হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৫ এএম
হোসেন আবদুল মান্নান, গল্পকার ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হলো। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণ এখ্ন চূড়ান্ত ফলাফলের অপেক্ষায়। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে যে যার মতন কথা বলে চলেছেন। আকারে, ইশারায়, ইঙ্গিতপূর্ণ উপমার কাব্যিক কথনে সমালোচনা চলছে। তবুও মনে হয়, সকলই তারা সকলের তরে। তাদের উদ্দেশ্যে, আদর্শে, নীতিতে কোথায় যেন একটা অদৃশ্য মিল রয়েছে। বিশাল কোনো ব্যবধানের মধ্যে এদের অবস্থান নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলার জন্য এটা অবশ্যই স্বস্তির কথা। মাঠে সাংঘর্ষিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শত প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক কবিতার আবৃত্তি চলমান আছে। যদিও ভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনার সামনে এখনও অদৃশ্য গুঞ্জন। কিছুদিন আগেও গুজবের শাখায় ভর করে চলেছে সত্য অসত্যের রেটোরিক্স। তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এমন দোদুল্যমানতা আগে কখনও দেখা যায়নি। সংবাদ আদান-প্রদানে কোনটা আসল কোনটা নকল, কোনটা এআই জেনারেটেড কনটেন্ট বুঝতে গিয়ে মানুষ পড়ে গেছে মস্ত বড় ফাঁপরে। আবার প্রতিদিন দিবালোকের মতন সত্যও চাপা পড়ে গেছে হাজারো কৃত্রিম অসংবাদের কালো ছায়ার অন্তরালে। কী এক অদ্ভুত সময় পার করছে স্বদেশ!
দুই .
একটু পেছনে ফিরলে দেখা যায়- এবারের জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে প্রার্থিতা বাতিল এবং পরবর্তীতে ফেরত পাওয়ার বিষয়ে একটা মজার দৌড় প্রতিযোগিতা সকলেই উপভোগ করেছিল। প্রথমে বাতিল হয়ে যায় পরে ইসি এবং সর্বশেষ হাইকোর্ট বিভাগ বা চেম্বার জজ পর্যন্ত আপ-ডাউন করে প্রায় সবাই বহাল। মাঠেঘাটে প্রতিশ্রুতির তুবড়ি উড়ে ছিল আকাশে বাতাসে। মিছিলের আগে হাত নেড়ে বিজয় সংকেত দেখিয়েছেন। ছোট ছোট গ্রামীণ ব্রিজ কালভার্টের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ বলছেন, এসব কাজে সরকারের দিকে তাকাতে হবে না নিজে, স্ব-উদ্যোগেই করে ফেলব ইনশাল্লাহ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ঋণের দায়ে ব্যাংকের খেলাপির তালিকাভুক্ত ছিলেন। পত্রিকার ভাষ্যে ছিল, হাতেগোনা কয়েকজনের কাছেই মোট ৮, ৫০০ কোটি টাকা ব্যাংক পায়। একজন প্রার্থীই ১,৮০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হয়েছিলেন। কিন্তু তারা দিব্যি নির্বাচনের মাঠে ছিলেন এবং আছেন। এবং তাদের অঙ্গীকারের কথাই মানুষ বেশি আমলেও নিয়েছেন। কারণ, টাকা কথা বলে। প্রার্থীগণ নির্বাচনী প্রচারে পরোক্ষভাবে লক্ষকোটি টাকা ব্যয় করছেন। তারা ভোটারকে সোনার হরিণ এনে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
তিন.
এসবের ভেতর ঢাকায় যেন চলেছে অন্যকিছু। পে-স্কেলের দাবিতে আন্দোলন, নাশকতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে রাস্তাঘাটে, যানবাহনে। পথচারী, রোগীর অ্যাম্বুলেন্স, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ পড়ে যায় বিপাকে। পুলিশ বাহিনী যথারীতি আগের মতো দায়িত্ব পালন করে চলেছে। বেশকিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসার্থে তাৎক্ষণিক হাসপাতালবাসী হয়েছে অনেক নেতাকর্মী। তাদের দাবি সবার আগে নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেকে হয়তো জানেই না পে-স্কেলে কোথায় লাভ, কোথায় লোকসান?
আরেক গ্রুপ ইনকিলাব মঞ্চ থেকে ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবি নিয়ে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখলে নেয়। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ঘেরাও করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। সংঘর্ষে জড়িয়ে অনেকে আহত হয়। টিয়ার শেল, লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেডের নিক্ষেপ হয়। তারা যুদ্ধংদেহি ও অপেক্ষাকৃত বেশি মারদাঙ্গা ধরনের।
চট্টগ্রাম বন্দর ধর্মঘটের কবলে পড়ে নাকাল হয়ে উঠেছে। কাজকর্ম একেবারে বন্ধ হয়ে আছে। পোশাক শিল্পের ওপর ধাক্কা পড়ছে। রপ্তানি পণ্যবোঝাই কন্টেইনার নড়ছে না। জাহাজের লোডিং-আনলোডিং বন্ধ হয়ে আছে। আবার সুশীলদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশিদের হাতে বন্দর তুলে দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে। তারা তা প্রতিহত করবেন। রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ পর্যন্ত করবেন। বেলা শেষের এমন অস্থির চিত্র কীসের আলামত বোঝা যাচ্ছে না।
চার.
দেশের ভেতরে বাইরের বহুমাত্রিক দৃশ্যপটের ভিড়ে যেন ছোট পর্দায় ভেসে আসে একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা। যা কেবল মানুষকেই গহিন ভেতর থেকে স্পর্শ করে যাবে। গতকাল এই খবর একটি জাতীয় দৈনিক শেষ পৃষ্ঠার শেষপ্রান্তে ছাপায়। পাঠ করে কতক্ষণ স্তব্ধতার ঘোরে অবচেতন ছিলাম। রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে একই পরিবারের চারজনের আত্মহত্যার ঘটনা। বাবা, মা আর অবুঝ সন্তানদ্বয়। একজন অটোরিকশাচালক মাসুম (৩৫), স্ত্রী ফাতেমা (৩০), দুই পুত্র সন্তান মিনহাজ আর আসহাদ বয়স যথাক্রমে ৪ ও ২ বছর। পুলিশ লাশগুলো বিহারি ক্যাম্পের ওয়াপদা এলাকা থেকে উদ্ধার করে। তারা বলেছে, মাসুম অভাব-অনটনে পড়ে, সবকিছুতে ব্যর্থ হয়ে, প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা থেকেই এমনটা করেছে। পুলিশ অন্য কোনো বিষয়ে এখনও যায়নি। তবে তারা সন্দেহমুক্ত নয়। এদেশে যা হয়, তা-ই। তারা কীভাবে আত্মহত্যা করলÑ ফাঁসিতে, বিষপানে, ছুরির আঘাতে? সেটা কিন্তু খবরে নেই।
ভাবছিলাম, মানুষের এত অর্থ, এত বিলাসবহুল জীবন, এত সমাজকর্ম, দানবীর খেতাবপ্রাপ্তির প্রবল বাসনা অথচ এ আত্মহত্যাকারীদের জীবন কাহিনীর কথা কেউ কী জানত? কয়েকদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল শুধু একটি বাক্য ‘শিশু দুটো কী স্বেচ্ছায় আত্মহনন বেছে নিয়েছিল? তারা কী আত্মহত্যা বুঝত ? পৃথিবী এদের কী দিয়েছে?
হোসেন আবদুল মান্নান
গল্পকার ও কলাম লেখক