× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকায় নিঃশ্বাস নেওয়াই এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি

সুমাইয়া সিরাজ সিমি

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০১ পিএম

ঢাকায় দূষণ একটি সাময়িক সমস্যা না হয়ে স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে।

ঢাকায় দূষণ একটি সাময়িক সমস্যা না হয়ে স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে।

ঢাকায় এখন অসুস্থ হওয়ার জন্য আলাদা কোনো কারণ খুঁজতে হয় না। কাশি, শ্বাসকষ্ট, জ্বর কিংবা চোখ জ্বালাÑ এসব যেন রাজধানীর নিত্যসঙ্গী। রাস্তায় বেরোলেই গলা শুকিয়ে আসে, বুকে চাপ লাগে, চোখে পানি জমে। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই বাদ যাচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, এটা কি কেবল মৌসুমি ঠান্ডা-কাশির সময়, নাকি ঢাকায় শ্বাস নেওয়াটাই ধীরে ধীরে একটি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে?

সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগে তাকালেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। দীর্ঘ লাইন, শিশু কোলে অসহায় মা, কাশিতে কাতর বৃদ্ধÑ এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়। শিশু হাসপাতালগুলোতে নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস, শ্বাসনালির সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। বড়দের ক্ষেত্রে বাড়ছে হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, দীর্ঘমেয়াদি কাশি ও শ্বাসকষ্ট। চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীদের বড় একটি অংশ সরাসরি বায়ুদূষণের শিকার।

বিশ্বের ১০০ দেশের মধ্যে বায়ুদূষণে আজ শীর্ষে উঠে এসেছে রাজধানী ঢাকা। এ সময় ঢাকার বায়ুর মান ছিল ২৫৯। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দূষিত বায়ুর শহরে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায়শই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ২০০-এর ওপরে (খুবই অস্বাস্থ্যকর) থাকছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার প্রধান কারণ (পিএম-২.৫) দূষণ। ঢাকার বায়ুমান এখন নিয়মিতভাবেই ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে থাকে। কোনো কোনো দিনে বাতাসের মান ২৫০ থেকে ৪০০ ছাড়িয়ে যায়, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ এই তথ্য আর কাউকে বিস্মিত করে না। আমরা যেন ধীরে ধীরে দূষণকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছি।

এই অসুস্থতার পেছনে শুধু ভাইরাস বা শীতকালীন সংক্রমণকে দায়ী করলে বাস্তবতার সঙ্গে প্রতারণা করা হবে। চিকিৎসকরা স্পষ্ট করেই বলছেনÑ ঢাকার বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা (পিএম ২.৫), নির্মাণকাজের ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং শিল্পবর্জ্যের বিষাক্ত কণা ফুসফুসের গভীরে ঢুকে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে সামান্য ভাইরাসও মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

শীতকাল এলেই এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। কারণ শীতের সময় বাতাস ভারী হয়ে দূষণ আটকে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মৌসুমি ভাইরাসÑ যেগুলো শ্বাসনালিতে সংক্রমণ ঘটায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ দ্রুত নিউমোনিয়ায় রূপ নেয়, বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দেয় শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি। অথচ প্রতিবছর একই চিত্র দেখা গেলেও কার্যকর প্রস্তুতি চোখে পড়ে না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলোÑ শিশুরা এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। যে শহরে শিশুর শ্বাস নেওয়াই নিরাপদ নয়, সেখানে উন্নয়ন, স্মার্ট সিটি কিংবা ভবিষ্যতের গল্প কতটা বিশ্বাসযোগ্য? 

শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে দাঁড়িয়ে থাকা মায়েদের চোখে আতঙ্কÑ শিশুর কাশি থামবে তো? শ্বাস নিতে পারবে তো? এই আতঙ্ক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, এটি মানুষের তৈরি এক নীরব দুর্যোগের ফল। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাধারণত যে পরামর্শ দেওয়া হয়, তা প্রায় একইÑ মাস্ক পরুন, বাইরে কম যান, শিশুদের ঘরের ভেতরে রাখুন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি শহরের কোটি কোটি মানুষ কি সারাজীবন মুখ ঢেকে বাঁচবে? নাগরিকের দায়িত্ব কি কেবল নিজেকে রক্ষা করা, নাকি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের জন্য নিরাপদ বাতাস নিশ্চিত করা?

ঢাকায় দূষণের উৎস নতুন নয়। অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, ইটভাটা, পুরনো যানবাহন, শিল্পকারখানার ধোঁয়াÑ সব মিলিয়ে রাজধানীর বাতাস বছরের পর বছর বিষাক্ত হয়ে উঠছে। আইন আছে, নীতিমালা আছে, নির্দেশনাও আছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে দূষণ একটি সাময়িক সমস্যা না হয়ে স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে।

এই সংকটের আরেকটি দিক হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ। হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অনেককে বাড়ি পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ সবার জন্য পর্যাপ্ত শয্যা নেই, সময় নেই। এতে রোগ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, জটিলতা বাড়ছে। অর্থাৎ দূষণ শুধু মানুষকে অসুস্থ করছে না, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবস্থাকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক করে নিয়েছি। কাশি হলে বলি, ‘ঢাকার বাতাস তো এমনই।’ চোখ জ্বালা করলে বলি, ‘ধুলাবালি বেশি।’ যেন এটা কোনো অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু কোনো শহরের বাতাস বিষাক্ত হওয়া কি স্বাভাবিক হতে পারে? আমরা কি সত্যিই এমন একটি শহর মেনে নিতে চাই, যেখানে শ্বাস নেওয়াই ঝুঁকিপূর্ণ?

এই পরিস্থিতি এড়ানো অসম্ভব ছিল না। নিয়মিত ও কঠোরভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগ করা যেত। নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা যেত। পুরনো ও ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন বন্ধ করা যেত। ইটভাটা ও শিল্পকারখানার ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়ানো যেত। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতি জোরদার করা যেতÑ বিশেষ করে, শীতকাল সামনে রেখে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অভাবে ঢাকায় শ্বাস নেওয়াই এখন ধীরে ধীরে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই ঝুঁকি শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

ঢাকা যদি বাসযোগ্য শহর হতে চায়, তাহলে প্রথম শর্ত হলোÑ নাগরিকের শ্বাস নিরাপদ হতে হবে। উন্নয়নের সংজ্ঞা শুধু উড়াল সড়ক বা উঁচু ভবন নয়; উন্নয়নের মানে হলো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার ভয়ে শ্বাস নিতে দ্বিধা করবে না।

ঢাকায় শ্বাস নেওয়াই যদি এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়, তাহলে প্রশ্নটা আর চিকিৎসকদের নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য। আমরা কি এই শহরকে বাঁচাতে প্রস্তুত, নাকি দূষণের সঙ্গে সহাবস্থানকেই ভবিষ্যৎ হিসেবে মেনে নিয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবেÑ ঢাকা আদৌ মানুষের শহর থাকবে কি না।


সুমাইয়া সিরাজ সিমি

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা