× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জ্বালানি খাতে মহাপরিকল্পনা

স্বচ্ছ ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক হওয়াই কাম্য

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৩ এএম

স্বচ্ছ ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক হওয়াই কাম্য

আধুনিককালে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় স্মারকগুলোর একটি হচ্ছে বিদ্যুৎ। বাংলাদেশকে ২০৫০ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে একটি যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশের নিচে নামানো এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাসের ব্যবহার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৮ ফেব্রুয়ারি রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনার বিষয়বস্তু রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপন করে। জানা গেছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনার ২৫ বছরকে তিন ধাপে রোডম্যাপ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে (২০২৬-২০৩০) অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি নতুন অনশোর গ্যাস কূপ খনন এবং গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন পিএসসি বিডিং শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে (২০৩০-২০৪০) গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন এবং তেল শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়িয়ে ১০-১৫ এমটিপিএ করা। এবং তৃতীয় ধাপে (২০৪০-২০৫০) হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া ও কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে খাতকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করার পরিকল্পনা।

আরও জানা গেছে, ২০৫০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৯.৪ গিগাওয়াট। এর মধ্যে সৌর থেকে ৩৬ শতাংশ এবং বায়ু থেকে ১১ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুতের অবদান ২৪ শতাংশে উন্নীত করা এবং ফার্নেস অয়েল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২৬-২০৫০ সময়ে জ্বালানি খাতে ৭০-৮৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ১০৭.২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এই ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি তহবিলের পাশাপাশি পিপিপি, এফডিআই ও জলবায়ু অর্থায়নের ওপর। তবে পরিকল্পনা পেশ করাই শেষ কথা নয়; এর দর্শন, বাস্তবতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে দেশের জন্য এটি আশীর্বাদ নাকি আরেকটি কাগুজে নথি।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা ফ্যাসিবাদী আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কেচ্ছা শুনেছি। এ নিয়ে জনগণের অর্থের অপচয় করে উৎসব পালন করতেও দেখেছি। একই সঙ্গে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতেও দেখেছি। দেখেছি বিদ্যুৎ খাতে অকল্পনীয় হরিলুট। সেইসব প্রতারণা বিদ্যুৎ খাতকে এখনও সংকটাপন্ন করে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা পেশ হওয়া নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। আমরা মনে করি, এই নতুন দর্শনের তিনটি স্তম্ভ বাস্তবায়ন হলে বাস্তবসম্মত ও অভিযোজনযোগ্য পরিকল্পনা, দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত, জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনসহ পরিবেশগত স্থায়িত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে।

এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত গত দেড় দশকে উৎপাদন সক্ষমতায় খানিকটা অগ্রগতি দেখালেও ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মারাত্মক দুর্বলতা স্পষ্ট। এই খাতে ব্যয়ের অনুপাতে অগ্রগতির খতিয়ান খাতই ক্ষীণ। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা, আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি, ডলার সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকাÑ এসব অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া খণ্ড খণ্ড সিদ্ধান্ত দেশকে টেকসই সমাধান দিতে পারে না। তাই অতীতের হঠকারিতা, লুটেরা কৌশল ও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাস্তবতা মেলানোই সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

আমরা মনে করি, এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে জ্বালানি বৈচিত্র্য ও দেশীয় উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার। অতীতে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর অতিরিক্ত আমদানি-নির্ভরতা জাতীয় অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিÑ বিশেষ করে, সৌর ও বায়ুশক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। পরিকল্পনায় যদি ২০-২৫ বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, জমি ব্যবস্থাপনা, গ্রিড আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ কাঠামো স্পষ্ট না থাকে, তবে এটি আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হবে।

শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম মূল লক্ষ্য হওয়া জরুরি। বিগত সময়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, অস্বচ্ছ দরপত্র ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্প বিদ্যুৎ খাতকে নেতিবাচক দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করা পরিকল্পনায় যদি ব্যয়–সাশ্রয়, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্মূল্যায়ন এবং দুর্নীতিবিরোধী শক্ত কাঠামোর কথা না থাকে, তবে লক্ষ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বের দবি রাখে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আজও সিস্টেম লস নামের চুরি, পুরনো গ্রিড ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। তাই পরিকল্পনায় স্মার্ট গ্রিড, ডিজিটাল মিটারিং এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার রূপরেখা না থাকলে উৎপাদন বাড়ালেও সুফল মিলবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মহাপরিকল্পনা কতটা অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবভিত্তিক। অতীতে দেখা গেছেÑ বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের মতামত অন্তর্ভুক্ত না করে তৈরি পরিকল্পনা টেকসই হয় না। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব হবে এটিকে কেবল একটি প্রশাসনিক নথি হিসেবে না দেখে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির দিকনির্দেশনা দিতে পারে— যদি তা সাহসী, স্বচ্ছ ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক হয়। অন্যথায়, এটি অতীতের মতো আরেকটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হয়ে থাকবে, যার মূল্য পরিশোধ করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা