জ্বালানি খাত
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৬ এএম
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অতিরিক্ত আমদানি-নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য এবং ডলার সংকটসহ নানান কারণে বাংলাদেশ এক গভীর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে শিল্পোৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালিতে তীব্র গ্যাস ও এলপিজি সংকট সৃষ্টি করেছে। এই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র ঘাটতি দেশের অর্থনীতি, শিল্পোৎপাদন, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। সহজ করে বললে, দেশ বর্তমানে যে গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়Ñ এটি এখন বাস্তব ও বহুমাত্রিক সংকট। সরকার একসময় বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত কিংবা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ স্বনির্ভরতার গল্প শোনালেও বাস্তব চিত্র আজ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন ক্রমেই কমছে। ২০১০ সালে যেখানে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি-এর নিচে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এই পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। বিকল্প হিসেবে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলেও সেটি ব্যয়বহুল এবং বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ বছরে গড়ে ৮-৯ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার পেছনে ব্যয় হয় ৫-৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারÑ আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভর করে। ডলার সংকটের সময়ে এই ব্যয় সরকারকে চরম চাপে ফেলেছে। ফলে অনেক সময় নির্ধারিত পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে।
এই জ্বালানি সংকট কেবল বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। বলতে দ্বিধা নেই, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শক্তি নিরাপত্তা যেখানে হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, সেখানে পরিকল্পনাহীনতা, আমদানি-নির্ভরতা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে জ্বালানি খাত আজ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই কিছুদিন আগের কথা, হঠাৎ করেই বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে এলপিজি। সারা দেশে এই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। সরকার নির্ধারিত দামে যেখানে একটি ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য প্রায় ১২০০ টাকা, সেখানে বাস্তব বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায়Ñ কোথাও কোথাও আরও বেশি। পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের সুযোগ নিয়ে এলপিজি বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করছে কিছু আমদানিকারক ও পরিবেশক গোষ্ঠী। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়েÑ এটি জানা কথা। কিন্তু চাহিদা বাড়লেই দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার বিক্রি হবে, এমন কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে পরিষ্কারভাবে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও দুর্বল নজরদারির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ভোগান্তিতে পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলো। রান্নার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে। সরকারের কঠোর নজরদারিতে যে অবস্থার শতভাগ পরিবর্তন হয়েছে তাও বলা যাবে না।
এ কথা ভুললে চলবে না, এক দশক আগেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প শোনাত। ‘লোডশেডিংমুক্ত দেশ’Ñ এই স্লোগান রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে যে ঝুঁকি জমা হচ্ছিল, তা সময়মতো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহের টেকসই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। গ্যাস অনুসন্ধান স্থবির থেকেছে, কয়লা উত্তোলন রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে গেছে, আর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ হয়েছে নামমাত্র।
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিল্প খাতে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ জোগান দেয়, সেখানেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অনেক কারখানা ৩০-৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর। শ্রমিক ছাঁটাই, ওভারটাইম বাতিল, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে শিল্প খাত আজ চরম অনিশ্চয়তায়।
সবচেয়ে বেশি শোচনীয় অবস্থা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের। অনেক কারখানা নিয়মিত লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে দেখা যায়, জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে শিল্প খাতে লাখ লাখ শ্রমিক আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষি খাতও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে, যা সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলাফল হিসেবে খাদ্যের দাম বাড়ছে বাজারে। জ্বালানি সংকট এভাবে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
বলা বাহুল্য, সাম্প্রতিক সময়ে নগর জীবনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ লোডশেডিং জনজীবনকে অসহনীয় করে তোলে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তিÑ সব খাতেই বিদ্যুৎ নির্ভরতা বেড়েছে। অথচ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়; বিদ্যুৎ থাকলেও ভোল্টেজ ওঠানামা কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি। পরিবহন খরচ বেড়েছে, সংরক্ষণ ব্যয় বেড়েছেÑ সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট কি হঠাৎ করে এসেছে? উত্তর হলোÑ না। এটি দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও অবহেলার ফল। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে আমদা-নিনির্ভর এলএনজির দিকে ঝুঁকে পড়া ছিল একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একইভাবে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সাহসী সিদ্ধান্ত না নেওয়াও আজকের সংকটকে ঘনীভূত করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিÑ বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তিÑ এখনও জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি।
জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো এর বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রভাব। এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। ডলার সংকটের সময়ে এই আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে একদিকে জ্বালানি আমদানি সীমিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আবার সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে।
আজ যে সংকট আমরা দেখছি, তা উপেক্ষা করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান নয়Ñ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সময় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার, নইলে গভীর সংকটে পড়বে বাংলাদেশÑ অন্ধকার আরও দীর্ঘ হতে পারে।
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা