসবমুখর, সহিংসতামুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক এই নির্বাচনের ফলাফলকে গণতন্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, মানুষের জীবনমানের উন্নতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, গতিশীল প্রশাসন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে নেওয়া। তাহলেই বলা যাবে, এই নির্বাচন সত্যিই গণতন্ত্রের বিজয় এবং জনগণের সাফল্য।