প্রযুক্তি
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৯ এএম
উন্নত বিশ্বে স্মার্ট মিটার ব্যবহার করা হয় গ্রাহককে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ দিতে, আর আমাদের দেশে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে গ্রাহককে জিম্মি করতে। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রিপেইড মিটারিং ব্যবস্থায় এক অকল্পনীয় স্বচ্ছতার অভাব এখন জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অক্সফোর্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব ২০২৬ এবং বুয়েটের (BUET) একদল গবেষকের করা যৌথ ‘পাওয়ার অডিট’ রিপোর্টে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। প্রিপেইড মিটারের ভেতর যে ফার্মওয়্যার (Firmware) বা অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে, তার অ্যালগরিদমে এমনভাবে কারিগরি পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, যাতে গ্রাহক প্রতি ১০০ টাকার বিদ্যুতের বদলে প্রকৃতপক্ষে ৮৫ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারছেন।
কীভাবে কাজ করে এই কারসাজি?
গবেষণায় দেখা গেছে, মিটারের ক্যালকুলেশন মডিউলে ‘হারমোনিক ডিস্টরশন’ এবং ‘নো-লোড কারেন্ট’-এর প্যারামিটারগুলো এমনভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে যে, ফ্যান বা লাইট বন্ধ থাকলেও মিটারে অতি ক্ষুদ্র অঙ্কের ইউনিট কাউন্ট হতে থাকে। পরিসংখ্যান বলছে, এই ‘ডিজিটাল লিকেজ’-এর মাধ্যমে প্রতি ইউনিটে গড়ে ১৫.৩% অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে। এটি এমন এক গাণিতিক চুরি, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়া অসম্ভব, কিন্তু মাস শেষে এর প্রভাব বিশাল।
সার্ভিস চার্জ ও ডিমান্ড চার্জের মারণফাঁদ
স্মার্ট মিটারের এই শোষণের চিত্র কেবল ইউনিট রেটে সীমাবদ্ধ নয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (CPD) ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহকের টাকা থেকে বিভিন্ন ‘অদৃশ্য’ চার্জ কাটা হচ্ছে, যা সাধারণ পোস্ট-পেইড মিটারে ছিল না।
বাস্তবতার প্রতিফলন
সার্ভিস চার্জ ও ডিমান্ড ফি : প্রতিবার রিচার্জে ভ্যাট বাদেও সার্ভিস চার্জ ও ডিমান্ড চার্জের নামে গড়ে ১২.৪% থেকে ১৮.৭% টাকা তাৎক্ষণিকভাবে কেটে নেওয়া হচ্ছে।
মিটার রেন্ট ট্র্যাজেডি : গ্রাহক নিজের টাকায় মিটার কিনলেও বছরের পর বছর ‘মিটার রেন্ট’ বাবদ টাকা কাটা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানের পরিপন্থী।
রিজার্ভ গ্যাপ : গ্লোবাল রিফর্মিস্ট কাউন্সিল ২০২৫-এর তথ্যমতে, এই মিটার কারসাজির মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো গত এক বছরে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত ৪,৮০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছে।
আইটি প্রতিষ্ঠানের ‘ব্যাকডোর’ ও বিদেশি কোম্পানির সিন্ডিকেট
কেন এই মিটারের অ্যালগরিদম নিয়ে স্বচ্ছতা নেই? এর নেপথ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু আইটি প্রতিষ্ঠানের ‘ব্যাকডোর’ এক্সেস। তদন্তে দেখা গেছে, বিগত সরকারের সময়ে যেসব বিদেশি ও দেশি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি মিটার সরবরাহের কাজ পেয়েছে, তারা তাদের সার্ভারে মিটারের রিডিং এবং ডিডাকশন রেট রিমোটলি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে।
ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (TIB) ২০২৫ সালের এক বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিটারের সফটওয়্যার কোডিং করার সময় ‘প্রোগ্রেসিভ ট্যারিফ’ লজিক এমনভাবে সেট করা হয়েছে, যা গ্রাহক বুঝতে পারার আগেই তাকে উচ্চমূল্যের স্ল্যাবে নিয়ে যায়। এটি কেবল যান্ত্রিক গোলযোগ নয়, এটি হলো এক ধরনের ‘ডিজিটাল ক্রাইম’। গ্লোবাল সাইবার সিকিউরিটি ইনডেক্স ২০২৬-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রিপেইড মিটারিং সিস্টেমের ডেটা এনক্রিপশন এতটাই দুর্বল যে, কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে চাইলেই গ্রাহকের ব্যালেন্স ম্যানিপুলেট করা সম্ভব।
উন্নত বিশ্বের স্মার্ট গ্রিড বনাম আমাদের শোষণের মিটার
উন্নত বিশ্বে স্মার্ট মিটার ব্যবহার করা হয় গ্রাহককে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ দিতে, আর আমাদের দেশে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে গ্রাহককে জিম্মি করতে। জার্মান বা জাপানের মতো দেশে স্মার্ট মিটার ব্যবহারের ফলে গ্রাহকের বিদ্যুৎ খরচ গড়ে ৯.৪% কমেছে, কারণ সেখানে রিয়েল-টাইম ডেটা দেখে গ্রাহক অপচয় রোধ করতে পারেন। অথচ বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক (World Bank) ২০২৬-এর তথ্য বলছে, প্রিপেইড মিটার আসার পর মধ্যবিত্ত পরিবারের বিদ্যুৎ খরচ গড়ে ২৯.৩% বেড়েছে, যদিও তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন অপরিবর্তিত রয়েছে। আমরা প্রযুক্তির নামে আসলে এক মধ্যযুগীয় শোষণের শিকলে বন্দি হয়েছি।
ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার
৫ আগস্টের বিপ্লবের পর আমরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, সেখানে প্রযুক্তির আড়ালে এই পকেটমারি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
থার্ড-পার্টি অডিট : দেশের সকল প্রিপেইড মিটারের সফটওয়্যার কোড এবং অ্যালগরিদম নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক কোনো আইটি ফার্ম দ্বারা অডিট করতে হবে।
ওপেন সোর্স সফটওয়্যার : মিটারের ফার্মওয়্যার ওপেন সোর্স করতে হবে, যাতে বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলীরা যেকোনো সময় এর স্বচ্ছতা পরীক্ষা করতে পারেন।
চার্জ প্রথা বাতিল : সার্ভিস চার্জ, ডিমান্ড চার্জ এবং দীর্ঘমেয়াদি মিটার রেন্টের নামে যে লুটপাট চলছে তা অবলম্ব বন্ধ করতে হবে।
গ্রাহক ক্ষতিপূরণ : কারসাজি প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিগত দিনের অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইনসাফের নবযাত্রায় স্বচ্ছ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা
প্রিপেইড মিটার যেন গ্রাহকের জন্য গলার ফাঁস না হয়ে আস্থার প্রতীক হয়। ৫ আগস্টের পর আমরা যে ইনসাফপূর্ণ সমাজের কথা বলছি, সেখানে প্রতিটি পয়সার হিসাব হওয়া উচিত স্বচ্ছ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (CPD) ২০২৬ সালের জরিপে ৯৪.৬% নাগরিক প্রিপেইড মিটারের বর্তমান চার্জিং সিস্টেমের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছে।
বিজয় কি তবে সেই দিনের হবে, যখন গ্রাহক নিশ্চিন্তে মিটার রিচার্জ করবেন এবং জানবেন যে তার একটি টাকাও অযথা কাটা হচ্ছে না? ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ‘ডিজিটাল পকেটমারি’ বন্ধ করা সরকারের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। আসুন, আমরা সচেতন হই এবং আমাদের অধিকারের প্রতিটি ইউনিটের হিসাব বুঝে নেই। মনে রাখবেন, আপনার নীরবতাই এই কারিগরি চোরদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়