সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩৮ পিএম
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হওয়া ভোট চলবে একটানা বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংসদীয় ভোট কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের ইচ্ছা, মতামত ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আর গণভোট, আরও একধাপ এগিয়ে সরাসরি জনগণের রায় গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে জাতীয় জীবনে এক তাৎপর্যময়।
উল্লেখ্য, গত ১১ ডিসেম্বর
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে নানা প্রক্রিয়া শেষে
ভোটের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। এবার ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট
দেবেন। একটি সাদা ব্যালট, এটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য। আর গোলাপি ব্যালট হবে গণভোটের।
আজ ভোট হবে ২৯৯টি আসনে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার
৮৯৯ জন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন পুরুষ এবং ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার
৫২৫ জন নারী ভোটার। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন। নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক
দল অংশ নিচ্ছে এবং মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী
২৭৫ জন। সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। জানা গেছে, সারা দেশে ৪২ হাজার
৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচন পরিচালনায় প্রায়
৮ লাখ কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত
রয়েছেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে
৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ
করবেন। এ ছাড়া ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ভোট পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
উল্লেখ্য করা প্রয়োজন, আওয়ামী
লীগ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। ২০১৪ সালের নির্বাচন
‘একতরফা’, ২০১৮ সালে নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি-ডামি’ হিসেবে
পরিচিত। ভোটারদের একটি বড় অংশই ওই নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারেননি। সেই প্রেক্ষাপটে
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। দীর্ঘদিনের
অসন্তোষ, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন, জবাবদিহিতার সংকট এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কÑ সবকিছুর
পুঞ্জীভূত প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সেই অভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। ৮
আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। অন্তর্বর্তী
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজনৈতিক
কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
তাদের সমর্থক কিছু ছোটখাটো দলও এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
সেই গণঅভ্যুত্থানের পর আজকের এই ভোট ও গণভোট বিশেষ গুরুত্ব
বহন করছে। কারণ এটি শুধু একটি নিয়মিত নির্বাচন নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরীক্ষাক্ষেত্র।
দেশবাসী দেখতে চায়, তাদের আন্দোলনের বার্তা কতটা প্রতিফলিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো
ও প্রক্রিয়ায়। তাই কেউ এই ভোটকে দেখছেন পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে, কেউবা স্থিতিশীলতার
প্রশ্নে সিদ্ধান্তমূলক বিশেষ দিন হিসেবে। এই আগ্রহ প্রমাণ করে, জনগণ এখনও গণতন্ত্রের
শক্তিতে বিশ্বাস রাখে।
তবে ভোটের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি এর পরিবেশও হতে
হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ভয়মুক্ত। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারেন, পছন্দের
প্রার্থী বা প্রস্তাবে মত দিতে পারেনÑ এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের প্রত্যাশা একটাইÑ
তারা যেন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে জনগণের আস্থা অটুট রাখে। আমাদের অতীত নির্বাচনী
অভিজ্ঞতায় সহিংসতা, অনিয়ম কিংবা কারচুপির অভিযোগের নজির রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা জনগণের
মনে শঙ্কা তৈরি করেছে। তাই আজকের ভোট সেই শঙ্কা দূর করারও একটি সুযোগ। যদি এই ভোট শান্তিপূর্ণ,
গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন
করবে।
এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কারণ পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা, ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং গণতান্ত্রিক আচরণÑ এসবই
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পূর্বশর্ত। ভোটে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু গণতন্ত্রে
সবচেয়ে বড় বিজয় হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থা। আজকের ভোটে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য হতে পারে। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তি-সচেতন, তথ্যনির্ভর এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশী।
তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। একই সঙ্গে নারী ভোটারদের
নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা মনে করি, ভোট কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়Ñ এটি একটি
ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। নির্বাচনের পরও গণতন্ত্র টিকে থাকে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা
ও আইনের শাসনের মাধ্যমে। আজকের রায় আগামী দিনের বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, কীভাবে গড়ে
উঠবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। অনেক প্রতীক্ষিত এই ভোট ও গণভোট। তাই শুধু রাজনৈতিক ঘটনা
নয়, এটি জাতির জন্য পরীক্ষার দিন। আমরা প্রত্যাশা করি, আজকের দিনটি হোক শান্তিপূর্ণ,
উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য। জনগণের রায়ই হোক চূড়ান্ত কথা, আর সেই রায়ের প্রতি থাকুক সবার
শ্রদ্ধা। বাংলাদেশে আবার অভিষেক হোক গণতন্ত্রের।